স্থির। নড়ছে না। চোখে চোখ। এত এত কাছে! একদম চোখের সামনে। আমার চোখ আর ওর চোখের মধ্যে তফাত শুধু এক পলেস্তারা বায়ু আর আমার চশমার কাঁচ। সুকুমার রায়ের আঁকা সেই 'আবোল তাবোল' এর ঝাঁটা গোঁফ লোকটার মতো তার গোঁফ। একটু একটু নড়ছে। মাঝে মাঝে লিকলিকে দু'টো হাত দিয়ে মুখ মুছে নিচ্ছে। লিকলিকে পা। গান্ধী-মাথা। তাকিয়ে স্থির। এক দৃষ্টে। তাকিয়ে থাকি, তাকিয়ে থাকি। নড়ি না। সারা শরীর জুড়ে ক্লান্তি। শ্রবণে ধীরে ধীরে পাখ-পাখালি'র শব্দ। জঙ্গল। গভীর। খিলখিল হাসি শুনে বুঝি হিমা আমার সাথেই আছে। আর এই পিঁপড়ে টা! ও কি জানে এই বিশাল পৃথিবীর মানচিত্রের একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল এই সারাঙ্গা জঙ্গল। তার বিস্তীর্ণ জঙ্গল এলাকার মধ্যে একটি ছোট্ট অংশে, অসংখ্য গাছের মাঝে একটি শাল গাছের তলায় আমি শুয়ে। আমার চোখের সামনে শুকনো খয়েরি পাতার এক কিনারায় একটা পিঁপড়ে। বিশাল এই জগতের ভেতর কণামাত্র এই ঘটনা। পিঁপড়ে কি জানে তার ঠিকানা! এই দেশ কতখানি! কোথায় গেলে সে ঢুকে পড়তে পারে উপদ্রুত অঞ্চলে। সেখানে সে বহিরাগত। না জীবকূলের মধ্যে মানুষ এক মাত্র মানুষ বহিরাগত হতে পারে। বাইরের লোক। হিমা হেসে উঠল খিলখিল শালের পাতা কাঁপিয়ে। ধারাগিরি'র এই অঞ্চলে যাওয়ার নিষেধ ছিল। আর ছিল বলেই আকর্ষণ বড় তীব্র তীব্র নিজেকে বার বার দেখতে চাওয়া। ভেংচি কেটে, জিভ বার করে, চোখ কুঁচকে, নানা ভঙ্গিতে ভঙ্গিমায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখা। এই আমি আর নই একা। আমার ভেতর আরো আরো আমি আছে। তাদের নানা রঙ, রূপ, মাধুর্য নিয়ে ভাঙ্গা কাঁচের চুড়ির টুকরো নিয়ে নানা নকশার আমি। ক্যালাইডাস্কোপের ডিজাইন। এক নকশা ফিরে আসেনা কখনও তবুও তবুও প্রাণপণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একই নকশা তৈরী করে চলি। "তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে" বলে হাত ধরেছিল অরুণা। সেই থেকেই আমি অরুণার ভালো লাগা অনুযায়ী...। অরুণ অরুণা, অমিত অমিতা অজস্র ছড়িয়ে থাকা টুকরো টুকরো কাঁচে বিম্বে বিম্বে টুকরো টুকরো আমি। অসংখ্য আমি। অযুত আমি। নিযুত আমি। অংশ আমি। ভগ্নাংশ আমি। সিকি আমি। আধুলি আমি। ধুলোয় ধুলোয় ছড়িয়ে থাকা আমি এখন ধুলোর গন্ধ নাকে শুয়ে আছি। পাশে হিমা। ঝুঁকে পড়েছে ঘোর বর্ষার কালো মেঘের মতো ওর মুখ। ফ্যাটফ্যাটে সাদা চোখের মাঝে কুচকুচে কালো মণি। তিরতির। কাল সারারাত আমাকে পথ দেখিয়েছে । আমাকে খাটিয়ায় বসিয়ে রেখে ওরা আলোচনা করছিল। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। মাটিতে শোয়ানো রাইফেল। পাশে হাওয়াই চটি পা। আলোচনার কেন্দ্রে আমি ও আমার জীবন। গলা শুকিয়ে কাঠ। চারিপাশ সব কিছু নেই। আমার অতীত নেই, ভবিষ্যত নেই, কিসসু নেই, ফাঁকা একদম ফাঁকা মাথা, শুধু আমি, আমি আর ঐ রাইফেল ব্যবহারের সিদ্ধান্তের মাঝে এক বিশাল কৃষ্ণ গহ্বর। না:। কেউ নেই। বাবা-মা নেই, ভাই-বন্ধু নেই, অরুণা নেই ,নেই নেই কেউ নেই। থাকেনা, সব বানিয়ে বানিয়ে পাতা ভরাট গল্প লেখা হয় - মৃত্যুর আগে প্রিয়জনের মুখ মনে পড়িতে লাগিল, লাগিল, লাগিল। কিচ্ছু মনে পড়ে না। শুধু নিজে। শুধু আমি আর সামনে মৃত্যু-সিদ্ধান্ত। বিশ্ব চরাচরে আমার মুখোমুখি আমি। বাহ্যজ্ঞানহীন। অরুণা জানালার ধারে বসে গাইছে। দীর্ঘ গরাদ দেওয়া জানালা। পুরোনো বাড়ির দোতলা ঘর। জানালার বাইরে ঘরের আলো হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে । অরুণার ফরসা প্রোফাইল জানালার গরাদ ঘেঁষে। চোখ বোঁজা। গাইছে। তন্ময়। "আমার প্রাণে গভীর গোপন মহা আপন সে কী অন্ধকারে হঠাৎ তারে দেখি..." হঠাৎ হঠাৎ ই রেল লাইন ডেকেছিল বরুনকে। আমন্ত্রণের বানী। কেন যায়! কেনই বা আমি এই জঙ্গলে। হিমা মাঝরাতে চুপিচুপি ঘরে। দরজা হাট। হাত ধরে জঙ্গলে শব্দহীন কথাহীন দৌড়। শুধু হিমা'র হাতের মধ্য দিয়ে একটা ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে, জীবন জীবন...। এক সময়ে থামলাম। হত ক্লান্ত। হিমার শরীর জুড়ে বুনো গন্ধ। ঘাসের গন্ধ। বৃষ্টি ভেজা মাঠে মারপিটের সময় সুবল চেপে ধরেছিল মুখ ভেজা ঘাসে। থ্যাতলানো সেই ঘাসের গন্ধ আজ আজ আবার হিমার শরীরে। কোল। মায়ের। ঘুম। অরুণার চোখ দিয়ে বিন্দু জল। সরু ঠোঁট নড়ে। ফরসা গলায় নীল শিরার উঠানামা। সুর ছড়িয়ে পড়ে - ...দুর্দম ঝড়ে আগল খুলে পড়ে / কার সে নয়ন পড়ে নয়ন যায় গো সে কী...। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে অরুণা। জানালার গরাদে মুখ। অন্ধকারের চোখ! কৃষ্ণগহ্বরের কোন নয়নে নয়ন রেখে অর্গল খুলে পড়ে অরুণার। 'যখন আসে পরম লগন তখন গগন মাঝে তাহার ভেরী বাজে...। অরুণা উপরে মুখ তোলে। থুতনি দৃঢ় ও তীক্ষ্ম । গলার ঢাল নেমেছে তরঙ্গে। বুকের ওঠানামা তীব্র বেদনার দূত নেমে এসেছে। পরের দিন ভোর। অরুণাকে নামিয়ে আনা হয়েছে চাদরে জড়িয়ে ধরাধরি করে। জানালার গরাদ দরজা সব জল সপসপ। জল ঢালা হয়েছে। মহা আপনের সাক্ষাত পেয়েছিল অরুণা। জীবনে চলতে চলতে বারবার আমরা আমাদের মুখোমুখি হতেই আপনের সাথে। আর প্রতিবার মুখ লুকোই। পালিয়ে বেড়াই আপণে আপণে। হাজার রংবাহারি সাজানো দোকানের কাঁচে সেঁটে থাকি। বেচাকেনা করি। মহা আপনের সাথে সাক্ষাত না হওয়া পর্যন্ত চলে দমছুট এই খেলা। খেলাঘর। পালিয়ে বেড়াই ক্ষ্যাপার মতো সিঁড়ি থেকে সিঁড়ি, ধাপ থেকে ধাপ। কোনো এক ধাপে যদি দেখা হয়ে যায়, হয়ে যায় দেখা, পালাতে না পারে যদি... পিঁপড়ে তাকিয়ে থাকে চোখের দিকে। সামনের লিকপিকে পা তোলে। মুখ চুলকোয় । দেখে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে... হিমার পা ঠিক পিঁপড়ে আর আমার মাঝে দাঁড়ালো। হিমার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালাম। সবুজ গন্ধ নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ... মহা আপন সে কী!!