জিনিয়াস জীবনকথা

ক্রিকেটার শচীন রমেশ তেন্ডুলকর

আধুনিক বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে শচীন রমেশ তেন্ডুলকর এক বিস্ময়কর ক্রিকেট প্রতিভা। সারা বিশ্বের ক্রিকেট প্রেমী মানুষ-জনের কাছে তিনি শচীন নামেই জনপ্রিয়।আবার ক্রিকেট বোদ্ধা ও বিশেষজ্ঞদের কাছে লিটল মাস্টার, মাস্টার ব্লাস্টার, কখনও বা ‘গড অফ ক্রিকেট’।শচীন ভক্ত ক্রিকেট প্রেমীরা তাকে কিংবদন্তি ক্রিকেটার ‘স্যার ব্রাডম্যানের’ সমকক্ষ বলে গণ্য করেন। এমনকি স্বয়ং ব্রাডম্যানও শচীনের ব্যাটিং শৈলী, রানের পাহাড় গড়ে তোলার ক্ষমতা ও ক্রীড়া দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। তার দীর্ঘ আড়াই দশকের নাটকীয় ক্রিকেট জীবন এক মহা বিস্ময়। মাত্র এগারো বছর বয়সে দাদা অজিতের আগ্রহে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ক্রিকেট প্রশিক্ষক রমাকান্ত আচরেকরের কাছে ক্রিকেটে হাতে খড়ি। টানা পাঁচ বছর নিয়মিত পড়াশোনার ফাঁকে সকাল-বিকেল ক্রিকেট অনুশীলন। সময় বাঁচাতে ও ক্রিকেট অনুশীলনের সুবিধার জন্য স্কুল বদল করেন। তখন থেকেই পড়াশোনা ও ক্রিকেট একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হয়ে ওঠে। চলতে থাকে কঠোর অনুশীলন। ফল স্বরূপ স্কুল,কলেজ ও ক্লাব টিমে নিয়মিত ক্রিকেটার হিসাবে পাকা জায়গায় করে নেন। এরপর জেলা ও রাজ্য স্তরের ঘরোয়া ক্রিকেটে ধাপে ধাপে “ক্ষুদে প্রতিভা” হিসাবে উঠে আসেন ও উদীয়মান ক্রিকেটার হিসাবে জাতীয় ক্রিকেট নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। সে কারণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে জাতীয় দলে স্থান লাভ করে নেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়। এরপর তার অনন্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। একের পর এক রেকর্ড ভাঙেন, নিত্য নতুন রেকর্ড গড়েন। শচীনের সাফল্যের ঝুলিতে রানের পাহাড়ের সঙ্গে রয়েছে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম তাঁর শততম সেঞ্চুরি।
মুম্বাই শহরেই শচীনের জন্ম, শিক্ষা, কর্ম ও জীবনযাপন। আবার, ক্রিকেট জীবনের অভিষেক ও অবসর গ্রহণ প্রিয় শহর মুম্বাইতেই। তাই ২০০-তম টেস্ট ম্যাচ খেলে যেদিন ক্রিকেট জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটালেন সেদিন সমস্ত ভক্তকুলের সঙ্গে তাঁর চোখও জলে ভরে যায়। আবেগ আপ্লুত আমচি মুম্বাইকর(সাধারণ মুম্বাই বাসী)তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সম্মান ও মর্যাদা জানাতে একটুও কার্পণ্য করেনি। তাঁর আড়াই দশকের জয়যাত্রার পরিসমাপ্তিতে হৃদয় উজাড় করা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। মহারাষ্ট্র সরকার তাকে প্রভূত সম্মানে ভূষিত করেছেন। ক্রিকেট প্রেমী মানুষের নয়নমণি শচীন তেন্ডুলকর-কে ভারত সরকার ‘রাজীব গান্ধী খেল-রত্ন’, পদ্মশ্রী,পদ্ম বিভূষণ ও ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করেছেন। আসুন জ্যোতিষের আলোয় দেখে নিই এই অনন্য প্রতিভার উত্থান আলেখ্য।    
