ছোটগল্পের একটি নিজস্ব ধারা থাকে । বিখ্যাত সাহিত্যিকদের ছোট গল্পের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। কারুর শেষ হয়েও শেষ নয়, কারুর শেষে অতৃপ্তি কারুর শেষেই মোচড়। ছোটগল্প সাহিত্যের কোনো শাখা নয়, নিজেই যেন আস্ত এক সাহিত্য।
স্বনামধন্য সাহিত্যিক বিমল করের প্রিয় লেখক ছিলেন রতন ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর রচনার প্রতি নিজের অনুরাগ স্বীকার করেছেন মুক্ত কণ্ঠে। আসল নাম শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।
ওঁর লেখা এত বলিষ্ঠ, এত সামাজিক,এত বাস্তবধর্মী,এত ব্যতিক্রমী মনে হয় যেন বটবৃক্ষের নীচে বসে আছি। একটি গল্প চেতনাকে এমন আবিষ্ট করে তার ঘোর না কাটার আগে পরবর্তীতে আর মন দেওয়া যায়না। আর অদ্ভুতভাবে মনের গভীরে প্রোথিত হয়ে থাকে বিশ্বাস, একটা অজানা আনন্দ যে পরবর্তী গল্পে আরো একটি নতুন চমক অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। আমি , সেই পাঠক, তখন যুগ ছাপিয়ে যাওয়া সাহিত্যের কোন্দরে বাসা বাঁধি ।
প্রিয় এক বন্ধু সন্ধান দিয়েছিল সাহিত্যিক রতন ভট্টাচার্য্যের ২৫ টি ছোট গল্পের এই বইয়ের। আর আমি নিজেকে ঋদ্ধ মনে করছি আজ অসাধারণ এই বইটি পড়ে।
মধ্যবিত্ত অস্থিরতা নিয়ে গড়ে ওঠা কাহিনীর সুবিন্যাস বই জুড়ে। প্রেম কখনো ভীষণ অস্থির, কখনো অস্থির পারিবারিক সম্পর্ক। আর অদ্ভুত ভাবে ওই অস্থিরতা স্পর্শ করে আমায়। কী ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে যাই আমি যখন শশাঙ্ক মানসীকে আর খুঁজে পায়না। (ময়না তদন্ত)আর সেই খুঁজে না পাওয়ার যে মানসিক ক্লান্তি, যে অবসাদ, তা যেন গ্রাস করে আমায়ও।
প্রথম গল্প "কৃষ্ণকীর্তনে" পরকীয়া সম্পর্কে থাকা দুই নারী পুরুষ ঘটনাক্রমে একটি ফাঁকা বাড়িতে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পেয়েও কাছাকাছি আসতে পারে না আর তাদের সেই তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হয় বৃষ্টির রাতে সারা বাড়ি জুড়ে, হৃদয়ের ওপর ভর করে শরীরী টান, আকর্ষণ আর এক অদ্ভুত পরিবেশ লেখক লেপন করে চলেন পাতা জুড়ে । মনের গহীন অন্ধকারে চারপেয়ে কাম -জন্তু ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে, বৃষ্টির রাতের অন্ধকার তার দ্যোতক হয়ে ওঠে, আর তখনই লেখক নিয়ে আসেন দরজার পিছনে লুকিয়ে থাকা হিসহিসে গলার বাড়িওয়ালি মাসিমাকে। যেন যেন প্রকারেন তিনি এই অবৈধতাকে আটকে রাখতে চান রাতভর, মাসিমা শুধুই রূপক, মনে হয় সামাজিক বিধি উল্লঙ্ঘন করতে পারেননি স্বয়ং লেখকও।
