যে দেশে বৃষ্টির শব্দ নেই - রজত চক্রবর্তী

ধড়মড় করে উঠে পড়েছিলাম। অন্ধকার। পাশে কেউ নেই। টিনের চালে অযুত নিযুত নুড়ি-পাথর কেউ ঢেলে দিচ্ছে । ফাঁক ফোঁকরে ঝলক রেখায় ঘরের আভাস। কি হয়েছে! ভয় পেলি! গলার স্বরে বাবা। দরজায় । শব্দ কেমন সারা শরীরে জড়িয়ে জড়িয়ে আপন হয়ে যায় । বাবাও কেমন শব্দের অংশ হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে আমার ভেতরেও এই প্রবল বৃষ্টির শব্দ, এই টিনের চালে নিরন্তর ঝমঝম, গাছে গাছে ঝাপটের শব্দ, হাওয়ার শব্দ, মাঝে মাঝে গম্ভীর বা উগ্র বিদ্যুত ধমক, সব সব কেমন ভেতরে মাখামাখি হয়ে যেতে শুরু করল। শুনতে পাচ্ছি বাবার কথা। সাহস। ঠাওর পাচ্ছি এই ঘর, এই চৌকি, মশারির হেলে থাকা, ঐ আলনা। ফরসা গোলগাল পিসির কপালে বড় লাল সূর্য ।
পিসির বাড়ি এসেছিলাম। সেই পার্টিশন, রায়ট, দেশভাগ, প্রাণ হাতে দিকবিদিক, তখন হারিয়ে যাওয়া সদ্য বিয়ে হওয়া একমাত্র পিসিকে খুঁজে পাওয়া গেছে দীর্ঘ দীর্ঘ বছর পর । একমাত্র বোন কোথায় ছিটকে গেল দেশভাগে। বোনের তখন বিয়ে হয়ে গেছিল। এইসব গল্প শুনেছি বাবার কাছে। এক ভাই, এক বোন। বাবা-মা একসাথে কলেরায় । ছাড়াছাড়ি মানে, জানাই হয়নি বেঁচে আছে কিনা! নিজের পরিবার নিয়ে এক যুবক পালিয়ে এসেছিল। পিছনে জ্বলছে বাড়ি, গ্রাম, লাশ। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার এতগুলো বছরের পর প্রথম দেখা হওয়া, সব মনে পড়ে যাওয়া রূপকথার ঝরঝরঝরঝর জলধারা তাঁদের। ৩০/৩৫ বছর পর। দেশের বাড়ি, নদীর চর, কলেরায় মৃত্যু মিছিল ঘরে ঘরে, বাবা- মা এক দিন পরপর, কান্না নেই।জড়িয়ে বসে থাকা, জারুল গাছের নীচে দুঃখেরা সব ছড়িয়ে থাকে। এতোদিন বাদে টুকরোগুলো তুলে আনছে। তুলে আনছে ভাই-বোনের খুনসুটি । সারাদিন নৌকা নিয়ে খালবিলের চত্বর । টিনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মোয়া। তুলে আনে পিসি। আমার সকালের থুতনিময় গুড়ে ভেজা মুড়ির দানা। দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হাসি-কান্নার হীরে কুঁচি তুলি, তুলে রাখি। তুলতে তুলতে আঁধার । আঁধারে নামে ঝড়। সাদা চুল ফরসা গোল গাল মুখে এক গাল হাসি নিয়ে পিসি আমার পাশে উঠে এলো মশারি তুলে। সেদিনই সকালে দেখেছি প্রথম আপনজন, পাশে ঠিক পাশটিতে বসে, ভয়ের নাই কিসু, ঘুমাও আসো আসো। নরম ফরসা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কপালে চুলে। তাঁর সাদা চুল গড়িয়ে পড়ছে আদরে। আর ঐ প্রবল শব্দ হুহুঙ্কার কেমন যাদু বলে দ্রবীভূত হতে হতে আদর হ'য়ে নেমে এল। বৃষ্টির কত কত অযুত ঐ ভয়ংকর শব্দ গলে গলে নেমে এলো ঘুম হয়ে, ঢালা লালপাড়ের ঘেরে। বৃষ্টির শব্দে শব্দে বার বার ফিরে ফিরে যাই, যাই ফিরে হারানো দেখার ভিড়ে। সব সবকিছু ঘিরে থাকে। যাই এক হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের সন্ধানে, এক বৃদ্ধ দেশভাগে তাঁর হারিয়ে যাওয়া বোনের সাথে প্রাণখোলা গল্পে গল্পে টুপটাপ টুপটাপ সারাদিন। বৃষ্টির শব্দে শব্দে কিশোরবেলার বৃষ্টি আসে ফিরে ফিরে।