ক্রিকেট ভারতের সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা। ঔপনিবেশিক সূত্রে পাওয়া হলেও খেলাটা সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। ক্রিকেটকে ঘিরে তাই সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে উন্মাদনা, আনন্দ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। খেলাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল “খোলা মাঠে একটা ছোট বলকে কেন্দ্র করে দুটি দলের মধ্যে মুখোমুখি লড়াই“। বিশেষজ্ঞদের কথায় “BRF”, অর্থাৎ ব্যাটিং, বোলিং, রানিং, রান স্কোরিং ও ফিল্ডিং। এর সঙ্গে চাই দলগত সমন্বয় ও লড়াকু মানসিকতা, যা দলকে চূড়ান্ত সাফল্যের দরজায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে। শচীন তেন্ডুলকর একজন সফল ক্রিকেটার ও ব্যাটসম্যান। শচীনের রাশিচক্রটি দেখুন - জাতকের কন্যা লগ্ন, ধনু রাশি, পূর্বাষাঢ়া নক্ষত্র, বিংশোত্তরী শুক্রের মহাদশায় ও কেতুর অন্তর্দশায় জন্ম। আপাত দৃষ্টিতে রাশিচক্রটি বেশ সাধারণ বলেই মনে হবে। লগ্ন পতি বুধ এবং চতুর্থ ও সপ্তম পতি বৃহস্পতি নীচস্থ, একাদশপতি চন্দ্র -অগ্নি রাশিতে রাহু যুক্ত(গ্রহণ যোগ)। রাহু ও চন্দ্র উভয়েই অষ্টমস্থ শুক্রের নক্ষত্রে। পঞ্চম ভাবে রাহুর দৃষ্টি আছে,ফলত লগ্ন ও পঞ্চম ভাব দুর্বল। গভীর দৃষ্টিতে জন্মছকটি দেখলে বেশ কয়েকটি দিগন্ত উন্মোচিত হবে। যেমন - রবি ও মঙ্গল  তুঙ্গস্থ, রাশিচক্রে একাধিক রাজ যোগ,নীচ-ভঙ্গ রাজযোগ ও অন্যান্য শুভ যোগ আছে। যেমন পাশ যোগ, সদা সঞ্চার যোগ,পারিজাত যোগ বর্তমান। ক্রিকেট খেলার কারক গ্রহ মঙ্গল। মঙ্গল জাতকের আত্ম কারক গ্রহ। মঙ্গল তুঙ্গস্থ হয়ে এবং নীচস্থ বৃহস্পতির সঙ্গে থাকায় নীচ-ভঙ্গ রাজযোগ তৈরই হয়েছে। ক্রিকেট বা যে কোনও ধরনের খেলার জন্য শক্তি, সাহস,সহিষ্ণুতা,লড়াকু মনোভাব,বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার দরকার। পঞ্চম ভাব খেলাধুলা ও প্রতিভাকে নির্দেশ করে। মঙ্গল শক্তি, সাহস, কঠোর পরিশ্রম, জেদ ও বিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি দেয়। মঙ্গল জাতকের  আত্মকারক গ্রহ মঙ্গল তুঙ্গস্থ হয়ে অবস্থান করছে। মঙ্গলের সাথে বৃহস্পতি থাকায় বিচক্ষণতা,ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সংযোগ ঘটছে। মঙ্গল জাতকের তৃতীয় ও অষ্টম পতি। তৃতীয় ভাব হাতকে নির্দেশ করে। অষ্টম ভাব জীবনের ডার্করুম। ফলে মঙ্গলের শুভ প্রভাব প্রবল ভাবে বর্তমান।অন্যদিকে বৃহস্পতি সপ্তম পতি হয়ে লগ্নকে দেখছে। বৃহস্পতি সপ্তম পতি হওয়ায় বিপক্ষকে নির্দেশ করছে। ষষ্ট পতি শনি নবম ভাব থেকে ষষ্ট ভাবকে দৃষ্টি দিচ্ছে। লগ্ন জাতক স্বয়ং। ষষ্ট ভাব শত্রু ও আধিপত্য বোঝায়। শনিকে বৃহস্পতি দেখছে। এছাড়া একাদশে বৃহস্পতির পূর্ণ দৃষ্টি রয়েছে। ফলে জাতকের ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশ হওয়ার ক্ষেত্রে মঙ্গল একাই প্রবল ভাবে শুভ কারক গ্রহ। লক্ষ্য করলে দেখবেন যে জাতকের মঙ্গলের মহাদশার শুরুতে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটেছে। মঙ্গল ক্রীড়া,সাহস,শক্তি,লড়াকু মনোভাব ও বিপক্ষকে প্রবল আক্রমণে পর্যুদস্ত করার পক্ষে একাই একশো। এমন কি জাতকের জন্ম বারও মঙ্গলবার। মঙ্গল ও বৃহস্পতির সংযোগ  ক্রীড়া প্রতিভার অন্যতম কারণ। জাতকের লগ্নপতি নীচস্থ হলেও স্ব-নক্ষত্রে থেকে লগ্নকে দৃষ্টি দিয়েছে। বুধ বালক গ্রহ। লগ্নে বুধের দৃষ্টি থাকায় কমনীয় ও  শ্রীযুক্ত, খর্বকায় চেহারা, বাস্তব বুদ্ধির প্রয়োগ ক্ষমতা লাভ করেছে।  