চা এর সাথে আমার ঠিক কবে থেকে পরিচয়,সেটা ভুলে গেছি।ছোটবেলা যেমন অনেকের হরলিক্স বা কমপ্ল্যান এ কাটে,আমারও তেমনি কাটত।বেড়ে ওঠবার দুরন্ত একটা আশ্বাস পেয়েছিল বলে আমার মা কখনও সেই হরলিক্স বা কমপ্ল্যান বন্ধ করার কথা ভাবেনি,কিন্তু বাধ সাধল সাহাগঞ্জের ডানলপ ফ্যাক্টরি।কারখানা লক আউট এর হঠাৎ বিপর্যয়ে,সকালবেলার বন্ধু হয়ে উঠলো এক কাপ চা।সেই থেকে আমার চা-জীবন শুরু।স্কুল জীবন শেষ করে বেলুড় বিদ্যামন্দিরে পড়তে গিয়ে দেখলাম,চা সেখানে যত খুশি জোটে।যার গ্লাস যত বড়,তার চা এর আধার ও ততই বড়ো।শীতের সকালবেলায় হাতটাকে পেন্ডুলামের মত দোলাতে দোলাতে যখন চা নিয়ে বিনয় ভবনে ফিরতাম তখন কবীর সুমন ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসত না,সেই"এক কাপ চা য় আমি তোমাকে চাই।"এই 'তোমাকে'জায়গাটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন এখনো থাকলেও,ওই শীত কাটানো মুহূর্তবেলায় চা ছাড়া আর কিছু ভাববো কিভাবে?অথবা আমারই সহপাঠী অর্পণ আর আমি যখন একাডেমিতে নাটক বা নন্দন চত্বরে সিনেমা দেখে বেড়াচ্ছি শনিবার করে তখন ওই একাডেমির সামনে চায়ের দোকান টাই ছিল আমাদের রেস্টুরেন্ট।চা আর বিস্কুট।হয়ত অনেকের জীবনের সাথেই এই চা এমন এক সম্পর্কে জড়িয়ে আছে,যাকে স্মৃতিতেই রেখে দিতে হয়।অতিথি বাড়িতে এলে মিষ্টি আনার লোকের অভাব থাকলে স্বাদু কণ্ঠে যদি বলেন "একটু চা করি",তাহলেই যেন পনেরো আনা আতিথেয়তা কমপ্লিট হয়ে যায়।
চা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিকথন বলতে শুরু করলে,অন্তহীনই হয়ে যাবে।এই চা এর উৎসই বা কি,আর কেনই বা আমরা এত চা-প্রেমী হয়ে উঠলাম।একটু অনুসন্ধান করাই যাক।বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের শব্দভান্ডার এ বলা হয়েছে 'চা' শব্দটির আগমন চিনদেশ থেকে,তাই এটা চৈনিক শব্দ।চিনদেশের কিংবদন্তী কাহিনি থেকে জানা যায়,মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে চিনের প্রভাবশালী সম্রাট শেন নাং এক বিচিত্র আইন জারি করে ফেললেন,তিনি বললেন প্রত্যেক মানুষকে জল পান করার আগে সেটি ফুটিয়ে পান করতে হবে।একদিন সম্রাটের জল পানের উদ্দেশ্যে ওই জল ফোটানোর সময় হঠাৎ কিছু পাতা কোথা থেকে উড়ে এসে ওই ফোটানোর পাত্রে পড়ল।জলের রং গেল বদলে,এমন এক পানীয় তৈরি হলো,যা হয়ে উঠলো অসাধারণ এবং অভূতপূর্ব।বলার প্রয়োজন বোধহয় পরে না ওই পাতাই হলো চা।এরপর গরম জলে পাতা ভিজিয়ে তৈরি চা পানের রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে গোটা চিনে,এবং সেখান থেকে পুরো পৃথিবীতে।এই সমস্ত তথ্য পাওয়া যায় 'পেন্ট সাও'নামের একটা পুঁথিতে।হুন বংশের রাজত্বকালেই কিন্তু সেই দেশের মানুষ জানতে পারে চায়ের মাহাত্ম্য,এবং ছড়িয়ে পরার একটা হিড়িক কিন্তু তখন থেকেই দেখা যায়।