প্রিয় ধ্বনির জন্যে - রামকিশোর ভট্টাচার্য

শম্ভু রক্ষিত। রোদ শার্সির ওপাশে জীর্ণ মলিন পোষাক , কাঁধে প্রবীন ব্যাগ, ছেঁড়া চটি, একগাল খোঁচা দাড়ি, নিস্পৃহ মিটিমিটি হাসিমুখটা এখনও জীবিতই আছে মনের ঘরে ৷ সেটাই থাক। আমার দেখা প্রথম একজন প্রকৃত প্রতিবাদী মানুষ। যে বলতে পারতো 'আমি কেরর না অসুর'। যে স্বপ্ন দেখতো ' অদ্ভুত এক রহস্যময় রোগে মারা যাবো আমি,যাদু থাকবে আমার বেহালায়'। কাব্যভাষা আর ভাবনায় এক রহস্যময় কম কথার মানুষ , একদিন শ্রীরামপুর স্টেশনে এক ভাঁড় চা খেতে খেতে বলে উঠলো , মশাই নিকুচি করেছে জনপ্রিয় কাব্যের , কেমন করে কবিতা হয় জানেন ? আমি বললাম, বলোনা শম্ভুদা
'মশাই সব্বাই পরীক্ষার খাতায় লিখছি, জমা দিয়ে চলে যাবো , চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর দেখা হবে। সারবস্তু থাকলে পাশ নাহলে গোল্লা'৷ কথা শেষে আর একভাঁড় চা নিল শম্ভুদা।
প্রয়োজনকে তাচ্ছিল্য করা অকপট তীক্ষ্ণ কথার এই মানুষটি নিজস্ব ক্ষেত্রটি নিয়ে মাথা উঁচু করে অনুজদের পাশাপাশি অগ্রজদেরও সমীহ ও ভালোবাসা অর্জন করে নিয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু অনেক তির্যক চোখের দৃষ্টিও তাকে আক্রমণ করেছে। অনেকে তাকে নিঃসম্বল দরিদ্র বলে চরম উপেক্ষা দেখিয়েছে কিন্তু ' সাড়ে পাঁচ ফুট ' শম্ভুদার মধ্যে যে মহার্ঘ্য বীজটি ছিল তা অনেক ধনীর নেই।
১৯৮৯-৯০ সালে প্রথম সাক্ষাৎ পরিচয় ৷ কবি মঞ্জুষ দাশগুপ্তর ১০ নম্বর পোদ্দার কোর্টের অফিস ঘরে ৷ বাইরে সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল ৷ মঞ্জুষদার সাদর আহ্বান - আরে শম্ভু এসো এসো , একদম ভিজে গেছ যে , বোসো , চা খাও , অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম মানুষটার দিকে। মঞ্জুষদা পরিচয় করিয়ে দিতেই বুঝলাম এই তাহলে কবি শম্ভু রক্ষিত ! সাতের দশকে শুনেছিলাম ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার প্রতিবাদ করে পত্রিকা প্রকাশ করায় জেলে যেতে হয়েছিল তাকে। সেই তরুন বয়সে প্রথম দর্শনে যাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে মনে হয়েছিল , পরবর্তীকালে বুঝেছিলাম বহু সাধনা করেও সব আগাম হিসেব তছনছ করা এমন প্রকৃত মানুষ হতে পারা যাবে না। ঢাল তলোয়ারহীন নির্মোহ নিঃসম্বল এক মানুষ ৫০ বছর ধরে একটা লিটল ম্যাগাজিন চালিয়ে গেল ! মঞ্জুষদার উপদেশেই আমার প্রথম বই "নতুন জলের গন্ধ" শম্ভুদা প্রকাশ করেছিল "মহাপৃথিবী" থেকে। তার ব্যাগে অনেক পত্রপত্রিকা আর বইএর সঙ্গেই থাকতো "নতুন জলের গন্ধ "৷
তারপর অনেকবার এসেছে আমার বাড়িতে। দুপুরে একসঙ্গে খেতে খেতে দেখেছি নিজের কবিতার মতই রহস্যময় "সেই ঘাসওয়ালা" মানুষটিকে ৷ 'বিস্ময় ০০০ তার দেহ থেকে গজাচ্ছে '। মনে মনে যেন 'কখনও আওড়াচ্ছে ; আলাউকম আবশো আমহারাঞ্চা আউকাল্লে '। দূরে ভুবনডাঙার মাঠ জুড়ে ডানা মেলেছে শম্ভুদার কবিতার শব্দরা। ভীষণ তীক্ষ্ম তাদের দার্শনিক ভঙ্গিমা। শম্ভুদা দু'হাত তুলে বলছে 'কবি সূর্য তারকার মতো এই ব্রম্ভান্ডকে আজও নিয়ন্ত্রিত করছে '৷ ও শম্ভুদা প্যান্টের পিছন দিকটা ছিঁড়ে গেছে যে ! 'হুম বসতে গিয়ে ছিঁড়ে গেল। নির্লিপ্ত উত্তর !
কাব্যভাবনায় স্বতন্ত্র শম্ভু রক্ষিতের মূল্যায়ন হল না ৷ হঠাৎ দেখছি স্বর্ণকৌপিন পরে জোছনায় শম্ভুদা যাচ্ছে এক নতুন সমুদ্রপথের দিকে ৷ নিজস্ব ভাষাজগৎ থেকে আপাত মায়াবী চোখ দুটো গর্তের ভিতর থেকে রহস্যময় ভাবে তাকিয়ে আছে মহাপৃথিবীর দিকে ৷ হাওয়ারা শম্ভুদার জীবনগল্প নিয়ে কত কানাকানি করছে ! কত কলম হাঁটছে কাগজে কাগজে ৷ গানগুলো শম্ভুদার প্রতিকৃতি হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে হাওড়া থেকে বিরিঞ্চিবেড়িয়া হয়ে পৃথিবীর গন্ডি ছাড়িয়ে মহাকাশের দিকে..এক বিষন্ন যাদুবেহালায় বাজছে কষ্টরাগিনী ৷ বুকের ভিতরে তখন " প্রিয় ধ্বনির জন্যে কান্না" ...