নামছিল। ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে কপাল থেকে গড়িয়ে ভুরুর ফাঁক দিয়ে নাকের রিজ বরাবর। তারপর খাদ। ঝুলছে। টুপ। ঝুপ ঝুপ বৃষ্টির শব্দে বিশাল এই গাছের নীচে আমরা। অনেক নীচে বেঁকি নদী। ওপাশে ভুটান। এ পাশে মানস জঙ্গল । বিশাল গাছের গুঁড়ি। ভেজা ভেজা ফার্নের ঘন আস্তরন। চারিপাশে সহস্র পাতার উল্লাস ধ্বনি। ছোট ছোট পাতায় বৃষ্টি ফোঁটা পড়ার শব্দে যেমন কোমলতা আবার কর্কশ ভারী পাকা পাতায় জলের শব্দ তেমনই গম্ভীর একটু ভার সমৃদ্ধ । চারিপাশে যেন বিভিন্ন রিদমের কর্ড নিয়ে একটি অসম্ভব খেলা, জ্যামিং, সিম্ফনি । ডালে পড়া বৃষ্টির শব্দ, মাটিতে পড়া বৃষ্টির থ্যাস থ্যাস শব্দ, ফাঁকা বাঁশের উপর পড়া শব্দ, গাছের বিভিন্ন পাতায় বৃষ্টির শব্দের বিভিন্নতা। মাটিতে পড়ে থাকা পাতার উপর বৃষ্টির শব্দের গাঢ়তার পাশেই সামনেই ডাল থেকে ঝুলে থাকা কচি পাতায় বৃষ্টি ফোঁটায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ধ্বনি। আরো আরো কত কত রকম শব্দে শব্দে মিলে মিশে যে সিম্ফনি তৈরী করেছে সে সিম্ফনি কখন কখন যেন ঢুকে পড়ল ভেতরে। অংশ হয়ে গেলাম। এই গভীর জঙ্গলে এক প্রকান্ড দানবীয় গাছের তলায় দুই অনুপ্রবেশকারী ছেলেমেয়ে। গোপনে অতি গোপনে, সংগঠনে তন্ময় । ভয়! ছিলোও। কেটে গেল। চারিপাশের বৃষ্টির শব্দে শব্দে আমরা ভিজে উঠলাম। জলের বিন্দুটি ঠিক নাকের ডগায় জলবিন্দু ঝুলে আছে আরেক শব্দ নিয়ে, আরেক শব্দের প্রতীক্ষায়। তৃতীয় শব্দ কোন! যৌবনের বৃষ্টি থেকে গেল , টুপ টুপ টুপ...
অলস মেঘলা দুপুরে ফাঁকা ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে দূরে দেখা যায় গাছপালা ঘেরা আমার ছোটবেলা। খালি পা। কাঁচা রাস্তা । পায়ের তলায় এখনও ভেজা ঘাসের সুরসুরি, কাদামাটির কিড়কিড়। চটি খুলে খালি পা রাখি। পিছলে যায় তেরোতলার টাইলসে। কখন নেমে এসেছে সে। খেয়াল করিনি। হঠাৎ ঐ ঐ নীচে চুপ চুপ ঝুপুস ভিজে মাথা দোলায় ঝুঁটি বাঁধা নারকল গাছ, ববছাঁট অশত্থ-আম-জাম। নানা রকম গড়নে খিলখিল ভিজে উঠছে সব। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে ।এখানে বৃষ্টি শুধু পড়ে। পড়েই যায় । শব্দহীন তার পড়ে যাওয়া । সে গাছের পাতা পায় না, সে ভূমি পায় না। তার কোন শব্দ নেই। তার ব্যাকগ্রাউন্ডে গাঢ় কোন রঙ নেই আকাশ ছাড়া, তাই তার কোন রঙ নেই। রঙহীন শব্দহীন বৃষ্টি পড়ে। অদৃশ্য বৃষ্টিধারা। উঁচু উঁচু আরো আরো উঁচুতে উঠলে ঐ ঐ নীচের শব্দগুলি পৌঁছায় না। যেখানে বৃষ্টির শব্দ নেই। বৃষ্টি পড়ার শব্দ নেই। সেই দেশ তৈরী হচ্ছে দিকে দিকে উঁচু আরো উঁচু ছোট ছোট ভগ্নাংশ দেশ আমাদের।

এবার নামার প্রস্তুতি নিই। ফিরে যাবার জন্য পা বাড়াই। হারিয়ে যাওয়া উদ্বাস্তু মানুষ খুঁজি, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে...শব্দ মেখে মেখে...হেঁটে চলি..হাঁটি..হাঁটি...