ঠিক বেরোবার মুখে মাসিমার ফোনটা এল। ‘একটু দাঁড়িয়ে যাও অনন্যা,আমি আসছি ।‘
তখন ট্রাকে জিনিস উঠছে । আবার কি বলতে আসছেন মহিলা? সিকিউরিটি ডিপোজিটের টাকা অ্যাকাউণ্টে ট্রান্সফার হয়ে যাবে। আর এই মহিলার মুখদর্শন করার কোনো ইচ্ছেই নেই অনন্যার। সাতদিনের নোটিশে বাড়ি ছাড়ার হুকুম দিতে একটুও সঙ্কোচ হয় নি । হ্যাঁ,এগ্রিমেন্টে এমন একটা ক্লজ ছিল। কিন্তু সবাই অন্তত একমাস সময় দেয়। তাছাড়া পুণে থেকে এসে একটা একলা মেয়ে থাকছে,তাকে সাতদিনের মধ্যে এমন উঠে যেতে বলে কেউ?
অন্য দুজন ফ্ল্যাট-মেট শুভাঙ্গী আর অনুপ্রিয়া সহজে রাজি হয় নি। শুভাঙ্গীর বন্ধু, রোহণ নাম বোধহয় ছেলেটার,কাউন্সিলরকে পর্যন্ত নালিশ করেছিল । কিছুই হয় নি। মাসিমা এসব ব্যাপারে আরো পোক্ত। ওয়ার্ড-কমিশনার থেকে পুলিশ-কমিশনার সবার সঙ্গে জানাশোনা।
কাউন্সিলরের সামনেই শুভাঙ্গীকে বলেছিলেন মাসিমা, ‘তুমি বাড়িতে থাকো কতটুকু? রাত একটা দেড়টায় বাড়ি ফিরছ,এই মেয়ে দুটি না থাকলেই বাড়িতে ছেলেবন্ধু আসছে। খবর রাখি না আমি? এগ্রিমেণ্টের কোন ক্লজ মেনে চলেছ?’
অনুপ্রিয়া তো সেই রাগেই মাসিমার অ্যাকোয়াগার্ড মেশিনটা ইচ্ছে করে ভেঙে দিয়েছে,‘বুড়িয়া কো অচ্ছা সে সতানা হ্যায় ।‘ অবশ্য অনুপ্রিয়ার স্বভাবই অমন । ভাড়া দিয়ে থাকি,বাড়ির জিনিস নিয়ে আদিখ্যেতা কিসের? রোজ ইচ্ছে করে মাসিমার অমন চমত্কার কাঠের ফার্নিচারের ওপর ভিজে কাপড় শুকোতে দিত । রান্নাঘরের সুন্দর গ্রানাইট স্ল্যাবের ওপর ছুরি দিয়ে তরকারি কাটত। দেয়ালে হাত মোছা,বাথরুমের টাইলসের মেঝেয় দাগ। একবার তো দরজার তালাটাই হারিয়ে ফেলল। মাসিমা অবশ্য তারপর দরজায় ইয়েল-লক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
মালতী মাসিমা। পুণের বাড়ির বাগানে সন্ধ্যামালতীর গাছ আছে একটা। খানিকটা নলের মত দেখতে, মেজেণ্টা আর পিঙ্ক ফুল। একই গাছে দু’রঙের ফুল ফোটে। সন্ধ্যায় ফোটে,সকালেই কুঁকড়ে শুকিয়ে যায়। পুণেয় অনেক বাড়ির বাগানেই ছিল। লাল,হলুদ,সাদা নানা রঙের সন্ধ্যামালতী । ঝলমলে রঙিন ফুলের দুনিয়ায় নেহাত সাধারণ একটি ফুল। মুখচোরা সাদামাটা।
কলকাতার ল্যান্ডলেডি মালতী মাসিমা ঠিক তার বিপরীত । ক্যাটক্যাট করে কথা বলেন,মুখটা একটু নিচু করে চশমার ওপর দিয়ে কড়া চোখে তাকিয়ে থাকেন যখন,অনুপ্রিয়ার মতো কটকটি মেয়েও ভয় পায় ।
বাবা অবশ্য বলে, ‘সোজাসুজি কথা বলার মানুষরা কিন্তু আদতে ভালো হয় ।‘ তবে এমন সাতদিনের নোটিশে বাড়ি ছাড়ার কথা বলায় বাবার ধারণাটাও বদলেছে । মা তো বেশ ভয়ই পেয়েছে,‘কোথায় একা একা বাড়ি খুঁজবি রুপু? আমি কলকাতায় চলে আসি?’