ভাবলে অবাক হতে হয়,প্রায় ৭৮০ সাল নাগাদ তাং বংশের রাজত্বকালে চায়ের উপর শুল্ক বসানোরও কথা ভাবা হচ্ছিল।বৌদ্ধ পুরাণ থেকে জানা যায়,একদিন গৌতম বুদ্ধ মঠে বসে ধ্যান করছিলেন,কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছিলেন না।ঘুম জড়িয়ে আসছিল তাঁর চোখে।এইরকম চলতে চলতে,আর যাতে ঘুমে চোখ না জুড়ে আসে,সেইজন্য নিজের চোখজোড়ার পাতা ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে দেন।চোখের পাতা যেখানে পড়েছিল,সেখান থেকেই নাকি পৃথিবীতে প্রথমবারের মত জন্ম নেয় একটা চা গাছ,যার পাতা চিবিয়ে বা জলে ভিজিয়ে খেলে চোখ থেকে ঘুমের ভাবটা যাবে।
এই পুরাণ বা কিংবদন্তীর কথা যা-ই হোক না কেন,ভারতীয় উপমহাদেশে চায়ের প্রচলন করার পিছনে কিন্তু চিনের হাত ছিল না।চিনদেশি বণিক বা রাষ্ট্রদূত রা অথবা চিনা পর্যটক এবং ধর্মপ্রচারক মানুষরা এসেছিলেন ঠিকই,কিন্তু তাদের বৃত্তান্ত কথায় কিন্তু চায়ের নামগন্ধ নেই।৩৯৯ খ্রিস্টব্দে ফা-হিয়েন বা ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন অথবা পঞ্চদশ শতকে চিন থেকে যে ছয়জন দূত বিভিন্ন সময়ে এসেছিল তাঁদের পাঠানো রিপোর্টে কিন্তু চা-পানের কোনো উল্লেখ নেই।এমনকি চায়ের নাম নেই দুই দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি ও রপ্তানির উপযোগী পণ্যের তালিকায়।মোগল যুগে নবাব আলিবর্দী খাঁর খাদ্য তালিকায় কফির বাধ্যতামূলক উপস্থিতি দেখা গেলেও,চা ছিল অনুপস্থিত।ওলন্দাজ পর্যটক জন হিউগেন ১৫৯৮ সালে আসাম এসেছিলেন,ঘুরে চলে যাবার পর তিনি যে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন, তাতে তিনি লিখলেন,আসাম এর আদিবাসীরা এক ধরণের বন্য চা গাছের পাতা তরকারি হিসেবে রসুন এবং তেল দিয়ে রান্না করে খেয়ে থাকে।এমনকি তাঁরা পানীয় হিসেবেও সেটা পান করে,কিন্তু সেই পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া আদতে কিরকম বা সেটা প্রচলিত চায়ের ধরনের কোনো পানীয় কিনা সেটা উনি জানতে পারেননি।
এই বিষয় নিয়ে কিছুটা সংশয় কাটিয়ে নেওয়া গেল যে,বাঙালিকে চা এর নেশা ধরানোর পিছনে কাজ করেছে কিন্তু ইংরেজরাই।প্রশ্ন যেটা উঠে এলো,ইংরেজ বণিকরা কোথা থেকে জানলো এই চায়ের ব্যবহার?এর জন্য আমাদের হাত বাড়াতে হয় কিছু ঐতিহাসিক তথ্যের দিকে।সপ্তদশ শতকে সরাসরি চিন থেকে চা আমদানি করে,ব্রিটেনে কফির দোকানে বিক্রি হত।বিক্রি হলেও,জনগণ খুব একটা উল্লাসিত হয়নি।এমনকি,১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে,প্রথমবারের মত চায়ের দোকান হলেও মানুষজন খুব একটা পাত্তা তখনও দেয়নি।হয়ত সময় গুনছিল।তাই,আর চার বছর পর ১৬৬১ সালে,একটা রাজকীয় বিয়ের জন্য অপেক্ষা করতেই হত ব্রিটেনবাসীদের।ব্রিটেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লস এর সাথে বিয়ে হয় পর্তুগিজ রাজকন্যা ক্যাথরিনের।