নবাংশ চক্রে বুধ স্ব-নবাংশে অবস্থান করছে। জাতকের “কারক লগ্নও” কন্যা রাশি। ফলে জাতকের মধ্যে বুধের স্বাভাবিক গুনগুলি বর্তাবে।  জাতকের রাশি ও লগ্ন উভয়ই দ্বিস্বভাব রাশি। ফলে একটা দোটানা ভাব থাকবে।  রাশিতে রাহুর অবস্থান অশুভ নয়। কারণ রাহুর কোদণ্ড অবস্থান শুভ কারক ও অস্থিরতা সত্বেও দশমে দৃষ্টি দিচ্ছে। জাতকের ক্রিকেট জীবনের শুরু চন্দ্রের দশায়। পাকাপাকি ক্রিকেটার হিসাবে স্থায়িত্ব লাভ ও অভিষেক হয় মঙ্গলের দশাতেই। ভাগ্যপতি ও দ্বিতীয়পতি শুক্রের সঙ্গে রবির তুঙ্গস্থ হয়ে অবস্থান প্রতিষ্ঠা লাভে সহায়ক হয়েছে। নবম ভাবে শনি থাকায় জাতক ধীর-স্থির, সুশৃঙ্খল ও সংযত জীবন ধারা এবং বাধা-বিঘ্নের মধ্যে দিয়ে ক্রমশ অগ্রসর হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। নবম ভাবে শনি থাকায় জাতক আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন ও ন্যায়-নীতি পরায়ণ হতে পেরেছেন। জাতকের রাশিচক্রে রাহুর অবস্থানটি শুভাশুভ মিশ্র ফলদায়ক। রাহুর দশায় কেরিয়ারে সাময়িক ব্যর্থতা ও হতাশা নেমে আসে। লাগাতার ব্যর্থতা ও হতাশা জাতককে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। রাহুর দশায় জাতক খেলা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত মাঝপথে খেলা ছাড়েননি। বুধ ও বৃহস্পতি প্রভাবের আবার ধীরে ধীরে ভালো সময় ফিরে পান। রাহুর দশার মধ্যভাগ থেকে আবার ভালো পারফরম্যান্সে ফিরে আসেন। শততম সেঞ্চুরি করেন এবং রাহু দশার শেষ ভাগে ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।


জাতকের বিপুল খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য তুঙ্গস্থ রবি ও পারিজাত যোগ বিশেষ ভাবে দায়ী।রবি তুঙ্গস্থ হয়ে ভাগ্য পতির সঙ্গে অবস্থান করছে। অষ্টম ভাবে দ্বাদশ পতি রবি থাকায় বিপরীত রাজ যোগ হয়েছে। আবার রবি ও শুক্র পঞ্চমস্থ মঙ্গল দ্বারা দৃষ্ট। জাতকের লগ্ন পতি বুধ মীনে নীচস্থ, মীনের অধিপতি বৃহস্পতি মকরে নীচস্থ, মকরের অধিপতি শনি নবমে। আবার নবম পতি শুক্র অষ্টমে। বুধ,বৃহস্পতি,শুক্র ও শনি এই চারটে গ্রহ কেন্দ্র-কোণ সম্বন্ধে আবদ্ধ হয়ে প্রবল শুভ পারিজাত যোগ তৈরি করেছে। পারিজাত স্বর্গের ফুল, মর্ত্যে বিরল। রাশি চক্রেও পারিজাত যোগ খুবই বিরল।পারিজাত যোগের ফলে জাতক নাম,যশ,প্রতিষ্ঠা ও সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করতে পেরেছেন এবং বিশ্ব ব্যাপী খ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেছেন। বিপুল নাম,যশ,প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি লাভ করা ছাড়াও জাতক বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী। কারণ দশমে কেতু। কেতু মোক্ষ কারক, কেতু রাহুর নক্ষত্রে অবস্থান করছে এবং রাহু ও চন্দ্র দ্বারা দৃষ্ট। একাদশপতি চন্দ্রের সঙ্গে রাহু অবস্থান করছে, রাহু ও চন্দ্র উভয়েই দ্বিতীয় ও নবমপতি শুক্রের নক্ষত্রে। অন্যদিকে ধন কারক বৃহস্পতি নবমস্থ শনিকে, একাদশে আয় ভাবে এবং লগ্নকে দৃষ্টি দিচ্ছে। ফলত ধনভাগ্য প্রবল শুভ কারক হয়েছে ও স্থায়িত্ব লাভ করেছে। জাতকের বিপুল ধন ভাগ্যের অন্যতম কারণ হল নবমস্থ ইন্দু লগ্ন ও ইন্দু লগ্নে বৃহস্পতির দৃষ্টি। পঞ্চমপতি শনি নবমে থাকায় এবং বৃহস্পতি দৃষ্ট হওয়ায় বিপুল ধন কারক হয়েছে।
