সন্দেশ-এর দিনগুলি আর প্রণব দা - গৌতম দাশ

চলে গেলেন। যাবার কি কথা ছিল। অসুস্থ ছিলেন ঠিকই। কিন্তু যাবার কথা ছিল না। ২০১২। প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম  পরম্পরা পত্রিকা প্রকাশ করবার। এপ্রিল মে মাস নাগাদ অরণি দার সাথে হাওড়ায় প্রণব দার বাড়ি চলে এলাম। সন্দেশের দিনগুলো ছাপব বলে। এর আগে অরণি দা পাণ্ডুলিপি পড়িযে ছিলেন। চমৎকার লেখা। মন ভরে যায়।
বললেন , এত বড়ো লেখা একবারে কি করে  ছাপবেন?
একবারে ছাপব না তো।
তবে-
ধারাবাহিক ছাপব। একটু হাসলেন। বুঝলাম কথাটা পছন্দ হয় নি। তিনমাস অন্তর অন্তর পত্রিকায় ধারাবাহিক হয় নাকি। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলাতে রাজি হলেন।  ২০১৩ জানুয়ারি বইমেলাতে পরম্পরা প্রকাশ পেল। অনেক উল্লেখযোগ্য লেখার সঙ্গে ধারাবাহিক প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হলো। কয়েকটা দিন চলে গেছে বইমেলা শেষ হয়েছে। হঠাৎ প্রচেত গুপ্তর ফোন। সন্দেশের দিনগুলো  নিয়ে অনেক ভালো লাগা জানালো। দিল্লিতে থাকেন জ্যোতির্ময় বাবু তিনি নিয়ম করে সংগ্রহ করতেন পরম্পরা, শুধু প্রণব দার লেখা পড়বেন বলে। এরকম করে সন্দেশের দিনগুলো মানুষের মুখে মুখে। এই সময় অনেকবার প্রণব দার বাড়ি গিয়েছি। বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন। নিপাট ভদ্রলোক। কাউকে কোনোদিন অপমান করেন নি কটু কথা বলেন নি। নিজের লেখা নিয়ে কুণ্ঠা ছিল। লেখার প্রসংসা করলে কেমন যেন কুঁকড়ে যেতেন। দারুন সব ছড়া লিখেছেন, বইমেলায় প্রণব দার ছড়া তো মুখস্ত বলছিলেন কবি শিবাসিস মুখোপাধ্যায়। কবিতা ছড়া গল্প ছোটদের জন্য অনুবাদ গল্প। ভান্ডার পরিপূর্ণ। খুব অল্পই প্রকাশিত।  ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক প্রণব দা আড়ালে থাকা মানুষ। কোনো প্রচার নেই। কোনো আয়োজন নেই। অরণি দার সাথে একটা একটা করে প্রকাশ করার পরিকল্পনা  করেছিলাম।
প্রণব দার সম্পাদনায় চকমকি অনেক আগে বেরিয়ে ছিল সেটিও অরণি দার উদ্যোগে আমরা প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেছিলাম কাজ শেষ পর্যায়ে সেপ্টেম্বরে বেড়োনোর কথা ছিল। লেখালেখি ও পড়াশোনার ব্যাপারে প্রণব দা কে আগলে আগলে রেখেছিলেন অরণি দা আর সৌম্যেন। এদের প্রতি প্রণব দার ভালোবাসাও ছিল অফুরান।
ধারাবাহিক শেষ হবার পর সন্দেশের দিনগুলি বই আকারে প্রকাশ করার কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। যেমন দেরি হয় আর কি! ডিটিপি হলো। গায়ত্রিদি প্রথম প্রুফ দেখেদিলেন। অরণি দেখেদিলেন। দ্যাখা, আবার দ্যাখা এই করতে করতে অনেকটা সময়। বইটির প্রচ্ছদ তৈরি হয়ে গেল। শিল্পী সৌম্যেন। আমাদের সৌম্যেন পাল। চমৎকার প্রচ্ছদ। তারপর বই তৈরি হয়ে বইমেলায় চলে এলো। হৈ হৈ করে সবার হাতে হাতে সন্দেশের দিনগুলো। এই বইটি প্রকাশ করে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। অরণি দা ছাড়া এই বইটা হওয়া সম্ভব ছিল না। অরণি দা আর প্রণব দার যুগলবন্দিতে বাংলা বইয়ের পাঠকের হাতে এলো অসাধারণ একটি বই।
কথা ছিল। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের হাওড়ায় প্রণব দার বাড়ির পাশের ক্লাবে আর বাংলা আকাদেমি তে। হলো না।  চলে গেলেন।  
 প্রণব দা আপনি চলে গেলেন আর কোনোদিন অরণি দার সাথে আপনার বাড়িতে যাওয়া হবে না। আপনার ওই আটপৌড়ে জীবন, আপনার ওই সাধারণ ভাবে বেঁচে থাকার জীবন আর দেখতে পাবো না। প্রতিমুহূর্তে মিস করবো আপনার ওই সহজ সরল ভঙ্গি আপনার ওই সারল্য ।
ভালো থাকুন প্রণব দা।  আপনাকে প্রণাম।