পর্তুগালের মেয়ে হবার সুবাদে ক্যাথরিন অনেক আগে থেকেই চা এর কথা জানত।প্রায় এক শতাব্দী আগেই পর্তুগিজরা চিন ফেরত একদল ধর্মযাজকদের কাছ থেকে খোঁজ পেয়েছিল চা এর।তাই ব্রিটেনের অন্দরমহলে রানীর জন্য চা হবে না,সে কি হয়?রাজপরিবারের হাত ধরেই সাধারণ জনগণ চা খেতে শিখলো এবং আগ্রহী হয়ে উঠলো।এর কিছুদিন বাদেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনের ক্যান্টন শহরের(বর্তমান নাম গোয়াঙ ঝু)বাণিজ্যিক বন্দর থেকে রূপোর বিনিময়ে "কোহঙ"নামের এক চিনা ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে ব্রিটেনে চা আমদানি শুরু করেন।অবাককর ব্যাপার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেক পণ্য আমদানি করলেও চা এর জন্য আলাদা লাভের মুখ দেখতে শুরু করলো।প্রথমদিকে,চা ছিল সুস্থ রাখার 'টনিক',কিন্তু চা আমদানি শুরু করার পর সর্বস্তরের মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে।এই যে একচেটিয়া ব্যবসা কোম্পানির সেটা রীতিমত ঈর্ষণীয়।১৬৭৮ সালে ৪৭১৩ পাউন্ড,১৬৮৫ সালে ১২০৭০ পাউন্ড এবং ১৭৫০ সালে ৪৭,২৭,৯৯২ পাউন্ড চা আমদানি করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।নাগরিক ক্লান্তিকর জীবনকে চাঙ্গা করার এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর যেন কিছুই হতে পারে না!চায়ের প্রসার লাগলো বাড়তে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতে পা রাখলেন, সঙ্গে করে নিয়ে এলেন নিয়মিত চা খাবার অভ্যাসটা।বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধানে,১৭৯৩ সালে ইংরেজি-বাংলা অভিধানে 'চা' শব্দটির দেখা পাই,এর সাথে 'চা-পানি'শব্দটিও পাওয়া যায়।১৭৯৭ সালে প্রকাশিত জন মিলারের "শিক্ষাগুরু"বইটিতে সংকলিত জনৈক সাহেবের দেওয়ান এবং চাকরের মধ্যে একটা সংলাপেও সাহেবের চা পানের কথা পাই।সমস্ত ভালোর মাঝে একটা করে কাঁটা বিঁধেই থাকে,এক্ষেত্রে তারও ব্যতিক্রম হলো না।১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শুরু হলো আফিম যুদ্ধ।ব্রিটেন ও চিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ফাটল এসে পড়ে চায়ের বাজারে।ভাবা যায়,চা আমদানির খরচ তখন হঠাৎ করেই বেড়ে দাঁড়ায় বছরে নয় মিলিয়ন পাউন্ড।তখন ইংরেজরা ভাবে,যদি ভারতের জমিতে চা চাষ করা যায় কেমন হবে।ভারত তখন সদ্য দখল হয়েছে।যদিও ১৭৭৪ সালে চিন থেকে বীজ এনে ভুটানে চাষ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও,সেটা খুব ফলপ্রসূ হয়নি।মোগল সম্রাট শাহ্ আলমের কাছ থেকে ১৭৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলে গেছে বাংলা,বিহার এবং উড়িষ্যার দেওয়ানি।ডাচ বা পর্তুগিজ রা এর আগেও এসে এই অধিকার কিন্তু পায়নি।