শূন্য হাতে ফিরি হে - রজত চক্রবর্তী

পট পট করে আওয়াজ হচ্ছে। কচুরিপানা পাতাগুলোর ঠিক নিচে আঙুল-ফুলো জায়গায় পা দিয়ে চাপ দিলেই পট পট। একটু শক্ত মাটিতে হচ্ছে পট পট। পড়ে থাকা গুচ্ছ  কচুরিপানায় পায়ের চাপে পট পট পট, পটকা। আর নরম মাটিতে হড়হড় পা, হাঁটু অবধি মাটি-কাদায়। কালচে মাটি গঙ্গার । উপরের লেই লেই কাদায় কালোর ভাব একটু কম হলেও ভেতরের মাটি বেশ কালচে। প্রায় হাঁটু অবধি সবার কাদা-মাটি শুকিয়ে সাদা। ভেজা হাফ-প্যান্ট শুকোচ্ছে পোঁদে। নিতাইয়ের কালো সুতোয় বাঁধা হরতকি, মাদুলি সব পোঁদের ভাঁজে লটপটাচ্ছে। তার নিচে নেমে গেছে প্যান্ট। সেই দেখে আমি প্যান্ট টানি। নিরাপদ খ্যাক খ্যাক হেসে ওঠে, কাদা থেকে তুলে আনে সিংহের নুঙ্কু। গোলাপী রঙ কিছুটা উঠে গেছে ঢেউয়ে ঢেউয়ে । খড়বাঁধা সিংহ পড়ে আছে। কাৎ। ইতস্ততঃ ছড়িয়ে দূর্গার শাড়ি, সোলার গয়না। সব বিবর্ণ। পচে গেছে। পচা পচা গন্ধ । কাঠির ডগায় মাটির নুঙ্কু পায়ের খাঁজে উপুড়। শুকনো পাড়ে। উদোম পড়ে আছে সিংহ কাদায় থেবড়ে। অসুরের ধড়। কতো কিছুই পড়ে আছে। গঙ্গার পাড়ে পাড়ে কাদামাটির উপর। পচা গন্ধ আসছে। মোষের উপর শকুন। নাড়িভুঁড়ি । পাশে কুকুর কয়েকটা, কি একটা নিয়ে টানাটানি করছে। পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছি। হেঁটে চলেছি ফেলে দেওয়া, পচা, বিবর্ণ ইতিহাসকথা মারিয়ে, এড়িয়ে, পেড়িয়ে, পাশকেটে।
শাস্ত্রে বলে এক নদীতে দু'বার স্নান করা যায় না। এক মানুষের সাথে দু'বার মোলাকাত হয়না। কথাটা ভয়ংকরভাবে সত্যি বলে মানিনি কখনও । কারন, মানতে চাইনি বলার চেয়ে বলা ভালো মানতে ইচ্ছে করেনি। ভয়। স্রোত পাল্টে দেয় জলের ধারা মুহূর্তে মুহূর্তে । জীবন ধারাও। সকালের নদী বিকেলে আলাদা। সকালের মানুষ বিকালে আলাদা। রাতের মানুষ দিনে আলাদা। আলাদা আলাদা মানুষ, আলাদা আলাদা নদীতে অবগাহন। ডুব, বা ডুব দেবার চেষ্টা অথবা ডুবের প্রকল্পনা নিয়েই চলেছি। শুধু চলেছি। ডুব দেওয়া হল না আর! শুধু পাড়ে ওঠার আকূতি নিয়েই কেটে গেছি সাঁতার । দুই পাড়ে আবর্জনার স্তূপ । নদী আনে বয়ে বয়ে, রেখে যায় পাড়ে পাড়ে । কোথাকার ঘটে যাওয়া অতীত। সভ্যতার পলিরেখা এবং বলিরেখা। সহস্র ধারায় রক্তরেখা। লড়াইয়ের নোংরা কাঠামো, জীর্ণ জীবনযাত্রার ছেঁড়া-খোঁড়া ইতিহাস মালা। ইতিহাসের লাশের স্তুপ নদীর পাড়ে পাড়ে । তবুও তবুও সাঁতার না কেটে বা বলা ভালো সাঁতার এড়িয়ে পাড় ধরে ধরে চলি। পাড়েই আঁকি জীবনের আলপনা। জানি ভেসে যাবে রেখা।
