ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বোঝায়, এ প্রশ্নে বারবার নিজের মুখোমুখি দাঁড়াই। বিবিধ জননেতানেত্রীর আচরণ থেকে এরকম ধারণা হয় যে, সব ধর্ম মান্য করাই ধর্মনিরপেক্ষতা। মনে হয়, এটা তো সাপ ও ব্যাঙের গালে চুমুর নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ ধর্মকে মান্যতা দেওয়া। বৈরী দুই ধর্মকে আলিঙ্গন করা মানে দুটোকেই উৎসাহিত করা, মদত দেওয়া। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ পাই আনিসুজ্জামানের এই উক্তিতে: ধর্ম না মানার স্বাধীনতা। ধর্ম সম্পর্কে, ধর্মাচার সম্পর্কে এই মনোভঙ্গি, বাধ্যতামূলক মান্যতাকে এই প্রত্যাখ্যান জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নির্ভরে গড়ে ওঠা মনের চিন্তা, যুক্তি ও বুদ্ধির নিজস্ব জগতের পাশে দাঁড়ায়। আনিসুজ্জামান হয়ে ওঠেন আমার শ্রদ্ধেয়জন, আমার শিক্ষক। অনেক উদার দেখেছি, 'বিপ্লবী' দেখেছি, ধর্মের প্রসঙ্গ এলে আমতা আমতা করে, তোৎলায়, বা বাক্যের কসরতে এড়িয়ে যায় বা সরাসরি কোনো সম্প্রদায়কে সমর্থন করে বসে। আনিসস্যার জন্মসূত্রে এমন একটি সম্প্রদায়ের, যেখানে গোঁড়ামি প্রায় অবিভাজ্য হয়ে আছে। কিন্তু পারিবারিক ঐতিহ্যে ও ব্যক্তিগত সাধনায় তিনি সম্প্রদায়-চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অবস্থানে বলতে পারেন: ধর্ম মানার যেমন স্বাধীনতা আছে, না মানারও স্বাধীনতা থাকা উচিত। তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতার পূজারী। বাংলাদেশে এমন অসাম্প্রদায়িক মন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রবক্তা সত্যি মুষ্টিমেয়। একই সঙ্গে আনিসুজ্জামান বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ভাষ্যকার। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যখনই আঘাত এসেছে, কলমকে শাণিত হাতিয়ার করে তুলেছেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর তিনটি বিখ্যাত বই : বাঙালি সংস্কৃতি ও অন্যান্য, বাংলাদেশে পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আমার একাত্তর। মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য আনিসুজ্জামানের স্মরণীয় চিন্তাগ্রন্থ। আত্মকথা দুটি : কাল নিরবধি ও বিপুলা পৃথিবী। একটি কথা বলতেই হয়, বাংলাদেশের একটি শাসকদলের ঘনিষ্ঠতা তাঁকে কিছুটা বিতর্কিত করেছে। সে প্রসঙ্গ এখান থাক।
আনিসস্যার প্রয়াত হলেন ৮৪ বছর বয়সে। তাঁর চিন্তভাবনা থেকে যাবে যতদিন বাঙালি থাকবে।