ইংরেজরা জেনে গেছে ততদিনে,আসামে কিন্ত চা চাষ হতে পারে।আসামে তখন বাস করছে সিংফো নামে এক উপজাতি।তাদের দলনেতার কাছেই সেখানকার জঙ্গলে যে চা গাছ আছে, তার সন্ধান পেলেন ইংরেজ ব্যবসায়ী রবার্ট ব্রুস।সিংফো দলনেতা সেই ব্রুস সাহেবকে এনে দিলেন চা-গাছের চারা এবং চা-পাতা।রবার্ট ব্রুস ও সেই চা-পাতা তাঁর ভাই সি.এ.ব্রুসের হাত দিয়ে সরাসরি পাঠিয়ে দিলেন গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট ডেভিড স্কটের কাছে।স্কট সাহেব আবার সেই পাতা পাঠালেন কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন এর অধ্যক্ষর কাছে।পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর সিদ্ধান্তে এলেন যে,এই চা পাতা চিনের চা পাতা থেকে কম উন্নত এবং এটাও আবিষ্কার করলেন আসামের আবহাওয়া চা চাষের জন্য উপযুক্ত।যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বোটানিস্ট একে "এক জাতের বন্য ক্যামেলিয়া"বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন,তবুও কোম্পানি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই কাজে।১৮৩৪ এ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক নিজে উদ্যোগী হয়ে একটা টি-কমিটি গড়ে তোলেন।সাত সদস্যের মধ্যে ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন-রাধাকান্ত দেব এবং রাধকমল সেন।ছিলেন বোটানিক্যাল গার্ডেন এর ডি.এন.ওয়ালিচ।এই কমিটি মেনে নেয় আসামে চা চাষ সম্ভব।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৮ এ পরীক্ষামূলক তকমা ঝেড়ে ফেলে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন।কোম্পানির ব্যবসায়ীরা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে আসামের উত্তরদিকে চা চাষ করেই চিনাদের বাড়বাড়ন্ত ঠেকানো সম্ভব।ব্রহ্মপুত্র এবং কুন্ডিল নদীর মাঝে বালুকাময় জমিতে প্রথম শুরু হলো চা চাষ।পরে সেই চা গাছগুলো তুলে জয়পুর নামক আরেক জায়গায় গিয়ে বাগান গড়ে তোলা হয়।১৮৩৯ সালে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে চা চাষের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন লন্ডনের তিনটি ও কলকাতার একটি কোম্পানি।এই স্বতন্ত্র কোম্পানিগুলোকে এক করে নাম দেওয়া হয় "আসাম কোম্পানি",তৈরি হয় একটি জয়েন্ট স্টক।তবে ইংরেজদের পাশাপাশি আরেকজন বাঙালি দ্বারকানাথ ঠাকুরও চা শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী হন।তিনি উদ্যোগ নিয়ে স্থাপন করেন "The Bengal Tea association"নামের আরেকটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি।আসাম কোম্পানির মূলধন ছিল ৫০ লক্ষ টাকা,দ্বারকানাথের কোম্পানির মূলধন ছিল ১০ লক্ষের কাছাকাছি।দ্বারকানাথের এই উদ্যোগের ব্যাপারে অবগত হয়ে,আসাম কোম্পানির কলকাতা-ভিত্তিক অংশীদার "কোকেরেল অ্যান্ড কোম্পানি"তাঁর সাথে যোগাযোগ করে বেঙ্গল টি এসোসিয়েশন কে তাঁদের কোম্পানির সাথে যুক্ত করে দেন।ফলে যেটা হল,১৮৫৩ সালে আসাম কোম্পানির অধীনে থাকা চা বাগানগুলোর আকার ছিল ২০০০ একর,সেটাই ১৮৯৬-৯৭ সালে গিয়ে দাঁড়ালো ১০,০০৯ একর।