বিদিশা আমার চোখের ভেতর ওর দুটি চোখ ডুবিয়ে বসে রইল। ছলাৎ ছল, ছলাৎ ছল। খুব খুব ভয়ের গোধূলি নেমেছিল সেদিন নদীটির তীরভূমে। সমস্ত গাছে গাছে সমস্ত পাখীরা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। বাতাস থেমে গেল নদীর পাড়ে । স্রোত ছিল শুধু। ডুব দেবার গাঢ় ডাক, উপেক্ষার অহংকার ছিল না। ছিলনা জয়-পরাজয়ের ইতিহাস রচনার। ডুব দিয়েছিলাম গভীরে । খুব গভীরে । গহনে। ডুব থেকে এক সময়ে উঠে দেখি । নদী পাল্টে ফেলেছে তার রঙ, তার স্রোতের প্রকৃতি। বিদিশার চোখে বাসার ঠিকানা, ভাসার নয়। বিদিশা আর আমি অথবা আমি আর বিদিশা অথবা আমরা ও বিদিশারা নদীর পাড় ধরে হেঁটে চলেছি তারপর থেকেই । পাঁক, কাদামাটি, পচা কুকুর, মরা গরু, দুর্গন্ধ সব সবকিছু এড়িয়ে এড়িয়ে যেতে যেতে বুঝি ভারসাম্যের ব্যাখ্যা লেখা হয়ে আছে নদীটির তীরে তীরে। পা পিছলে পিছলে যাচ্ছে । কাদা মাখামাখি । দু'হাত দু'পাশে ছড়িয়ে ব্যালান্স করে করে চলি। নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলি। উফফফ্ কতোদিন কতোদিন বিদিশার হাত ধরা হয়নি সজোরে শুধু শুধুমাত্র পথ চলার মোহে! ভারসাম্য রাখতে গিয়ে । হাত ধরা হয়নি কারো! কখনও কি ধরা ছিল? হাত? কারো?
প্রকল্প-প্রভাব!!
পুজো সাঙ্গো হওয়া প্রতিমা পড়ে থাকে নদীর পাড়ে। বিবর্ণ । উলঙ্গ । খড় বার করা। শুধু মুখখানি জেগে থাকে। একদিন পূর্ণ প্রতিমা ছিল, এই সংবাদ লেখা আছে ছেঁড়া-খোঁড়া অলঙ্কারে অলঙ্কারে । তবুও তবুও সাঁতার কাটার বদলে আমরা নদীর পাড় দিয়ে চলি। নদী তার পাড়ে পাড়ে জমিয়ে রাখে, তুলে রাখে সমস্ত গরল। নিতাই ছড় ছড় করে হিসু করে। হ্যা হ্যা হাসে। স্পর্ধায় বিরুদ্ধ স্বর শোনা যায় । উদোম বাতাসে নিতাইয়ের স্বর স্বরলিপি হয়ে নদীর জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় । চারিপাশে খোল করতাল বেজে ওঠে। মালা আসে। বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ ওঠে ধূপের ধোঁয়ায়। ফিসফাস কথা উড়ে যায়, মাঝ নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিল...ফেরেনি আর... ইত্যাদি কথন।
বিদিশাও ফেরেনি আর। নিতাই ফেরেনি আর। বন্ধু, পরিজন! কেউ কি ফিরে আসে! আসা যায়! তবুও পথের দিকে তাকিয়ে দরজায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে খোলা আকাশ আর টিম টিম পিদিম। ফিরে আসছে কেউ কেউ বা ফিরে আসার খবর আসে কোনো পথে পথে বাতাসে বাতাসে ...
এক নদীতে দু'বার স্নান করা যায় না। দু'বার স্নান করা যায় শুধুমাত্র পুকুরের বদ্ধ জলে। এক মানুষের সাথে দু'বার সাক্ষাৎ হয় না। হয়না বলেই সেজে উঠি, সাজিয়ে তুলি, এতো এতো সাজানোর আয়োজনকথা দিস্তা দিস্তা পাতায় পাতায় নিযুত শব্দের নিখুঁত ব্যবহার উড়ে উড়ে উড়ে যায় দিকবিদিক...
আমাদের কোথাও যাওয়া হয়না বলেই কোথা থেকেও ফিরে আসতে পারিনা আর...শুধু ভাবি ফিরছি পথে পথে...শুধু ভাবি গেছিলাম কোথাও না কোথাও ...