পড়ে স্তব্ধ হতে হয় "সাদা দেওয়াল"। সুধা গায়ে আগুন দিয়েছে, শুধু এটাই মূল ঘটনা। কিন্তু তার বুনন, তার জন্য যে শব্দ প্রয়োগ বা কাহিনীর বিন্যাস, দম যেন আটকে আসে। সুধার মৃত্যুর কারণ কোথাও উল্লেখ নেই, কিন্তু এক অদ্ভুত ভাবে এই কাহিনীকে মোচড় দেন লেখক, আর একটি টিকটিকি তাড়া খেয়ে হিটারের আগুনে পুড়ে মরে যায়। টিকটিকির পোড়া গন্ধে ঘর ভরে যায়, যেভাবে সুধার আগুনে বাতাবি লেবুর গাছ। কী নিপুণ হাতে দুটো ঘটনাকে মিলিয়ে দিয়ে সুধার যন্ত্রনাকে টেনে এনেছেন লেখক।
ছোট গল্প পড়ার একটা আলাদা আমেজ আছে। রতন বাবু তার যোগ্য কারিগর। তাঁর সবকটি গল্প ভিন্নতা নিয়ে এলেও, "যযাতি "অন্যতম উল্লেখযোগ্য গল্প এই বইয়ের। পেশায় পুরোহিত নলিন ঠাকুর নিজের পুত্রের কুকীর্তির সওদা করেন অর্থের বিনিময়ে, প্রাচীন অগ্রদানীর ছায়া আসে মনের বারান্দায় । সালসা খেয়ে উজ্জীবিত করতে চান তাঁর পৌরুষ, পুত্রবধূর স্নানের জলের আওয়াজ তাঁর আদিম প্রবৃত্তিকে উস্কে দেয় , গা ছমছম করে ওঠে। নিজের পুত্রের যৌবন কেড়ে নেওয়া পিতার মত হয়ে ওঠে তার পুরুষত্ব, পুত্রবধূ শুধুই নারী তখন তার কাছে ।
"পিঞ্জর" যেন আমার পাঁজরেও দাঁড়ের শব্দ তুলে দেয়। শিকড়ের টান যে কত গভীর তা জানে শুধু বনস্পতি আর শিকড় ছেড়ে আসা মানুষ। শিকড়ে ফিরে যাওয়া মানুষের অমোঘ নিয়তি, পুতুলও পারেনি সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে, সুখিজীবনের হাতছানি তাই সহজেই উপেক্ষা করতে পারে তার আবেগী হৃদয়। ফেলে আসা মাটির সুবাস, ছেড়ে আসা মানুষের হাতছানি কে কবে অগ্রাহ্য করতে পেরেছে!
অদ্ভুত গল্প "নোয়ার নৌকো"। বাইবেলের নোয়া মহাপ্লাবনে পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীদের একজোড়া করে তুলে নিয়ে সৃষ্টিকে রক্ষা করতে এসেছিলেন, সেই নৌকা আজও বহমান । আমরা আমাদের হৃদয়বৃত্তি, আমাদের সাহস, সততা , আমাদের ভালোবাসা ,আমাদের নিষ্ঠা যেন সেই মহাকালের নৌকার যাত্রী করি, যাতে সৃষ্টি অব্যাহত থাকে। শরীর বেচার খেলায় দীপিকা আর অপর্ণার অসহায়তায় বা আপামর অপারগ সেই সব নারীরা এসে দাঁড়ায়, যারা অর্থের কাছে নতজানু করে নিজের শরীরকে, আর সমাজ তার অসহায়তাকে কাজে লাগায়, পুরুষ তার অর্থ দিয়ে কেনে শরীর, মনের তল আর করায়ত্ত হয়না।
স্বল্প পরিসরে মেদবর্জিত মধ্যমকায় ছোটগল্প আস্ত এক না বলা উপন্যাস হয়ে ধরা দেয় লেখকের কলমে।
অসামান্য গল্প "অন্ধকারে মেহগনি বৃক্ষ"।
আর একটি গল্পের কথা না উল্লেখ করলে বোধহয় এই আলোচনা পূর্ণ হবে না, সেটি হলো "সমুদ্র"। ছোটগল্পের অতৃপ্তি আর আস্বাদনের সুখ একসঙ্গে এই গল্পে।
রেখাপাত করে সব ক'টি গল্প। আলোচনা আজ এতদূর, এই বই আবার পাওয়া যাচ্ছে, ছোটগল্পের আগ্রাসী মন রসদ পাবে এই বই পাঠে। এমন ছোট গল্প বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
বইয়ের প্রচ্ছদ আর উপস্থাপনা প্রশংসার দাবী রাখে। বাঁধাই চমৎকার। পরম্পরাকে অনেক ধন্যবাদ ওনার সব গল্প এভাবে একত্র করে আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।