প্রথমদিকে কোম্পানি ভেবেছিল,আসামে চা বাগান তৈরি হবে চিনের মডেল অনুযায়ী।১৮৪০ সালের দিকে,সেই অনুযায়ী চিন থেকে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ছাড়াও চিনা শ্রমিক ও নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।যোগাযোগ ব্যবস্থা কিন্তু খুব উন্নত ছিল না।দীর্ঘ জলপথ আর সঙ্কুল বনপথের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হত।বর্ষাকাল ছিল আরো ভয়ানক।ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র জলস্রোত এবং হিংস্র জন্তু,বিষাক্ত সাপ অসুবিধা সৃষ্টি করত।প্রাণ হাতে নিয়েই চলতে হত।এর উপর ছিল,আমাশা এবং কালাজ্বরের উৎপাত।কে আসবে এখানে কাজ করতে?কোম্পানি ত বসে থাকার পাত্র নয়।তাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল,পেনাং ও সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক নিয়ে আসামে ওরা আসবেন।লোভ দেখানো শুরু হলো শ্রমিকদের।শ্রমিক সংগ্রহের জন্য আড়কাঠি ধরা হল।তাদের কাজ ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের জীবিত অবস্থায় চা বাগানে পৌঁছে দেওয়া।পথে কেউ মারা গেলে,কোম্পানি দায়ী নয়।চা বাগান অব্দি পৌঁছে দিলেই মোটা কমিশন আড়কাঠিদের।১৮৪০ সালেই,ইংরেজ রাজকর্মচারী কর্ণেল ডেভিডসন ঢাকা ভ্রমণের স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন,একদিন ঘোড়ায় চড়ে ঢাকার রাস্তায় বেড়াতে গিয়ে তিনি প্রায় ডজনখানেক চিনা মানুষদের দেখতে পান এবং তাঁরা সবাই আসামমুখী,এবং চা উৎপাদক।সেই শ্রমিকরা যখন আড়কাঠীদের সাহায্যে চা বাগানে পৌঁছলে কাগজে টিপসই দিয়ে চুক্তি করানো হত যে,পাঁচ বছর সেই চা বাগানে আটকে থাকবে।শুধু তারাই নয়,তাদের পুরো পরিবার হয়ে থাকলো চা-বাগান কোম্পানীদের কেনা গোলাম।সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে,অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে আর নামমাত্র বেতন পেয়ে তারা আর সুবিধা করতে পারলো না ওখানে।
বেতন বা মাইনে ছিল খুব কম।চা বাগানে পুরুষদের মাইনে ছিল তিন টাকারও কম,মহিলারা এক টাকা তিন আনা।অবশ্যই দরকার হয়ে পড়ল খুচরো পয়সার।যোগাযোগ ব্যবস্থার এই করুণ হালের জন্য আর সেটাও জোগাড় করা যাচ্ছিল না।১৮৩৫ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য কিছু মুদ্রা তৈরি করেছিল মিন্টে-এক পাই,আধ পয়সা,এক পয়সা,দু আনা।কোম্পানি এই চা বাগান গুলোতে চালু করল নিজের মুদ্রাব্যবস্থা।ওটা একধরণের টোকেন প্রক্রিয়া।সরকারি সিলমোহর তখনও দূর।