অনন্যা বারণ করেছে,এসময় মা এলে আরো মুশকিল । মা তো কলকাতার কিছু চেনেই না। বাবা এসেও লাভ হবে না। তার চেয়ে ইন্টারনেট ভালো। এখন অনেক সুবিধে । তবে মাসিমাও একজন ব্রোকারের ফোন নম্বর দিয়েছেন,‘চাইলে এই ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। ও তোমার মতো করে বাড়ি খুঁজে দেবে ।‘
নিজেই বিপদে ফেলে সাহায্য করার ছলনাটুকু করার দরকার কি? মুখে অবশ্য বলে নি কিছু। শুভাঙ্গী চলে গেছে প্রায় সাথে সাথেই,ও এমনিও এখন প্রায় লিভ-ইন করছে রোহণের সঙ্গে। অনুপ্রিয়া উত্তরপ্রদেশের মেয়ে,ওদের একটা ঠেক আছে দমদমে । সেখানেই উঠবে বলে গেছে,যদিও অনন্যা তা বিশ্বাস করে নি। খুব উড়নচণ্ডী মেয়েটা। ক’দিন আগে হাসতে হাসতে গর্ভপাত করিয়ে এল । মা তো শুনে ভয় পেয়ে গেছিল,‘কাদের সঙ্গে থাকছিস রে রুপু?’
অবশেষে একটা পিজি পাওয়া গেছে। অফিসের কাছেই। আপাতত যাওয়া যাক। ঠিক বেরোবার মুখে ফোন। যাত্রাভঙ্গ আর কাকে বলে!
জিনিসপত্র প্যাকার-মুভারের গাড়িতে তুলে দিয়ে রেডিও-ক্যাব ডেকে নিল অনন্যা। মাসিমার জন্যে অপেক্ষা করবে না। চলেই যাচ্ছে,আর ভদ্রতা কিসের? সৌজন্য,ভদ্রতা,সম্মান দেখিয়েও তো লাভ কিছু হয় নি । আদর্শ বাড়িওয়ালীর ব্যবহার করেছেন মাসিমা । এখন হয়ত সরেজমিনে তদারক করতে এসেছেন,বাড়িতে ফার্নিচার ইত্যাদির তদারক । সিকিউরিটি ডিপোজিট থেকে কিছু টাকা কেটে নেবার অজুহাত তৈরী হবে। আর কিছু না।
ক্যাব-ড্রাইভার ফোন করল,‘জাস্ট দু’মিনিট দূরে আছি,আসছি ।‘
তখনই নীল মারুতি গাড়িটা এসে দাঁড়াল। ‘জিনিস চলে গেছে অনন্যা?’
‘হ্যাঁ,আমার ক্যাব আসছে।‘ একটুও হাসে নি অনন্যা।
‘তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে এলাম অনন্যা। আর কবে দেখা হয়,না হয়।‘
দেখা করার দরকারই বা কি? ভাড়াটে-বাড়িওয়ালা সম্পর্ক,শেষ হয়ে গেছে।
‘সাতদিনের মধ্যে বাড়ি খালি করে দিতে বলে তোমায় বড্ড মুশকিলে ফেলেছি,আমি জানি। বাকি দুজনকে নিয়ে আমার কোনো ভাবনা ছিল না। কিন্তু তুমি খুব ভালো মেয়ে । তোমাকে আমি কষ্ট দিতে চাই নি। বিশ্বাস করো,আমার কিছু করার নেই আর । এবাড়িটা আর আমার নেই। এবাড়ি কেন, কোনো বাড়িই নেই । আমি বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাচ্ছি । মানে,চলে যেতে বাধ্য হচ্ছি ।‘
খটখটে শুকনো গলা,শুকনো চোখ। ‘আমাকেও এই সাতদিনই সময় দেওয়া হয়েছিল অনন্যা। রিটায়ার করার পর ছেলের নামে সব লিখে দিয়েছিলাম। দুটো বাড়িই। দিল্লী থেকে ফোনে বলল আমার ছেলে,ওরা বিদেশ চলে যাচ্ছে। কলকাতার দুটো বাড়ি বিক্রি করার জন্যে ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল নাকি । বিক্রির লোক পাওয়া গেছে ।‘
একটু হাসলেন মাসিমা,সন্ধ্যেবেলার মালতীর মতো উজ্জ্বল হাসি,খানিক পরেই কুঁকড়ে শুকিয়ে যাবে তা বুঝি মনেই নেই। ‘আমিও আজ বিকেলেই চলে যাচ্ছি । তোমার জন্যে একটা ছোট্ট উপহার এনেছি,এইটা দিতে এসেছিলাম ।‘
আর্চিস গ্যালারি থেকে কেনা সুন্দর কাপ,ফেয়ারওয়েল মেসেজ লেখা। মাসিমা একালের মেয়ের পছন্দ খুঁজতে নিজে আর্চিস গ্যালারি গেছিলেন। আর একটা রূপোর গণেশ। ‘জানি,তোমরা ঠাকুর দেবতা মানো না। কিন্তু গণেশ সঙ্গে থাকা শুভ।‘