মধ্যচল্লিশ পেরিয়ে যাচ্ছি। এই সামান্য জীবনে যা কিছু দেখলাম তার বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে নানান আস্ফালন , কবি হওয়ার দুর্মর চেষ্টা ; হুড়োহুড়ি। নানা মঞ্চে কবিতা পাঠের জন্য কতরকমের তদ্বির।
রেড়িয়ো-টেলিভিশনের লাইন দেবার বিধি ব্যবস্থা। কোন্ সম্পাদক কোন্ পুজোয় তুষ্ট তার জন্য খোঁজখবর। নিশ্চয়ই কোনো অসূয়ায় আক্রান্ত হইনি আমি। এর মধ্যেই বেশ কিছু ব্যতিক্রমী মানুষওতো দেখলাম। এর মধ্যে তিনজন মানুষের কথা বলবো - একজন কবি, একজন সম্পাদক এবং অবশ্যই একজন মানুষ। যে কবির কথা বলছি তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার জীবনের পুণ্যকর্ম বলে বিবেচনা করি। বেশ কয়েকবার আমার সে সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি একবার সামনাসামনি কবিতা চেয়েছেন। অন্য কয়েকবার লোক মারফত চেয়ে পাঠিয়েছেন। মনে আছে একবার কবিতা দিতে না পারলেও পত্রিকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমিও চিঠি দিয়ে প্রাপ্তি স্বীকার করেছি এবং মতামত পাঠিয়েছি । ২০১০ সালে ' ফিনিক্স ' পত্রিকার তরফে তাঁকে নিয়ে একটি ক্রোড়পত্র করার প্রস্তাব দিই
তিনি সাদরে সে-প্রস্তাব গ্রহণ করেন। স্বচক্ষে দেখেছি আমার এই সম্পাদককে জয় গোস্বামী মঞ্চে সকলের সামনে প্রনাম করছেন। এই পবিত্র দৃশ্যের সাক্ষী থাকতে পেরে গভীর আনন্দে মেতেছি।
তিনি খুঁজে খুঁজে কবিতা সংগ্রহ করতেন। তাঁর পত্রিকাটি ক্ষীণতনু কিন্ত প্রচুর বারুদ থাকত তাতে। এই পত্রিকায় লেখা প্রকাশ পেয়েছে বলে হয়তো আজও লেখা চালিয়ে যাচ্ছি। রাখাল সাজা আমার আর হতনা।
কবি হিসাবে তিনি অনন্য মেধার অধিকারী। তাঁর কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা যাদের আছে তাঁরা জানেন তিনি ভাব অপেক্ষা ধ্বনিকেই বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন কবিতায়। হতে পারে রমেন্দ্র আচার্য চৌধুরী, উৎপল বসুকে তিনি গুরু মনে করতেন । উৎপল বসুর কবিতায় আমরা দেখেছি অর্কিস্ট্রাকচারাল এভিডেন্স। রমেন্দ্র আচার্য চৌধুরী যেমন নতুন শব্দ তৈরি করেছে তেমনই এই কবিও অনেক শব্দ তৈরি করেছেন । জোতির্ময় দত্ত বলেছেন - ' তাঁর বানানো অভিধানের অজানা শব্দ গুলি মায়াবী অর্থময়।' তিনি কবিতায় পুরাণ অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। তাঁর কবিতা বুঝতে পেরেছেন এমন মানুষ হয়ত কম। কিন্তু তাঁর কবিতা আততায়ীর মতো এসে আমাদের রক্তে হানা দেয়। তাঁর কবিতায় গূঢ় রহস্য আছে, তাঁর শৈলী পৃথক। তিনি পৃথিবীকে দেখেছেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে, গাণিতিকের দৃষ্টিতে, দার্শনিকের দৃষ্টিতে কিংবা নিরাসক্ত ধার্মিকের দৃষ্টিতে।
