রোববারের দুপুর । ঠা ঠা রোদে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি । রাস্তায় জনপ্রাণীটি নেই । না, সেটা বলা বোধহয় ঠিক হলো না । এই ভর দুপুরেও দুটো আধাগ্রাম্য লোক আমার থেকে কিছু তফাৎ এ চলেছিল হেঁটে ।
একজনের মাথায় বেশ ভারী বোঝা একটা । চোখাচুখি হতে ঢ্যাঙা লোকটা, যার মাথায় বোঝা টোঝা নেই বেশ মৃদুস্বরে জিগ্যেস করলে,
চাল লাগবে না কি বাবু, ভালো বাঁশকাটি ছিল!
বরাবর জেনে এসেছি, এসব কম্মে আমি অতীব হাঁদা । এ বিষয়ে কখনও কোনও সন্দেহই ছিল না আমার, তবু কাটাতে গিয়ে ও একটু ভারিক্কি ভাব দেখাতে চাইল মন,
কতো করে দিচ্ছো?
----আপনার থেকে কি আর বেশি নেব স্যার, সকাল থেকে তিন বস্তা নিয়ে বেরিয়েছিলাম, এই এক বস্তা পড়ে আছে, যা হোক দেবেন!
পঁয়তাল্লিশ করেই দ্যান স্যার! কতো আর ঘুরবো?
কথায় কথায় বস্তা ভরা চাল নেমে এসেছে মাটিতে । হাতের নিড়ানিটা দিয়ে ফস্ করে বস্তার গা ফুটো করে একমুঠো চাল বের করে এনেছে ঢ্যাঙা সর্দার, বেঁটে সাগরেদ গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে ব্যস্ত!
আরেকটু গ্রাম্ভারি দেখানোর সাধ জাগে,
তা চল্লিশ করে দিলে কেজি দশেক দাও তবে! বেঁটে র ঘাম মোছা দেখে বোধ করি একটু মায়া হয় ।
ঢ্যাঙা আরেকটু এগিয়ে আসে,
একটা কথা বলি স্যার!
গরিবের কথাটা রাখেন, ঠকবেন না । তিরিশ কেজি মাল আছে, হাজার টাকায় দিয়ে বাড়ি ফিরে যাব,নিয়ে ন্যান!
মনে মনে হিসেব করি,
চল্লিশ করে হলেও বার'শ টাকা!
পকেটে হাজার দেড়েক আছে, গিন্নির মুখ টা মনে করে একটু একটু ভয় লাগলেও কিছুতেই ঘরের লোকের কাছে নিজের কৃতিত্ব জাহির করার সুযোগটা ছাড়তে চাই না । এসব ব্যাপারে বাড়িতে আমার ইমেজ মোটেই সুবিধের নয়, ভালো রকম দাঁও মারবার একটা লোভ কাজ করে যেন । ততোধিক গম্ভীর হয়ে বলি,
ক্ষেপেছ নাকি, এই অ্যাতো চাল নিয়ে যাব কি করে?
---কদ্দূরে যেতে হবে বলেন না!
অ্যাই হারান, বস্তা তোল রে, চলেন চলেন বাবু!
বিজয় গর্বে এগিয়ে চলি ।মার দিয়া কেল্লা! আমি নাকি সংসারের কিস্যু বুঝি না, আজ দেখাচ্ছি !
চুপি চুপি দোতলায় উঠি । বস্তা ওঠে পিছু পিছু । গিন্নি আপাতত ধারে কাছে নেই, ভালই হলো একরকম, থাকলেই সাতরকম প্রশ্ন করে জেরবার করে দিতো ।
মেয়ে কে ডাকি । ততক্ষণে বস্তাওয়ালারা কড়কড়ে এক হাজার টাকা গুনে নিয়ে হাঁটা দিয়েছে ।ভুল বললাম, যাওয়ার সময় বললে, কিছু বেশি করে দিয়ে দ্যান স্যার, বড্ড লস্ হয়ে গেল! অতএব আরও পঞ্চাশ টাকা গেল, যাক্ গে, তাতেও লাভ!
মেয়ে বস্তা টা টেনে ঘরের মধ্যে সাঁদ করলে ।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই গিন্নির ফিল্ডে প্রবেশ । বাপ মেয়ের উত্তেজনা দেখে কিছু একটা অনুমান করেই ফ্যালেন তিনি আর সাথে সাথেই মেয়ে র গর্বিত ঘোষণা,
মা, মা, জানো তো, বাবা না, এক বস্তা চাল কিনে এনেছে!
---বাবা? চাল? কেন?