বর্তমানে শচীন তেন্ডুলকরের বৃহস্পতির মহাদশা ও “বৃহঃ+বৃহঃ” অন্তর্দশা চলছে এবং গোচর শনি বৃশ্চিকে অবস্থান করছে। ফলে শনির সাড়ে সাতিও চলছে, শনি পঞ্চমপতি হওয়ায় শনির সাড়ে সাতি জাতকের জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারবে না। বরং বৃহস্পতি মহাদশা জাতকের জীবনে নতুন ইনিংসের সূচনা করবে। বর্তমানে শচীন ৪৪ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করলেও অন্যান্য সামাজিক কাজে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করবেন। বিশেষ করে খেলাধুলা, রাজনীতি ও সামাজিক কাজকর্মে   সক্রিয় হয়ে উঠবেন। শচীনের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করি এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি শতায়ু হয়ে নতুন এক ইনিংসের শুভ সূচনা করুন।
অচেনা শচীন
১ বাবা রমেশ তেন্ডুলকর (মরাঠী ঔপন্যাসিক)শচীন দেববর্মনের গানের খুব ভক্ত ছিলেন। শচীন কর্তার নামানুসারে ছেলের নাম রাখেন “শচীন”,
২ ছোট বেলায় শচীনের স্বপ্ন ছিল বড় টেনিস খেলোয়াড় হওয়ার এবং অন্যতম প্রেরণা ছিলেন টেনিস তারকা “জন ম্যাকেন রো”, 
৩ ছেলেবেলায় খুবই দুরন্ত ও মারকুটে স্বভাবের ছিলেন, প্রায়শই ঝগড়া ও মারামারিতে জড়িয়ে পরতেন। এসব থেকে রেহাই পেতে দাদা অজিত তেন্ডুলকর ভাইকে ক্রিকেট কোচিং-এ ভর্ত্তি করিয়ে দেন।
৪ শচীনের নেট প্রাকটিসের সময় কোচ রমাকান্ত আচরেকর উইকেটের ওপর এক টাকার কয়েন রেখে দিতেন। সারা দিন আউট না হলে কয়েনটা উপহার হিসাবে শচীন পেতেন। শচীনের সংগ্রহে এরকম ১৩টি মূল্যবান কয়েন আছে।


সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী
শ্রীমতী লতা মঙ্গেশকর

সপ্তগ্রহ ও সপ্তসুর
সা - ষড়জ    রবি
রে - ঋষভ      শনি
গা –  গান্ধার     বুধ
মা –  মধ্যম     চন্দ্র
পা –  পঞ্চম    মঙ্গল
ধা –  ধৈবত     শুক্র
নি –  নিষাদ     বৃহস্পতি


সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী শ্রীমতী লতা মঙ্গেশকর ভারতীয় সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র জগতে এক বিস্ময়কর প্রতিভা ও কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী। ভারত ও সমগ্র এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে আছে তাঁর অগণিত অনুরাগী। সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে তিনি “বলিউডের বুলবুল”, “গোল্ডেন ভয়েস” বা “নাইটিংগেল অফ ইন্ডিয়া” নামে পরিচিত ও বন্দিত। গান ও সিনেমা পাগল ভারতের আম আদমির কাছে তিনি  “সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী” ও “লতাজী” নামেই সমধিক পরিচিত ও জনপ্রিয়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছে গানের হাতেখড়ি এবং বাবার সঙ্গীত-নাটক