হারিয়ে যাওয়া - ইলোরা চট্টোপাধ্যায়

খুব জানতে ইচ্ছে করে যাদের ভুলে গেছি, যারা ভুলে গেছে,যারা সরে গেছে, হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে তারা সবাই  কেমন আছে আজকের এই অসুখের পৃথিবীতে! কোথায় আর কতদূরে রয়ে গেল সেই মানুষগুলো! ভালো আছে তো!

সেই যে ছোটবেলার বন্ধু, গলা জড়িয়ে  যে বলেছিল তুই আমি সারাজীবন বেস্ট ফ্রেন্ড থাকবো, কেমন! সেও বড়ো হবার সঙ্গে সঙ্গে, স্কুল বদলের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন চলে গেল। ছোটবেলার বন্ধুদের ঠিকানা শুধু ক্লাসরুম হয় যে, তারপর কোথায় খুঁজি, কোথায় পাই।

কলেজের সেই অধ্যাপিকা, যিনি রাস্তায় ফুচকা খেতে দেখলেই হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে নিজের টিফিনের ফলটা খাইয়ে ছাড়তেন,  কলেজে না এলে ফোন করে খোঁজ নিতেন,কোথায় তিনি এখন! কেন তাঁকে ভুলে থেকেছি এতদিন আমি! আর আজ হঠাৎ কেনই বা মনে পড়ছে! খােলাম কুচির মত আবেগগুলো কোথায় যে হারিয়েছিল!

ইউনিভার্সিটিতে সব থেকে চঞ্চল ছটফটে মেয়েটা, ভীষণ পরিশ্রমী আর ভীষণ হাসিখুশি মেয়েটা ছিল খুব প্রিয় আমার। ইউনিভার্সিটির প্রথম দিনেই আলাপ। দমদম থেকে আসতো। চারজন একমাথা বন্ধু ছিলাম আমরা, আর রিয়া ছিল ভীষণ আদরের আমাদের। আমি, ইন্দ্রানী, মহুয়া আর রিয়া। সারাক্ষণ মজা করা আর হাসিমুখ। হাসিমুখের ওপাশটা দেখতে পেতাম না, দেখতে চাইতামও না হয়তো।  আমরা সবাই মোটামুটি মধ্যবিত্ত বাড়ি থেকে এসেছিলাম। ক্লাস, লাইব্রেরী ,  টিউশন,কফি হাউস, প্যারামাউন্ট আর  পুঁটিরামের দিনগুলো ভালোয় মন্দয় বেশ  কেটে যাচ্ছিল । তার ফাঁকে একবার করে  সারাদিনের জন্য এর বাড়ি ওর বাড়ি কাটানো।। সারাদিন চার বন্ধুর একসঙ্গে থাকা। এরপর একদিন  রিয়ার বাড়ি যাওয়ার  পালা এলো। রিয়াকে একটু বিষন্ন লেগেছিলো। পরক্ষনেই মেঘ সরিয়ে বলেছিল, বল তোরা কবে আসবি। আমরা ওর বিষন্নতা কেন সেদিন দেখতে পাইনি জানি না।
একটা শনিবার আমরা তিনজন খুঁজে পেতে হাজির হয়েছিলাম ওর দমদমের বাড়ি। ওর বাড়ি না, ওর মামার বাড়ি। বাড়ির বাইরের একটা  ঘর, আর এক চিলতে উঠোন জবর দখল করেছেন ওর বাবা। ভেতরের বাড়িতে ওর মামা মামীরা আর তাদের ছেলে মেয়েরা থাকে। ওই একটি ঘরে বাবা মা বোনের সঙ্গে রিয়া থাকে। সামনের ঘেরা দালানে  ওর মা রান্না করেন। রিয়ার টিউশনের টাকায় সেদিন বাজার হয়েছে। আমাদের জন্য রান্না হয়েছে ভালো ভালো পদ। ওর মা বলছিলেন, ওর বাবার পেনশনের টাকা আর মেয়ের টিউশনের টাকায় কী ভাবে সংসার চলে। খেতে বসে আমরা তিনজন কথা বলতে পারছিলাম না, গলার কাছ টা বারবার বুজে আসছিল। রিয়া কিন্তু বলেই যাচ্ছিল, এই মাছটা খা, মাংস নে আরো। তোদের বাড়িতে কত খেয়ে এসেছি, আমি তো কিছুই করতে পারলাম না। মাথা নিচু করে কোনো মতে খেয়ে উঠে পড়লাম। দুপুরটা মনে আছে ওর এক মামাতো দাদার বউয়ের সঙ্গে সবাই মিলে গল্প করেছিলাম, তার ঘরে। একতলা থেকে দোতলা যাবার সিঁড়ির ঠিক মাঝের চাতালে দেখলাম  এম. এ- র বই খাতাগুলো রাখা। রিয়া একগাল হেসে বললো আমি তো এখানে বসে পড়ি রে, সিঁড়ির আলোটা সারাসন্ধ্যে জ্বলে তো, সুবিধা হয়। চোখগুলো কর কর করছিল তখন। ফেরার পথে বাসে সারা রাস্তা একটাও কথা বলিনি আমরা তিনজন। পরেরদিন ইউনিভার্সিটি গিয়ে দেখি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বেঞ্চে বসে হাসছে, আমাদের জায়গা রেখে। কোনো মতে প্রথম ক্লাস করেই পাকড়েছি ওকে, কিন্তু কী বলব তাই জানি না। শুধু বললাম ,আমাদের আবদারের জন্য তোর খুব হয়রানি হলো , কত খরচ হয়ে গেল রে। ও হেসে বললো, দূর কী মজা হলো বল তো!
ইউনিভার্সিটির পর আমি চাকরি পেলাম, মহুয়া আর ইন্দ্রানীর বিয়ে হয়ে গেল। রিয়া কম্পিউটারের কোর্স করতে লাগলো। চাকরি পাওয়া খুব জরুরী ছিল ওর জন্য।ওর বাড়িতে ফোন ছিল না, বুথ থেকে ফোন করত। একবার বিয়ের পর ওর ফোন এলো , ওর বাবার বাইপাস অপারেশন করতে হবে। এইটুকু বলে চুপ করে রইলো। বললাম দেখা কর। আমরা সবাই একদিন দমদম মেট্রো স্টেশনে এসেছিলাম। দেখলাম কী বিধ্বস্ত সেই হাসি  মুখের মেয়েটা। কিন্তু চোখগুলো সেই একই রকম উজ্জ্বল। বললো, তোরা সত্যি আমার বন্ধু। আমি চাকরি পেয়ে  তোদের দিয়ে দেব। চারজন কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে যে যার বাড়ির পথ ধরেছিলাম। দুবছর পর একদিন ফোন, ঝাড়গ্রামে সরকারি স্কুলে চাকরি পেয়ে গেছি রে। তোদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দে।  ফেরত দিতে হবে না বলে ওর আত্মসম্মানকে আঘাত করতে চাইনি। বোনের বিয়ে দিয়ে নিজেও বিয়ে করেছিলো। সেই আমাদের শেষ দেখা। আমাদের সবার মোবাইল ফোনের নাম্বার বদল হয়েছে । তবু আমরা তিনজন এক শহরে থাকার সুবাদে যোগাযোগে থাকলেও রিয়াকে আর পাই নি সে প্রায় ১৫বছর ধরে। আজ এই মহামারীর দিনে খুব মনে পড়লো ওকে। ভালো থাকবে আমি জানি, কারণ ওর ছিল ভরপুর প্রাণশক্তি।

