কাজী আবদুল ওদুদের সৃষ্টিতে বাঙালির সমাজচিত্র - গৌতম রায়

মুক্তবুদ্ধির উপাসক কাজী আবদুল ওদুদের ( ১৮৯৪-১৯৭০) সৃষ্টি ঘিরে আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্য নিয়ে ই বেশি আলোচনা করি।কথাসাহিত্যে ওদুদের অবদান ঘিরে আলোচনা প্রায় হয়-ই না। ওদুদের সৃষ্ট কথা সাহিত্যে উনিশ- বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজের যাপনচিত্রের যে ইতিহাসনির্ভর উপাদান রয়েছে তা কেবল সাহিত্যের অঙ্গ নয়। সেই উপাদান বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক জ্বলন্ত উপাদান। ছাত্রজীবনে লেখা   ' মীর পরিবার'( প্রকাশকাল-১৯১৮।প্রকাশক - নূর লাইব্রেরী।কলকাতাতে সে যুগের এই প্রকাশনীর কর্মকর্তা ছিলেন মঈনুদ্দিন হোসাইন।তিনি নজরুলের প্রথম যুগের প্রকাশক ছিলেন।) গ্রন্থের প্রতিটি উপস্থাপনার ভিতর দিয়েই একদিকে সমাজচিত্র অপর দিকে বাংলার সমাজবিকাশে বাঙালি মুসলমানের অবদান, তার পাশাপাশি বাঙালি মুসলমান সমাজে নারী শক্তির বিকাশের যে চিত্রকল্প ওদুদ রচনা করেছিলেন, সেই দলিল থেকেই বোঝা যায়, ক্ষমতাবানেরা কেন আতঙ্কিত হয়ে উঠছিল বাঙালি মুসলমানের সম্যক আত্মবিকাশে।
মীর সাহেবের পরিবারের খুঁটিনাটির ভিতর দিয়ে বাংলায় আমজনতার ভিতরে শিক্ষা বিস্তারে বিশ শতকের সূচনা লগ্নে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান পরিবারের অবদানের যে অনুপুঙ্খ বিবরণ ওদুদ রেখে গিয়েছেন, সেই চেপে রাখা ইতিহাস কিন্তু আজ ও সাধারণ মানুষের কাছে উন্মোচিত হয় না।ইউরোপীয় ইতিহাসকারদের ধারা অনুসরণ করেই স্যার যদুনাথ থেকে শুরু করে হালের সাবালটার্ন চর্চাকারীরা বাংলার তথা বাঙালির সমাজবিকাশে বাঙালি হিন্দুর ভূমিকা ঘিরে যতোখানি সোচ্চার, ততোখানি ই তাঁরা নীরব বাঙালি মুসলমানের অবদান ঘিরে। অথচ এই ইতিহাসকারদের নীরবতার যোগ্য জবাব লুকিয়ে আছে ওদুদের' মীর পরিবার' এর ভিতরে।
বাংলার ঘরে ঘরে যে ফয়জুন্নেছা, রোকেয়া, সুফিয়া কামালেরা রওশন আরাদের ভিতরে সুপ্ত ভাবে ছিলেন, সুযোগ মতো তাঁরা তাঁদের ভূমিকা সমাজের বুকে এঁকেছেন, ওদুদ তা খুব স্পষ্ট ভাবে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর কথা সাহিত্যের ভিতর দিয়ে। রওশন আরার ,' ছোট মিঞা ,একটু বড় কাজ আরম্ভ কর না।' - এই শব্দের ভিতর দিয়ে কেবল মুসলমান সমাজ ই নয়, এই সমাজের অন্তর্গত নারী সমাজের আলোকপ্রাপ্তির যে বিজয় বৈজয়ন্তী ঘোষণা করেছিলেন, তা বাংলা তথা বাঙালির এক উজ্জ্বল ঐতিহ্য।
পুঁথিগত শিক্ষাই যে সমাজপ্রগতির একমাত্র মানদন্ড হতে পারে না, কেতাবী বিদ্যার সাহচর্য না পাওয়া রওশন আরা যে আমাদের ঐতিহ্যের মূল থেকে শতফুল ফোটাবার অঙ্গীকার ধ্বনিত করেছিলেন-- বাঙালির ইতিহাসের এই গৌরব গাঁথার অনবদ্য লেখক ছিলেন মনীষী কাজী আবদুল ওদুদ। নারীর সামাজিক দায়বদ্ধতার সাথেই তাঁর পারিবারিক দায়বদ্ধতার শেকড় যে কতোখানি নিবিড় তা অননুকরনীয় ভাবে ওদুদ এঁকেছেন রওশন আরার নিজের নামে ইস্কুলের নামকরণের প্রস্তাব উপেক্ষা করে প্রয়াত শ্বশুরমশাইয়ের নামে ইস্কুলের নাম রাখার ভিতর দিয়ে।' অবরোধ ' ই যে মুসলমান সমাজের একমাত্র ছবি নয়, চোখে আঙুল দিয়ে ওদুদ বিশ শতকের সূচনালগ্নের চরিত্র ইউসুফ- সুফিয়ার প্রেমের যাত্রাপথের আনন্দগানের ভিতর দিয়েও তা দেখিয়েছেন।  
