মাতৃসত্য - নন্দিতা সিনহা

বাবা ছাতার হাতল ধরে মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে বললো, ওকে বলে দাও আজ থেকে আর স্কুলে যাবার দরকার নেই। আমি ভৈরব কে খবর দিচ্ছি।
শ্রাবনের গভীর কালো মেঘের মতো বাবার মুখ,গলার স্বরে জলদ গর্জন,আমি ভিজে পরাশ্রয়ী লতার মত কাঁপছি...বিদ্যুৎ চমকের মত সপাত করে মায়ের রান্নার খুন্তি এসে পরলো গালে
কতটা বৃষ্টি হলে ধরণীর গর্ভের উত্তাপ শান্ত হয়?

নাসির বললো, ইমন এই মেঘ মাথায় নিয়ে বেরোলে তুই ভিজে যাবি, জ্বর থেকে উঠেছিস, এই মাত্র কয়েকদিন হলো ।
-যাবো তো যাবো,তোকে ভাবতে হবে না...
আমার ওপর তোর এত রাগ কেন রে? কি করেছি আমি?
কেন? তুই জানিস না?

মাধ্যমিক পাশ করে মেয়েরা উচ্চমাধ্যমিক পড়তে আসে বয়েজ স্কুলে। চকিতে মুখ তুলে তাকানোর মুহূর্তে ভালো লেগে যায় হয়তো কোন সহপাঠীকে।ইমনের ও লেগে যায়। কিন্তু তীব্র শাসনের বেড়া টপকে কথা বলার সাহস সঞ্চয় করতে পারেনা ।ক্লাসে সাইড বেঞ্চে বসে ডানদিকে তাকালে হঠাৎ হঠাৎ চোখে পরে যেত তার একটা সরল রেখার শেষ প্রান্তে দুটো চোখ এই দিকে ...এমন চেয়ে দেখাকেই বোধ হয় বলে দৃষ্টিসম্পাত।
ভিতরের কুঁড়ি গুলো একটু একটু করে পাঁপড়ি মিলতে থাকে।
ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে ইমন যেদিন বকুনি খেল সেদিনই গুঞ্জন উঠলো সহপাঠীদের মধ্যে...
ইমন উত্তর দিতে পারল না? পড়া শোনে নি? কিন্তু কেন?
মিতা টিফিনের সময় হাত ধরে বলল চোখ মটকে-- কি ব্যাপার?
যদিও ব্যাপার কিছুই নয়, তবুও হাসির ফোয়ারা ছুটলো।
তখন সে জানত না কি গভীর কান্নার অঙ্কুরোদগম হলো ওই হাসির ঔরসে!
একটু পরেই পল্লবী এসে বললো,--ওর নাম জানিস?
না না
ওর নাম নাসির ।
নাসির !!!
ইমনের চকিত দৃষ্টির ভাষা পড়তে নাসিরের ভুল হয় নি। তার চেয়ে থাকা অটুট থাকলেও আর তাকাতে পারত না ইমন।তার হয়ে দেখা টুকু দেখে নিতো মিতা।
দৃষ্টির শুধু ভাষা নয় ,কান ও আছে।জানতো না তারা।কানাকানি হতে হতে
একদিন বাথরুমের দেওয়ালে লেখা হলো ইমন+...
বিশ্বাস কর আমি জানি না কারা লিখেছে
কিন্তু কি ভীষণ মিথ্যা সেটা তো আমি জানি
এক অতলস্পর্শী ভালোবাসা দুটো চোখের তারায় নিয়ে নাসির বললো,সব সত্যি সত্যি মিথ্যে?
তুই আমার পথ আটকাস না ,যেতে দে আমাকে
প্লিজ ছাতা টা...

গ্রামে একমাত্র ভরসা বিনয়ভূষণ বাবু নিজেই অসুস্থ।বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা নেই। গতকাল রাতে বাবার ভয়ানক অসুস্থতার খবরে ভোর হতেই চলে এসেছে ইমন রামনগরে। দুটো চোখ জবা ফুলের মতো লাল। প্রায় সংজ্ঞা হীন।
কি হবে মা? কাকে দেখাবো এখন?
দিশাহারা লাগে ইমনের।গ্রামের বাড়ি থেকে তার টালিগঞ্জের শশুর বাড়িতে নিয়ে যেতে সে এক্ষুনি পারবে না। তার জীবন মানে তো এক অধীনতা মূলক মিত্রতা নীতি। তাদের অনুমতি ছাড়া ...সেও তো সময় সাপেক্ষ। অথচ এক্ষুনি ডাক্তারের প্রয়োজন।
বাবা একবার কি যেন একটা বললো।
কি বলছো বাবা? কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়েও কিছু বুঝতে পারলো না সে। মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকালো। মা আবার জিজ্ঞেস করলো,কি বলছো ? বলো?
ঠোঁটের কাছে মুখ নিয়ে শুনে বললো...নাসির?
বাবা মাথা নাড়লো।
বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে এলো একটা নাম।
নাসির?
মা বললো, ও তো ডাক্তারি পাশ করে এখন প্র্যাক্টিস করে হাসনহাটি তে।
দেওয়াল লিখনের খবর বাবার কানে পৌঁছে গিয়েছিল। সারাবাড়িতে আগুন ধরে গেল। ঘটক ভৈরব কে ডেকে কুড়ি দিনের মধ্যে সব পাক্কা। বিয়ে হয়ে গেল। কনকাঞ্জলির সময় অন্ন ঋণ শোধ দেবার সময় মা হিসহিস শব্দে মাথা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে ছিল ,সারাজীবন যেন ওই বিধর্মীর নাম টাও মুখে না আনি, মুখ দর্শন না করি ।

আধ ঘন্টার মধ্যে নাসির এসে গেল। প্রেসার চেক করে বললো, কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে কাকিমা,অবস্থা ভালো লাগছে না। ইমন কে জানান নি?
পাশের ঘরে দু হাতে মুখ ঢেকে ইমন তখন মাতৃসত্য পালন করছে...
বৃষ্টি নামলো মুসলধারায়...
কতটা বৃষ্টি নামলে মরুভূমির তৃষ্ণা মেটে?