দলে যোগদান ও নিয়মিত গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৪২ সালে “কিটি হাসাল্‌” মরাঠী ছায়াছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করেন, কিন্তু বাবার আপত্তিতে পরিচালক গানটি বাদ দিতে বাধ্য হন। ওই বছরেই বাবা অকালে প্রয়াত হন। ছোট ছোট “তিন বোন ও এক ভাই”-কে মানুষ করা, সংসার চালানো ও অভিভাবকের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। অভাব ও অনটনের চাপে পড়াশোনায় ইতি টানতে বাধ্য হন। রোজগারের তাগিদে মরাঠী  ও হিন্দি সিনেমা-থিয়েটারে শিশু শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন।  
তের বছর বয়সে পিতৃহারা লতাজী নিয়তির কশাঘাত উপেক্ষা করে কঠোর জীবন সংগ্রাম শুরু করেন। পাশাপাশি চলতে থাকে সঙ্গীত সাধনা। বিস্ময়কর ও বহুমুখী প্রতিভা লতাজীর গান শুনে মুগ্ধ হন গুরু গোলাম হায়দর। তাঁরই আগ্রহে ও উৎসাহে ছুটে যান চিত্র পরিচালক শশধর মুখার্জির কাছে। পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান জোটে কপালে। ১৯৪৫ সালে হিন্দি “মহল” ছবিতে প্রথম ব্রেক পান। “আয়েগা আনেওয়ালা” গানটি সুপার-ডুপার হিট হয়। রাতারাতি পাদপ্রদীপের আলোয় ভাস্বর হয়ে ওঠেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক হিন্দি ছবিতে সুযোগ পান। সঙ্গীত সম্রাজ্ঞীর মুকুটে সাফল্যের সোনালি পালকে ভরে যায়। হিন্দি, মারাঠি ও বাংলা সহ ২০-টি ভারতীয় ভাষায় প্রায় ৭৫,০০০–এর বেশী গান রেকর্ড করেছেন। সিনেমার গান ছাড়াও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ভজন, গজল, বেসিক গান ও অন্যান্য গান গেয়েছেন। হিন্দি সিনেমা জগতের প্রায় সকল নায়িকা, গীতিকার ও সুরকারের জন্য গান করেছেন। “ভারতরত্ন” সহ অজস্র উপাধি ও সম্মান লাভ করেছেন। ভাগ্যলক্ষ্মীর প্রসন্নতায় পেয়েছেন অগণিত সঙ্গীত প্রেমী মানুষের হৃদয় উজাড় করা ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান। 
“গান, নাচ ও বাজনা” - এই তিন মিলে সঙ্গীত। সাধারণ মানুষ সঙ্গীত বলতে কণ্ঠ সংগীতকেই বোঝে। সত্য-সুন্দর-নটরাজ শিব সঙ্গীতের স্রষ্টা। আদিম জনজাতি থেকে আধুনিক মানুষ সবার প্রিয় সঙ্গীত। সপ্তগ্রহ ওই সপ্তসুরের মূল দ্যোতক (সারণী দেখুন)। সঙ্গীত প্রতিভার বিকাশে রাশিচক্রের সরব রাশি, ভ-চক্রের দ্বিতীয় ভাব ও পঞ্চম ভাব এবং সঙ্গীতের কারক গ্রহ শুক্র প্রধান। বিশেষত শুভ রাশি হিসাবে বৃষ ও তুলা রাশি এবং গ্রহ হিসাবে শুক্র, বুধ ও চন্দ্র প্রধান বিবেচ্য। ভাব হিসাবে দ্বিতীয় ও পঞ্চম ভাব এবং সঙ্গীতের কারক গ্রহ শুক্র প্রধান বিবেচ্য। এছাড়া সঙ্গীত প্রতিভার পূর্ণ বিকাসে কয়েকটি বিশেষ শুভযোগ (গন্ধর্ব, কলানিধি), ২-য় ভাব (কণ্ঠ), ৩-য় ভাব (বাজনা), ৫-ম ভাব সংগীত/শিল্পকলায় আগ্রহ এবং সপ্তম ভাব (জনগণ/জনপ্রিয়তা) মুখ্য ভূমিকা নেয়। গ্রহদের মধ্যে বুধ- ছন্দ,তাল,লয়, চন্দ্র - আবেগ, অনুভূতি, শুক্র – সঙ্গীত ও শিল্পকলায় আগ্রহ এবং মঙ্গল – প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও লেগে থাকার সাহস দেয় এবং মঞ্চ ভীতি কাটাতে সহায়তা করে। 