এতগুলো প্রশ্ন বোধক চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ে দিব্যি ঘোষণা করে দেয়,
আরে বাবা, দ্যাখো ই না ,আমিই তো ঘরে এনে রাখলাম!
বামালসমেত এবার । এক মুহূর্ত তাকিয়েই গিন্নির ভারডিক্ট,
কতো আছে বললে, ত্রিশ কেজি?হতেই পারে না, তিরিশ কেজি চাল তুলে নিয়ে এলো রাই? অ্যাবসার্ড!
অতএব হাতে কলমে শুরু হয় এবার । ওজন মাপবার যন্ত্রে টেনেটুনে তোলা হয় বস্তা । মুখ ঝুলে পড়ে, বাইশ কেজি!
বউ, না কাস্টমস অফিসার?
এবার ঘোষণা,
কি চাল বললে? বাঁশকাটি?
হলে তো ঠিকই আছে ।
গিন্নি একটু সদয় যেন ।
বাঁশকাটি, বাঁশকাটি, খোলো তো বস্তা টা!
পরের কথাটা আর না বলাই ভালো, সবাই অনুমান করতে পারছেন, এমনকি ততক্ষণে আমিও ।
না, কিছুক্ষণ দমে থাকলেও খানিকটা পরেই চাঙ্গা হয়ে ভাবতে থাকি, ঐ ঢ্যাঙা আর বাঁটুলে টা এখন কদ্দূর পৌঁছলো!
আজকাল বাবা র কথা খুব মনে হয় । দ্যাখ তো না দ্যাখ মায়ের খোঁটা খাচ্ছেন, পরক্ষণেই দিব্যি হাসি । সংসার প্রপঞ্চময় বলে হাত ঘুরিয়ে নাচছেন । অফিস থেকে ফিরেই মোটা মোটা বই নিয়ে বসে যেতেন । কানে একটা হিয়ারিং এইড ছিল, মা খুব বকাবকি করলে শিশুর মতো মুখ করে শুনতেন ।আর মা বেরিয়ে গেলেই আমায় দেখতে পাঠাতেন মায়ের ফিরে আসার চান্স সে মুহূর্তে ঠিক কতটা!
মা, আমার ধবধবে ফরসা আগুনে মা সংসারের দায় ঠেলতে ঠেলতে সদাই তেতেপুড়ে থাকা মায়ের সময় কোথায় তখন! রাজ্যের কাজ তার! তাই আমি খবরটা দিলেই বাবা খুশি মুখ করে হিয়ারিং এইড টি গুঁজে দিতেন কানে ,অর্থাৎ এই এতক্ষণ ধরে মায়ের টানা বকুনি র কিচ্ছু শোনেন নি বাবা । আমার দিকে ফিরে চোখ টিপতেন, মানে, কেমন দিলুম!
বিষয় আশয় কিছুই বুঝতেন বলে মনে হয় না ।দেশের জমিজমা দুর সম্পর্কের ভাইকে লিখে দিয়েছিলেন আর হঠাৎ দুর্ঘটনায় যখন হঠাৎ হারিয়ে গেলেন তখন দেখা গেল নিজের বাড়ির জমিটাই অন্য সবার নামে, শ্রাদ্ধ শান্তি মেটার আগেই বাড়ি কেনার লোক এসে গেল, বাড়ি টার অনেক ভাগের একটিমাত্র ভাগের অর্থ সম্বল করে আমাদের মালপত্রের গাড়িটা যখন কাঠের পুলটাও পার হয়ে গেল তখন মায়ের মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম নিঃশব্দে জল পড়ছে! হিসেব না বোঝা মানুষটা ড্যাংডেঙিয়ে চলে গেছে, কাকে আর বকবে মা?
ভাঁটার জলে দাঁড় বাইতে বাইতে নতুন এক হালধারিকে খুঁজে পেয়ে গেলাম, সেও আরেকজন, আরেক বাঁশকাটি! সময়ের আগে হারিয়ে গেলেন সে দাঁড়িটিও । বাবা চলে যাওয়ার পর অন্তত পঁয়তাল্লিশ বছর পেয়েছি মা কে, কাউকে বকতেন না আর । অন্য রকম মা ।
একটু বয়েস তো হলো, এখন বাবা র ঐ প্রপঞ্চ কথাটার মানে খানিকটা বুঝতে পারি । সংসার এদের কাছে ছিল আনন্দের হাট, হিসেবের খাতা না! যতক্ষণ ছিলেন মজিয়ে ছিলেন, মজায় ছিলেন!
এই তো আমার ইতিহাস ।
এদের কাছেই তো শিক্ষার শুরু ।
বাঁশকাটি না হয়ে কি উপায় আছে আমার!