বড়ো বেলায়ও কত বন্ধু হয়েছে, কেউ সুবিধা নিয়েছে, কেউ সুবিধা মত সরে গেছে। কেউ ব্যবহার করেছে কেউ আমার ব্যবহার বোঝেনি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলে কত চলে যাওয়া , হারিয়ে যাওয়া মুখের সারি। কত মেকি সুবিধাবাদীকে আপন মনে হয়েছে , কত বোকা বনেছি প্রতিনিয়ত। কত অপমান, অসম্মান ধুয়ে গেছে ভালোবাসায়। অপমান যা জুটেছে  ভালোবাসার মানুষজন তা পুষিয়েও দিয়েছে।  জীবনের তুলা দন্ডের হিসেবে বোধহয় ভুল হয় না কোথাও। ছেড়ে চলে গেলেও ফিরতে পেরেছি কোথাও। ছেড়ে যাওয়া হাত আবার আঁকড়ে ধরেছে।

কিছু সম্পর্ক হারিয়ে যায়। ছোট থেকে বড় হতে হতে পারিবারিক টানাপোড়েনে কত সম্পর্ক ভেঙে যায়।  কত প্রিয় মানুষ চলে গেছে , কত প্রিয় মুহূর্ত হারিয়ে গেছে। কত চেনা ডাক, চেনা স্পর্শ অচেনা হয়ে গেছে। কত বিশ্বাস হারিয়ে গেল, কত ভরসা ভেঙে গেল। কত বন্ধু ভুলে গেল, কতজনকে  আমিও।
শহরের চেনা রাস্তা গুলো , ফেলে আসা গলিগুলো , বালি ঘাট শিয়ালদার ট্রেনগুলো ,পাশাপাশি হাঁটার দিনগুলো, ক্লাস কেটে হারিয়ে যাওয়ার সময়গুলো ,  কোথায় যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। শত চেষ্টায়ও আমি  পারছি না পৌঁছুতে। যারা হাত ছেড়ে দিল, ভুলে গেল ,সরে গেল, মুছে গেল, হারিয়ে দিলো বা হেরে গেল সবাই কী করছে এই দুর্দিনে।

 একঘরে হয়ে রয়ে যাচ্ছি প্রত্যেকে, প্রতিদিন। কাছে যেতে গেলে কী  এত দূরে যেতে হয়! ফিরতে গেলেও কী সরতেই হয়! আলো পেতে গেলে  তাহলে আগে অন্ধকারকে মানতে হয়, তাই নাহ! হয়তো। হয়তো হয়।