লতাজীর রাশিচক্রটা দেখুন – বৃষ লগ্ন, কর্কট রাশি, বুধের মহাদশায় রাত্রি ভাগে জন্ম হয়েছে। জন্ম লগ্ন, চন্দ্র লগ্ন ও রবি লগ্ন তিনটিই সম রাশিতে থাকায় শুভদায়ক মহা-ভাগ্য যোগে জন্ম গ্রহণ করেছেন। বৃষ লগ্ন স্থির রাশি এবং ভ-চক্রের (N. Z.) দ্বিতীয় ভাব। লগ্নে সাত্ত্বিক গ্রহ বৃহস্পতি অবস্থান করছে। লগ্নপতি শুক্র চতুর্থে বিদ্যা ভাবে, বুধ দ্বিতীয় ও পঞ্চম পতি স্বক্ষেত্রে রবিযুক্ত, ফলে শুভ বুধাদিত্য যোগ হয়েছে। সেকারণে সঙ্গীতে স্বভাবগত দক্ষতা ও নৈপুণ্য দান করেছে।  এছাড়া বৃহস্পতি লগ্নে, লগ্নপতি শুক্রে চতুর্থে থাকায় বৃহস্পতি ও শুক্র পরস্পরের  কেন্দ্রে (চতুর্থ-দশম) থাকায়  শুভ গন্ধর্ব যোগ তৈরি করেছে। দিগ্‌বলি বৃহস্পতি পঞ্চমস্থ রবি ও বুধকে দৃষ্টি দিচ্ছে। তৃতীয়ে স্বক্ষেত্রস্থ চন্দ্র ভাব প্রকাশে সাবলীলতা, গায়ন শৈলী, ছন্দ-তাল-লয়ের সূক্ষ্ম জ্ঞান, অনুভূতি ও ভাবে লীন হওয়ার  ক্ষমতা দান করেছে।  ষষ্ঠস্থ মঙ্গল লগ্নকে দৃষ্টি দান করায় কঠোর জীবন সংগ্রাম, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ও মঞ্চ ভীতি কাটাতে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে। ফলে মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই থেকেই বাবার সঙ্গে মঞ্চে ও সংগীত-নাটক দলে নিয়মিত গান করতে পেরেছেন। শনি যোগকারক ভাগ্য ও কর্মপতি অষ্টমে থাকায় আয়ু কারক হয়েছে। কিন্তু অশুভ কেতুর নক্ষত্রে থাকায় এবং দশমে দৃষ্টি দান করায় পিতৃ হানি কারক হয়েছে। শনি দ্বিতীয় ও পঞ্চম ভাবকে দৃষ্টি দিচ্ছে, ফলে সঙ্গীত প্রতিভাকে প্রখর আত্মসংযম ও আত্মবিশ্বাসে ঋদ্ধ করেছে। জাতিকার অসাধারণ এবং বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ও পূর্ণতা প্রাপ্তিতে বিরল “পারিজাত যোগ” অনেকাংশে দায়ী। পারিজাত স্বর্গের ফুল মর্ত্যে বিরল। তেমনই রাশিচক্রেও পারিজাত যোগ খুবই বিরল। এই যোগ মানুষকে 
অমর ও মহান করে। লগ্নপতি চতুর্থে, তার অধিপতি (Dispositer) পঞ্চমে,  তার অধিপতি স্বক্ষেত্রে, ফলে শুভ পারিজাত যোগ তৈরি হয়েছে। পারিজাত যোগের জন্যই লতাজী তাঁর অনন্য প্রতিভার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন ।  
লতাজীর জন্মলগ্নে ইন্দুলগ্ন অবস্থান করছে, ইন্দুলগ্ন চন্দ্রলগ্ন থেকে একাদশে আয় ভাবে, রবিলগ্ন থেকে নবমে ভাগ্য স্থানে। ইন্দুলগ্ন ধনদায়ক, জন্মলগ্নে ইন্দুলগ্ন অবস্থান করায় বিপুল ধন-সম্পদ, মান-যশ ও ঐশ্বর্য, প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পেরেছেন। লতাজীর জীবনের প্রথম ১৬ বছর বুধের দশায় অতিবাহিত হয়েছে। বুধের দশা সঙ্গীত শিক্ষা ও সাধনার সহায়ক হয়েছে। আবার ১৯৪২ সালে  অষ্টম পতি বৃহস্পতি লগ্নে এবং শনি দ্বাদশে থাকায় প্রত্যাখ্যান, অর্থাভাব, দারিদ্র, কঠোর জীবন সংগ্রাম, বাধা-বিঘ্নের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। ১৯৪৫ সালে যখন প্রথম সিনেমায় প্লেব্যাকের সুযোগ পান তখন গোচর শনি দ্বিতীয় ভাবে অবস্থান করছে, শনি ভাগ্য ও কর্মপতি, জন্ম শনিকে (ধনু) পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখছে। সপ্তমপতি মঙ্গল ষষ্টে কেতু যুক্ত  হয়ে দুঃস্থানে থাকায়  এবং  রাহু দৃষ্ট হওয়ায় বিবাহ,  প্রেম-প্রণয় যোগ দুর্বল। শনি অষ্টম থেকে দ্বিতীয় ও পঞ্চম ভাবকে  দেখছে এবং অষ্টম পতি বৃহস্পতি লগ্নে অবস্থান করে সপ্তম ভাবকে পূর্ণ দৃষ্টি দিচ্ছে। ফলে চিরকুমারী হয়েছেন, আত্মীয় কুটুম্বরা সহায়ক হয়নি। আত্মিক কষ্ট তাঁকে আরও গভীর ভাবে সঙ্গীত সাধনায় মগ্ন করেছে। বর্তমানে লতাজী ৮৭ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। বর্তমানে “বৃহঃ+ বৃহঃ“ অন্তর্দশা চলেছে এবং আগামী ৬-১০-২০১৬ পর্যন্ত চলবে। বৃহস্পতি অষ্টম পতি হওয়ায় অশুভ এবং মারক। সে কারণে বর্তমান সময় লতাজীর শরীর, স্বাস্থ্য ও আয়ুর পক্ষে  বিশেষ শুভ নয়।  কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা অশীতিপর মহান শিল্পী লতাজী শতায়ু হোন ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা জানাই।


মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস

কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তির  কল্যাণে “বিল গেটস” নামটি এখন সারা বিশ্বে একটি অতি পরিচিত নাম। উচ্চ-মধ্যবিত্ত আইনজীবী পরিবারের ছেলে বিল গেটসের প্রকৃত নাম উইলিয়াম হেনরি গেটস(III), বিল গেটস ডাকনামেই সারা বিশ্বে সুপরিচিত। ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা, তুখোড় বুদ্ধি, খেলাধুলা, বইপড়া, অংক ও বিজ্ঞানে সমান ভাবে উৎসাহী ছিলেন। সরকারি স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশোনায়  হাঁপিয়ে ওঠেন। বেসরকারি লেক সাইড স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে অংক, বিজ্ঞান, নাটক ও ইংরাজি সাহিত্যে  বিশেষ কৃতিত্ব লাভ করেন। লেক-সাইড স্কুলে পড়তে এসে কম্পিউটার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে BASIC ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে “টিক-ট্যাক-টো” এবং “রিস্ক” নামে দুটি কম্পিউটার গেমস তৈরি করেন। এখানেই বন্ধু “পল অ্যালেনের” সঙ্গে পরিচয় হয়। বিল গেটস, অ্যালেন ও আরও দুই সহপাঠী মিলে CCCS কম্পিউটার হ্যাক করে বাড়তি কম্পিউটার সময় ব্যবহার করতে থাকেন এবং ধরা পড়ে যান। চার জনেই সাময়িক কম্পিউটার ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। কম্পিউটার প্রোগ্রামের  ত্রুটি সমাধানের বিনিময়ে আবার নিয়মিত কম্পিউটার ব্যবহারের অনুমতি ফিরে পান। ১৭ বছর বয়সে বিল গেটস ও বন্ধু অ্যালেন মিলে “ট্রাফো-ও ডাটা” নামে একটা “যান সংখ্যা” নির্ধারণের সফটওয়ার তৈরি করেন এবং ২০,০০০ ডলার  রোজগার করেন। বন্ধু অ্যালেন মাঝ পথে ওয়াশিংটন কলেজের পড়া ছেড়ে “হানি ওয়েল” কম্পিউটার কোম্পানির কাজে যোগ দেন। বন্ধু বিল গেটস কে বোঝান, গেটসও হাভার্ড কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং দুজনে মিলে মাক্রোসফট নামে সফটওয়্যার কোম্পানি তৈরি করেন। ১৯৮০ সালে IBM নামক সংস্থার সমস্ত পার্সোনাল কম্পিউটার পরিচালনা ব্যবস্থার (MS-DOS) সফটওয়্যার তৈরির বরাত পান। সেই থেকে পার্সোনাল কম্পিউটার যত অগ্রসর হয়েছে গেটসের ব্যবসাও ততই ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ১৯৭৮ সালে মাত্র ২৫ জন কর্মী নিয়ে ব্যবসা শুরু করে এখন ৯০,০০০ হাজারেরও বেশী