ততদিনে,দার্জিলিং সিলেটে শুরু হয়ে গেছে চা চাষ;বাড়ছে শ্রমিক।ওখানেও টোকেন সিস্টেম চালু হল।ইংল্যান্ডে ত কফি ব্যবসায় ট্রেড টোকেন ব্যবহার করত।কিন্তু এই বাইরে থেকে আড়কাঠীদের আনা শ্রমিক সংগ্রহে পড়ল ভাঁটা।কারণ ছিল,প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিকের অভাব।কলকাতা ও পাবনায় দাঙ্গাও তখন বেঁধেছিল।কোনো কোনো শ্রমিক দুই মাস জাহাজে ভ্রমণ করে ভারতে আসার পর প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে তিন মাস বেকার বসে থাকতে রাজি ছিল না।ফলে, অনেক চিনদেশি শ্রমিককেই কোম্পানি বাড়তি অর্থ খরচ করে তাঁদের আপন দেশে পাঠাতে বাধ্য হয়।তখন কোম্পানি শ্রমিক আমদানি বন্ধ করে স্থানীয় বাঙালি ও আদিবাসী শ্রমিকদের চা বাগানে নিয়োগ করতে শুরু করেন।
আসাম কোম্পানি গঠন হবার কয়েক বছর পরে দার্জিলিংয়ে চা বাগান স্থাপনের উদ্যোগ নেন একজন ব্রিটিশ সার্জেন ডাঃ ক্যাম্পবেল।চিনদেশ থেকে আনা চা-বীজ তিনি রোপণ করে একটি ছোট্ট নার্সারি গড়েছিলেন ১৮৪৫ সালে।এর দুই বছর পরে ব্রিটিশ কোম্পানির উদ্যোগে আরো কয়েকটি চা নার্সারি স্থাপিত হয়।দার্জিলিংয়ে ১৮৫৩ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে বাগান তৈরী করে চা উৎপাদন আরম্ভ হয়।১৮৭৪ সালের দিকে বাগানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩ টি ও স্থানীয় চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় কুড়ি হাজারের বেশি।কিন্তু সেই টোকেনের ব্যবহার কিন্তু কমে না।তাঁদের চুক্তি পাঁচ বছরের।প্রায় সব চা বাগানেই ছিল মহাজনদের দোকান।সেখানে ওই টোকেন ভাঙিয়ে কেনা যেত দরকারি জিনিসপত্র।একেক চা বাগানে একেক রকম টোকেন-গোল,ত্রিকোণ,চৌকো,অর্ধচন্দ্রাকৃতি,চাকতির মত।কোনটাতে উল্লেখ থাকত কোম্পানির নামের প্রথম অক্ষর;কোনটাতে বিচিত্র মোটিফ।
তখনকার দিনে পূর্ববাংলার সীমানার মধ্যে চা চাষের প্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয় চট্টগ্রামে।১৮৪০ সালে চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিক কালেক্টর স্কন্স সর্বপ্রথম চা আবাদের প্রচেষ্টা চালান অসমীয়া চা-বীজ এবং চিন থেকে আনা চা-বীজের সাহায্যে।প্রায় একই সময়ে মি.হুগো কর্ণফুলী নদীর তীরে কোদালা এলাকায় চা বাগান তৈরি করতে উদ্যোগী হন।১৮৪৩ সালে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়।এরপর ১৮৮৩ এর মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট,মৌলভীবাজার ও হবিবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ব্রিটিশদের প্রচেষ্টায় উপযুক্ত জায়গা-জমি খুঁজে বের করে চা বাগান স্থাপন এবং চা উৎপাদন শুরু হয়।প্রধানত ফিনলে কোম্পানির উদ্যোগে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে চা শিল্পের দ্রুত বিস্তার ঘটে।