বিকল্প ভুবন নির্মাণ শিল্পী: দেবেশ রায় - গৌতম সাহা

চলে গেলেন দেবেশ রায় সময়ান্তরে। থাকলেন না এই সমকালীন পৃথিবীতে। আমরা এটা শুধু যে ইহকালীন অর্থে বলছি তা নয়। আমরা জানি তাঁর সেই ব্যাপ্তি। আমরা পড়েছি 'যযাতি',' মানুষ খুন করে কেন', 'সময়  অসময়ের বৃত্তান্ত ', লগন গান্ধার ', ' তিস্তাপারের বৃত্তান্ত', ' তিস্তাপুরাণ', 'বরিশালের যোগেন মণ্ডল' কিংবা সাম্প্রতিক সাংবিধানিক এজলাস। এও জানি ১৯৯০ সালে তিস্তাপারের বৃত্তান্ত লেখার জন্য তিনি সাহিত্য একাদেমি পেয়েছেন। তিনি শুধু উপন্যাস লেখেননি। লিখেছেন প্রবন্ধ, উপন্যাস নিয়ে আলোচনার বই। যা মনে পড়ছে তা হল - উপন্যাস নিয়ে কিংবা উপন্যাসের নতুন ধরণের খোঁজে। সে তো আরও অনেকেই অনেক কিছু লিখেছেন তবু তাঁকে পাঠ করার একটা বিশেষ আর্জি আসে কেন?  এই যে আলাদাভাবে পড়তে চাওয়া - তার নানাবিধ কারণ বিদ্যামান।
আমরা যখন কোনো কবিকে শিল্পীকে বা উপন্যাসিককে পৃথকভাবে পড়ি তখন তো আসলে বুঝে নিতে চাই তাঁর লেখার ধরণ আর  তার আগেও তিনি কোন বিষয় নিয়ে গড়ে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব জগৎ।  তিনি যে জগৎ গড়ে তুললেন তা যে একবারেই স্বতন্ত্র তা হয়ত নয় -সতীনাথ ভাদুড়ি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর পূর্বসূরী। তবু বলা যায়, তিনি একজন বিরল ব্যতিক্রমী যিনি কাহিনির আর্কেটাইপ ভেঙে দিলেন। শুধু ভেঙে দিলেন না গড়ে তুললেন এক স্বতন্ত্র উদ্বেগ যা রীতিমত ভাঙচুরের সাক্ষী হয়ে থাকল এই উপমহাদেশের ভাববিশ্বে।তিনি বারংবার প্রশ্ন করেছেন নিজেকে, নিজের লেখাকে, এমনকী একটি বই লিখে তাকে প্রকাশ করেও তাকে নস্যাৎ করেছেন অনায়াসে। ভাবনার দাসত্বকে তিনি মুক্তি দিতে চেয়েছেন। মার্ক্সসীয় চিন্তাকে তিনি লালন পালন করতেন কিন্তু পার্টির শাসনকে অনায়াসে প্রয়োজনে উপেক্ষা করার মতো সাহসী ছিলেন । অভীক মজুমদারকে মেনে নিয়ে বলতে চাই ‘ স্বাধীনতা উত্তর, বিশেষত বিশ শতকের শেষ দশকগুলিতে দেশদুনিয়ার পরিবর্তমান পরিস্থিতি , উত্তর-উপনিবেশিক পরিমণ্ডল, পুঁজির নতুন নতুন জটিল কৌশল, প্রভুত্ব আর কর্তৃত্বের নতুন নতুন নকশা , রাষ্ট্রক্ষমতার নিষ্পেষণ আর নয়া জীবন বাস্তবতা তিনি যত্নে ধরেছেন কথাসাহিত্যে’। তিনি অবশ্য নিজে কথাসাহিত্য বলতে চাইতেন না- বলতেন আখ্যান। আখ্যানের ভেতর একটা ইতিহাস হয়ত লুকিয়ে থাকে যেখানে তারা ব্রাত্য।  লোকায়ত জীবনের সেই রূপকে ধরার চেষ্টায় নিয়ত ব্রতী ছিলেন। তিস্তাপারের বৃত্তান্তের আমরা মনে রাখব কারণ সে লিখেছে প্রত্যাখ্যানের ভেতর কোনো চটকদারিত্ব নেই আছে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির নিখাদ শেফালিগুচ্ছ। প্রবন্ধ সংগ্রহের ভূমিকা সমরেশ রায় ও স্বপন পাণ্ডা যখন লেখেন – দেবেশ রায়, প্রাচীন সাহিত্যের লতাগুল্ম আচ্ছাদিত ছায়াচ্ছন্ন পথে যেমন আমাদের সঙ্গ দেন, আখ্যানেই পথ চেনান, প্যারীচাঁদের বাংলা উপন্যাসের প্রথম দ্রষ্টা ঘোষণা করে মিখাইল রাখাতিনের' ডায়লজিক ইমাজিনেশন' এর সাক্ষ্যে 'আলালের ঘরে দুলাল' যে 'উপন্যাসের বিবরণ ' আর 'বহুস্বর ' এর উপস্থিতি আছে তার প্রমাণ পেশ করে আমাদের স্তব্ধ করে দেন, তেমনই নতুন করে পড়িয়ে নেন রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস'। তিনি প্রকৃত অর্থেই আমাদের উজ্জীবিত করেন তার সাবালক ভাষার কাঠিন্যে বা মাধুর্যে  এবং তিনি কখনো পরিকল্পনা করে লিখতে পারতেন না বরং লিখতে লিখতে পরিকল্পনা করতেন৷ তাঁর উপন্যাসের ভেতরেও যেন রয়েছে অন্তর্ঘাতের এক মৌরুসিপাট্টা।  তিনি যখন লেখেন তখন তিনি শুধু লেখকই নন, একজন সংশয়ী পাঠক। নিজেকে  খুড়তে খুড়তে তিনি বলেন পূর্ববাংলার মানুষজন,  জলপাইগুড়ির মানুষজন, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষজন, তিস্তানদী, চা শ্রমিক তারা কেউ নয় তারা নানাভাবে একটা ভাষা খুঁজে মরছিল।  দেবেশ তাদের তুলে আনলেন সাদা পৃষ্ঠার কালো অক্ষরে৷ তিনিই তো বললেন - 'শম্ভু মিত্রের মহত্ত্ব এখানেই যে তিনি আর্তনাদের নাটকীয়তাকে ধরতে পেরেছিলেন অভ্রান্ততায়'৷ দেবেশ রায় সম্পর্কে আমরা সেই একই কথা বলতে পারি।  তিনি চলমান সাহিত্যের মূল স্রোতের পাশাপাশি  একটি বিকল্প ভুবন নির্মাণ প্রয়াসী ছিলেন আজীবন, ভাষার দ্যোতনা দিয়ে কারণ তিনি মনে করতেন - ' সাবালক ভাষা ছাড়া সাহিত্য হয় না'।

কিন্তু তাঁর মৃত্যুর (১৪ মে ২০২০ ) পর একটাই প্রশ্ন যিনি ছিলেন জনারণ্যে একা সেই মানুষটির যোগ্য উত্তরসূরী কে হবেন যিনি উপন্যাসে আনতে চেয়েছেন অন্য শৃঙ্খলা।