পাহাড়ে ধ্বনিতে যেমন প্রতিধ্বনি শোনা যায় তেমন তিনি অনর্গল শব্দ উদগীরণ করেন এবং তাঁর সেই গৃহীত ধ্বনিপুঞ্জ কবিতায় ব্যবহার করেন। ফলে আপাত যুক্তি পরম্পরাহীন ধ্বনিপুঞ্জ প্রাথমিকভাবে আমাদেরকে রহস্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। একটা মহাজাগতিক চেতনা রয়েছে তাঁর কবিতায়। মেটাফিজিক্যালও বলা যেতে পারে। আগেই বলেছি তাঁর কবিতা অন্য কবিদের মত আবেশাবিষ্ট করেনা । কিন্তু তাঁর কবিতা পড়লে বিস্ময়ের ঘোর কাটেনা। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার সুবাদে বিদেশি কবিতাও একটু আধটু পড়েছি। কিন্তু এই কবির যেন কোনো পূর্বসূরী নেই। শুধু হাইদেগার্দের কাব্যদর্শনের সাথে কোথাও কোনো মিল কোথাও থেকে গেছে। আর এই কবির পড়াশুনো থাকলেও এ পর্যন্ত তিনি পৌঁছেছিলেন কিনা বলা সন্দেহ। ফলে প্রভাবিত হওয়ার প্রশ্ন এখানে অবান্তর। শুধু তাঁর রচনার ছোটো অংশ থেকে একটা পাঠ নেওয়া যেতে পারে - ' প্রকৃতির যেমন রূপ আছে সেগুলো দেখলে ঠিক দেখতে পাওয়া যায়। ঠিক তেমনি রয়েছে কবিতার নানা রূপ। কবির খুব ভালো মনস্তত্ত্ববিদ হওয়া চাই । কিসে মানুষ কেন কী করে তা জানা চাই। তার বোধ জাগ্রত থাকলে টের পাওয়া যায়। আবার অস্তরাগ থাকলে মানুষ সদয় হয়ে যায়। কবিতার আদর্শে অনুরাগ থাকলে মানুষ নিয়ন্ত্রিত সংযত হয়ে ওঠে। উচ্চমন্যতা হীনমন্যতা অন্তবিহীন যুগ্ম বিপরীত পদ সৃষ্টি করে। এবং তার থেকে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ঠিক বিচার করতে গেলে খুব কম লোকই জীবন্ত জীবাশ্ম খুঁজে পায় । '
মনে হয় তাঁর কবিতার লাইনের উপরে রয়েছে অনন্ত মহাকাশ এবং নীচে অসীম সমুদ্র। মলয় রায় চৌধুরী বলেন - ' তাঁর একটি লেখা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কেমন করে গজিয়ে ওঠে তা এক রহস্য। কবিতা বিশেষটি আরম্ভ করে তিনি ক্রমশ ভঙ্গুর ডিকশনের মাধ্যমে তাঁর গঠনবিন্যাসের ল্যারিবিন্থে নিয়ে যান। ছবি পুরো গড়ে ওঠার আগেই অন্য ছবিতে চলে যান । '
সম্পাদক ও কবির পাশাপাশি তিনি ছিলেন নির্ভেজাল এক মানুষ। সারাজীবন দুঃখে-কষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু কারো কাছে কখনও হাত পাতেননি। অনেক বন্ধুর উদারদান অবশ্য তিনি গ্রহন করেছেন।
কাঁধে একটি ব্যাগ ঝুলিয়ে তিনি এ জেলা ও জেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন। ঐ ব্যাগই তার ছিল ব্রহ্মান্ড। কোথাও আত্মসম্মানে ঘা লাগলে তিনি নীরবে সে স্থান প্রস্থান করতেন। কবিতা লেখার জন্য ছমাস জেল খেটেছেন জরুরি অবস্থার সময়ে। অথচ কোথাও তিনি তেমনভাবে কোনো ঘোষণা দেননি। বরং তিনি বলেছেন প্রত্যেক কবির উচিৎ জীবনে অন্তত একবার জেলে যাওয়া। আসলে জেল এমন একটি জায়গা যেখানে বহু চরিত্রের অনেক মানুষকে একজায়গায় খুঁজে পাওয়া যায়।
সাধারণ মানুষ জেলে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আর তিনি হয়ত এখানে এসে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কোনো পত্রিকা আমন্ত্রণ না জানালে তিনি সেখানে লেখা দিতেন না। এঘটনা একটি বিখ্যাত পাক্ষিক পত্রিকার ক্ষেত্রেও সত্য। লেখা চাইবার জন্য তিনি দোরে দোরে ভিক্ষা করতে রাজি । কিন্তু তিনি নিজে যেচে লেখা দিতে গররাজি। এতটাই আত্মমর্যাদা বোধ ছিল তাঁর।
এতক্ষণে মাননীয় পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন এ ব্যক্তির পরিচয়। তিনি আর কেউ নন, তিনজন নন, একজনই। কবি, সম্পাদক ও মানুষ শম্ভু রক্ষিত। ত্রিবিধ সত্তা নিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন আরও অনেকদিন।