আশরাফ হোসেন চরিত্রটির ভিতর দিয়ে উদীয়মান বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের সঙ্কটের যে ছবি ওদুদ দেখিয়েছেন, সে সম্পর্কে যদি সম্যক চর্চা আমাদের সারস্বত সমাজে হতো, তাহলে সামাজিক কূপমুন্ডকতা হয়তো এতো তীব্র হতো না।প্রেমের টানাপোড়েনি আশরাফের পরিবারের আশরফি আয়মাদারি, আলীগরে বিশ শতকের সূচনা লগ্নেও বাঙালি ছাত্রদের উপর অবাঙালিদের মানসিক রাগিং, পরিশেষে আশরাফের দায়বদ্ধতার প্রেমের রূপান্তর -- এমন সামাজিক ছবি , যার অন্তরালে লুকিয়ে আছে সেইসময়ের বাঙালি মুসলমান সমাজের একটি জীবন্ত ছবি- এইসব কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গিয়ে সুকুমার সেন থেকে অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়,কেউ ই কখনো উল্লেখ ই করেন নি।শরৎচন্দ্রের ' গফুর' কে নিয়ে বহু সন্দর্ভ রচিত হয়েছে।অবহেলিত  থেকে গেছে ওদুদের ,' করিম পাগলা'।সমাজ এই দিন মজুর করিমের কপালে দেগে দিয়েছিল ' পাগলা' র তকমা।সহায় সম্বলহীন এই দিন আনা, দিন খাওয়া মজুরটিকে ঘিরে কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষ ফাগুনের পালা ওদুদ যে ভাবে এঁকেছেন, আজকের দিনেও তার জুড়ি মেলা ভার।তারাশঙ্করের সৃষ্ট চরিত্রগুলির গলার গান ঘিরে রসিক জন বহু আলোচনা দিয়ে সমালোচনা সাহিত্যের অঙ্গন কে সমৃদ্ধ করেছেন। ভাবতে সত্যিই অবাক আগে এই রসিক জনের ' করিম পাগলা' জীবন ঘিরে হিম শীতল নীরবতা ঘিরে।
মার্কসীয় দর্শনের শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব ভারতের, বিশেষ করে বাংলাতে ধর্ম আর জাতপাতের নিগড়ের টানাপোড়েনে যে একটা নতুন দ্যোতনার ভিতর দিয়ে প্রতিষ্ঠার দাবি রাখে, তা ওদুদ বিশ শতকের সূচনা পর্বেই বুঝেছিলেন। তাই তাঁর ' করিম পাগলা' গল্পের ভিতরে যে করিম কে আমরা দেখি যুবক কৃষকদের কাছে বিশেষ আদরের মানুষ হিশেবে, সেই করিম ই কিন্তু মীরু মন্ডল আর ঝড়ু মাতব্বরের উপর্যুপরি আক্রমণে হাল ছেঁড়া নৌকা। শ্রেণী অবস্থানে তো করিম পাগলা আর ঝড়ু বা মীরুর ভিতরে কোনো ফারাক নেই। তবু কেন করিমকে, তাঁর কাছের কৃষকদের আক্রান্ত হতে হয় এমন মানুষদের ই কাছে, যাঁরা শ্রেণী অবস্থানে সর্বহারা? ওদুদের উপর কি মওলানা রেওয়াজউদ্দিনের ১৩০৫ সালে রচিত বাউল বিধ্বংসী ফতোয়ার প্রেক্ষাপট কোনো ভাবে কাজ করেছিল?
রবীন্দ্রনাথ ওদুদের ' নদীবক্ষে' উপন্যাসটি সম্পর্কে বলেছিলেন;" মুসলমান চাষীগৃহস্থের যে সরল জীবনের যে ছবিখানি নিপুন ভাবে পাঠকদের খুলিয়া দিয়াছেন তাহার স্বাভাবিকত্ব, সরসতা ও নূতনত্বে আমি বিশেষ আনন্দ লাভ করিয়াছি"। বাংলার কৃষি ও কৃষক জীবন ঘিরে যেমন ওদুদের ' নদীবক্ষে',
তেমন ই বাঙালি মধ্যবিত্তের সঙ্কট ঘিরে তাঁর উপন্যাস ' আজাদ'। কথা সাহিত্যের ভিতর দিয়ে ওদুদ বাংলার যে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জীবন্ত ছবি এঁকে গিয়েছেন, তা বাঙালির চিরকালীন সম্পদ।১৯ শে মে তাঁর মৃত্যু দিনে মুক্তবুদ্ধির উপাসক ওদুদকে তাঁর কথা শিল্পে অনুপম স্বাক্ষর ঘিরে স্মরণ, বাঙালির আত্মতর্পণ।