বোসো, বলে রণিতা তাকাল আমার দিকে। আমি ওর। চুলের গুছি কপালে লতিয়ে। কোঁকড়ানো। ভুরুর ঢালে ঢেউ খেলেছে সরু চুলের রেখা। ভুরু সরু থেকে মোটা হয়ে নাকের উপর মিশেছে আরেক ভুরুর সাথে। দুই ঢাল পাহাড়ের মাঝে যেন বুগিয়ালের নরম নেমে যাওয়া। ঠিক তার উপরে ছোট্ট টিপ। উজ্জ্বল নয়, তবু তার প্রবল অস্তিত্ব ফরসা কপালে । সব দৃষ্টি টেনে নেয় । যেমন সাদা বড় পাতায় ছোট্ট কালির বিন্দু, মাস্টারমশাই ক্লাসে সবার সামনে পাতাটা তুলে বলল, কী দেখতে পাচ্ছো? সবাই হাততুলে চিৎকার, কালো বিন্দুউউউ...। মাস্টারমশাই মৃদু হেসে বলল, এতবড় সাদা কাগজটা দেখতে পেলে না? না পেলাম না। পাওয়া যায় না। ওটাই আধার। ধরে আছে যা বা যেটা সেটাই দেখা যায় না। যেটা আধারের উপর থাকে সেটাই নজরে আসে।কারন, সেটাই প্রক্ষিপ্ত, সেটাকেই নজর দেবার জন্য দেওয়া হয়েছে। বিন্দু বিন্দু বিন্দু মানুষ ঐ ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর বুকে। মানুষ দেখি। মাটি দেখিনা। যে মাটির উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখিনা। রণিতা দাঁড়িয়ে আছে। রণিতাকে দেখি । রণিতার উড়ে যাওয়া আঁচল। আঁচল আড়ালে গোপনতার আভাস, আভাসের প্রবল উচ্ছাস, উচ্ছাসের ডাক। সব সব চোখের সামনে মেলে ধরে, দেখি, দেখিনা, দেখতে পাই না রণিতাকে।
কী দেখতে চাও? নির্জণ গোধূলি ছাদে এই প্রশ্ন করেছিল রণিতা ।
তোমাকে।
ঠিক করে বল।
তোমাকে।
ঠিক করে বল।
তোমাকে।
তুমি বলতে পারলে না। চলি।
সন্ধ্যা নেমে এল। চলে গেল রণিতা। চলে গেল বহু বহুদূর। চলেই গেল। কী দেখতে চেয়েছিল আমার চোখ! আধার ? না কি আধারের উপর প্রক্ষিপ্ত ঐ ঐ কালো বিন্দুটুকু। এই প্রবল সংশয় নিয়ে এই আমার দাদ-হাজা-চুলকানির জীবন। পায়ে পায়ে ধাপে ধাপে সংশয়। খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে সিঁড়ি । দাঁত বার করে হাসে। সেই হাসির উপর দিয়ে টালমাটাল হেঁটে হেঁটে হেঁটে উঠছি। সিঁড়ির তলার অন্ধকার ফিসফিস করে, কোথায় চলেছ?
ঘরে।
কার? অন্ধকারের ঘরঘর গলায় প্রশ্ন।
আমার।
খ্যাক খ্যাক হাসে সিঁড়ি, পায়ের তলায়। টলে উঠছে পা।
আমার বাড়ি। আমার ঘর। আমার বিছানা। আমার বলিশ। এই এই সমস্তটাই তো প্রক্ষিপ্ত এই বিশাল আধারের মাঝে। সেই সেই কালো বিন্দুটি, বিশাল সাদা পাতার মাঝে।
উঠি সিঁড়িতে পা ফেলে ফেলে ফেলে। 'কে রবে সংশয়ে...'। প্রবল সংশয় ও সংশ্লেষ যৌথভাবে যূথবদ্ধ আমদের ঘিরে ঘিরে আছে। চলার পথে। পথের ধারে ছোট ছোট রঙিন ফুলের মাথা দোলানো। রণিতার শাড়ির ঢালা পাড়। সরু কালো চামড়ার স্ট্র্যাপ ধরে আছে ফরসা পা। 'কে রবে সংশয়ে সন্তাপে...'
আমার কোন বাসগৃহ নেই। এই বিশাল আধারে এক প্রক্ষিপ্ত বিন্দু আমি। উপরে মহাকাশ, গ্যালাক্সি ঝুঁকে পড়েছে। কাছে কাছে আরো কাজে। বৃষ্টি পড়ছে প্রবল। নদীর ধারে শুয়ে আছি। জঙ্গলে জলের শব্দ । ভেজা ঘাসের সবুজ গন্ধ । শুয়ে আছি আমি। এ আমার পরবাস। আমার এখানে বাসগৃহ শুধু প্রক্ষিপ্ত কর্মকাণ্ড মাত্র । এই আমার আমার চিৎকৃত জমা করা সম্পদ শুধুমাত্র ঐ কর্মকাণ্ডের পিন্ড পিন্ড বাই-প্রোডাক্ট। খ্যাক খ্যাক খ্যাক হাসে সিঁড়ি। সিঁড়ির তলায় গুমরে গুমরে ওঠে - এ পরবাসে রবে কে হায়...
কে রবে সংশয়ে ...
কী দেখতে চাও তুমি? রণিতা চোখ চেয়ে নেয়।
আমি দেখতে পাচ্ছি । রণিতার চোখের মাঝে ঘন কৃষ্ণগহ্বর।
কী?
বিন্দু বিন্দু তুমি। একটা একটা করে কুড়িয়ে কুড়িয়ে জড়ো করতে করতে করতে...
সেটাই তো জীবন, গতি, প্রেম...না হলেই...এ পরবাসে রবে কে... ছেঁড়া তার কেঁদে যাবে... কে রবে সংশয়ে সন্তাপে...