যদি আমরা সিভিলিয়ান আর্থু ড্যাশের স্মৃতিকথা দেখি,দেখি ১৯১০ সালে চট্টগ্রামে তিনি এসেছিলেন প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে।তিনি জানাচ্ছেন,ফিনলে টি কোম্পানির কর্মকর্তারা তাঁর কাছে দাবী করেন যে তাঁদের তৈরি শিপিং লাইন(নাম ছিল 'দ্য ক্ল্যান লাইন')চট্টগ্রাম বন্দরকে পঞ্চাশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যবহারের ফলে।আর টি কোম্পানির আমদানি ও রপ্তানির সুবিধার জন্য মূলত বেঙ্গল রেলের কর্মকর্তারা এখানে রেললাইন ও স্টেশন স্থাপন করেন।বোঝাই যায়,ব্রিটিশ প্রভুদের কাছে চা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর গুরুত্ব কীরকম ছিল তা কিছুটা জানা যায়।আর এই উপমহাদেশে আসার পরও ইংরেজ সাহেবদের চা পানের অভ্যাস যে কিরকম ছিল সেটা জর্জ অ্যাট কিনসনের আঁকা একটা এনগ্রেভিং দেখে।এর শিরোনাম ছিল,"স্টেশনের কর্নেল সাহেব"।ছবিটিতে দেখা যায়,আরামকেদারায় আয়েশ করে বসে কর্নেল সাহেব,পাশেই দাঁড়িয়ে এক খানসামা তার হাতের ট্রে তে চায়ের কাপ।আরেকটু দূরে আরেক দেশীয় কর্মচারীকে দেখা যাচ্ছে,জ্বলন্ত উনুনে একটা জলধারী কেটলি চাপিয়ে হাতে এক টুকরো কাগজ নিয়ে বসে থাকতে-মনে হতেই পারে সম্ভবত ওই কেটলির ফুটন্ত জল দিয়েই তখন চা তৈরি করে সাহেবকে দেওয়া হচ্ছিল।এটি ১৮৬০ সালে, প্রকাশিত "কারি এন্ড রাইস"শীর্ষক চিত্র অ্যালবামের
তৃতীয় সংস্করণে ছবিটি আছে।
প্রথম দিকে চা খাওয়া হত বাটিতে।তারপর এলো পেয়ালা-পিরিচ।গল্প উপন্যাসে এর উদাহরণ প্রচুর।একটা চায়ের ধোঁয়ায় একটা স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।গল্পটা এইরকম।আমেরিকা তখন ব্রিটেনের কলোনি।মানুষের মনে জন্মাচ্ছে ক্ষোভ,পেতে চাইছে স্বাধীনতা।সাল ১৭৭৩।আমেরিকায় চা এর চাহিদা বাড়ছে তখন।প্রতি বছর গড়ে দশ কোটি সত্তর লক্ষ পাউন্ড।ইংল্যান্ডের অন্যান্য কলোনি থেকেই পাঠানো হত চা।এই চায়ের ওপর ছিল কড়া শুল্ক।বেশি দাম দিয়ে কিনতে হলেই মানুষের মনে জন্মাবে ক্ষোভ।আমেরিকাবাসীর মনেও সেই ক্ষোভ জন্মেছিল।ইংল্যান্ডের রাজা তখন তৃতীয় জর্জ।আমেরিকার মানুষদের ক্ষোভ দেখে তিনি কিছু কিছু অযৌক্তিক শুল্ক তুলে দেন।তাতেও কিন্তু মানুষের ক্ষোভ কমে না।তারা লুকিয়ে ডাচ বণিকদের কাছ থেকে চা কিনতে শুরু করলো।এই খবর পেয়ে ইংল্যান্ডের শাসনকর্তা চায়ের এত দাম কমিয়ে দেয় যে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বণিকরা প্রতিযোগিতায় আর যেন না পেরে ওঠে।এর পরই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে আমেরিকায় একচেটিয়া ব্যবসার স্বত্ব দিয়ে দেন ইংল্যান্ডের রাজা।ফল হলো উলটো।যেসব ব্রিটিশ জাহাজ চা নিয়ে আমেরিকায় আসছিল বন্দরে ভিড়বার আগেই তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।সেই সাড়াজাগানো ঘটনা ঘটে ১৬ ই ডিসেম্বর,বস্টন টি পার্টি।বস্টন বন্দরে দাঁড়িয়েছিল এক ব্রিটিশ বানিজ্যতরী।বিক্ষোভকারীরা রেড ইন্ডিয়ানদের ছদ্মবেশ ধরে জাহাজে উঠে তিনশোরও বেশি চায়ের পেটি জলে ফেলে দেয়-শুরু হয়ে যায় আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধ।প্রশ্ন জাগে,সেই চা আসছিল কোথা থেকে?অনেক ঐতিহাসিক বলেন,ভারত থেকে।এই উত্তর ভুল নয়।
ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা অবিভক্ত বাংলাদেশেই চালু করেছিল চা চাষের উদ্যোগ।বাঙালি শিল্পপতিরা জড়িত থাকলেও, বাঙালি উনিশ শতকের শেষের দিকে এসেও ঠিক সেভাবে চায়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেনি।উনিশ-বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে,বাঙালি চা এ ধীরে ধীরে মজতে শুরু করে।স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত,নিজের ছোটবেলার স্মৃতি থেকে লিখেছেন ঔষধ হিসেবে চা পানের কথা।তাঁর "কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা"বইতে তিনি লিখেছেন,-
"আমরা যখন খুব শিশু তখন একরকম জিনিস শোনা গেল-চা।সেটা নিরেট কি পাতলা কখনও দেখা হয়নি।আমাদের বাড়িতে তখন আমার কাকীর প্রসব হইলে তাঁহাকে একদিন ঔষধ হিসেবে চা খাওয়ান হইল।...একটা কালো কেটলি মুখে একটা নল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার ভিতর কুঁচো পাতার মতন কি দিলে,গরম জল দিলে,তারপর ঢাললে, একটু দুধ চিনি দিয়ে খেলে।আমরা তো দেখে আশ্চর্য,যা হোক দেখা গেল,কিন্তু আস্বাদনটা তখনও জানিনি।আর লোকের কাছে গল্প,যে একটা আশ্চর্য জিনিস দেখেছি,এই হল প্রথম দর্শন।তখন চীন থেকে চা আসত, ভারতবর্ষে তখনও চা হয়নি।"
লেখক হয়ত খেয়াল করেননি,তাঁর জন্মেরও(১৮৬৯) বেশ কয়েকবছর আগে তখনকার ভারতবর্ষে চা উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে।এটা ঠিক,মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে নিত্যদিনের পানীয় হিসেবে তখনও শুরু হয়নি চা পান।লিকার চা শুধু নয়,লিকার চায়ের বদলে,দুধ-চা এর প্রয়োগ ছিল এটা স্পষ্ট।এমনকি স্বামী বিবেকানন্দের চা প্রীতি ছিল;১৮৮৬ সালে,ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ র দেহ দাহ করানোর রাতে দরমা জ্বালিয়ে কেটলি করে চা খেয়েই তিনি ই তাঁর গুরুভাইরা রাত কাবার করেছেন।এমনকি বরাহনগর মঠে, স্বামীজী চা ছাড়েননি,অন্যদেরকেও ধরিয়েছেন।জেলা কোর্টে দাঁড়িয়ে চা পানের পক্ষে তিনি সওয়াল করেছিলেন।রবি ঠাকুরের ও চা পানের প্রীতির ব্যাপারটি বেশ লক্ষ্য করা যায়।শান্তিনিকেতনে চা-চক্র বা চা-এ পরিপূর্ন আড্ডার নাম তিনি দিয়েছিলেন "চাক্র"।এমনকি এই চা চক্র প্রবর্তনের দিনে,লিখেছিলেন একটা গান,যা পরে লিপটন টি কোম্পানি বিজ্ঞাপনে সাদরে গ্রহণ করেছিল।সেটি হল,-
"হায় হায় হায় দিন চলি যায়
চা-স্পৃহ চঞ্চল চাতকদল চল
চল,চল হো টগবগ-উচ%E