কর্মীর এক বহুজাতিক কোম্পানি। বর্তমানে যার স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ ৬১ বিলিয়ন ডলার এবং বিল গেটস বিশ্বের ধনীদের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি। ২০০৬ সালে বিল গেটস অবসর ঘোষণা করেন এবং হাভার্ডের সহপাঠী স্টিভ বালমার কে CEO ঘোষণা করেন। স্ত্রী মিলিন্ডা গেটস কে নিয়ে “বিল অ্যান্ড মিলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন”  গড়ে তোলেন  এবং  মানব হিতৈষণা ও সেবামূলক কাজ শুরু করেন। 
আসুন, জ্যোতিষের আলোয় এক ঝলক দেখে নিই এই অনন্য প্রতিভার জীবন কাহিনী। গেটস-এর রাশিচক্রটি দেখুন -জাতকের কর্কট লগ্ন, মীন রাশি, উত্তর ভাদ্রপদ নক্ষত্র। লগ্ন-পতি চন্দ্র নবমে, বুধ স্বক্ষেত্রে ও রাজযোগ কারক মঙ্গল( ৫ম ও ১০ম পতি) যুক্ত। সপ্তম পতি শনি তুঙ্গস্থ হয়ে স্বক্ষেত্রস্থ শুক্রের সঙ্গে সহাবস্থান করছে। নবম পতি বৃহস্পতি দ্বিতীয় ভাবে অর্থাৎ ধন ভাবে। জাতকের আত্মকারক গ্রহ শনি এবং অমাত্যকারক গ্রহ শুক্র। স্বক্ষেত্রস্থ শুক্রের সঙ্গে শনির সহাবস্থান বিশেষ শুভকারক এবং যোগকারক হয়েছে। জাতকের লগ্ন, পঞ্চম ও নবম, এই তিনটি ভাবই জলরাশিস্থ হয়েছে। লগ্নপতি চন্দ্র, পঞ্চম ও দশমপতি মঙ্গল ও ভাগ্যপতি বৃহস্পতি শুভ ভাবস্থ হওয়ার ফলে জাতকের দেহ-মন-আত্মার সবলতা (লগ্ন), বিদ্যা-বুদ্ধি-বিচার ক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রতিভার বিকাস (পঞ্চম)  এবং ভাগ্য ভাব (নবম) সুদৃঢ় হয়েছে। জাতক কম্পিউটার ও সফটওয়্যার ব্যবসায়  সাফল্য লাভ করেছেন ও প্রভূত ধন-সম্পদ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।  সপ্তম পতি শনি তুঙ্গস্থ হয়ে শুক্র যুক্ত। শনি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের কারক অন্যদিকে রাহু ইলেকট্রনিকস ও সফটওয়ারের কারক। চতুর্থ ভাবে শুক্র, শনি ও রবি সহাবস্থান করায় দ্বিতীয়, সপ্তম ও একাদশ ভাবের শুভ সংযোগ স্থাপন করেছে এবং দশম ভাবকে পূর্ণ দৃষ্টি দিচ্ছে। জাতকের তৃতীয় ভাবে বুধ স্বক্ষেত্রস্থ হয়ে মঙ্গল যুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিক বিষয়বুদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি আগ্রহ এবং মঙ্গলের প্রভাবে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা ও সাহস দিয়েছে। জাতকের কর্ম ভাবটি খুবই শুভ। দশমে রবি, মঙ্গল, রবি, শুক্র, শনি ইত্যাদি পাঁচটি গ্রহ পূর্ণ দৃষ্টি দিচ্ছে। এছাড়া দশম ভাবটি চর, অগ্নি রাশি ও নিষ্কলুষ, অর্থাৎ কোনও পাপগ্রহের অবস্থান বা দৃষ্টি নেই। ফলে জাতকের কর্মভাগ্য অতীব সুদৃঢ়। ব্যবসা বাণিজ্যে সাফল্য  পেতে হলে সাহস, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, লড়াই করার শক্তি, বিপক্ষকে পরাস্ত করার শক্তি  ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার জন্য শক্তি ও সূক্ষ্ম বুদ্ধির আবশ্যক হয়। ষষ্ঠ ভাবও অগ্নি রাশি, ষষ্ঠ ভাবে রাহু, শনি, মঙ্গল ও বৃহস্পতি – এই চারটি গ্রহের পূর্ণ দৃষ্টি থাকায় ষষ্ট ভাব যথেষ্ট বলশালী হয়েছে। ফলে জাতক ব্যবসায় অনায়াস সাফল্য ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। 
জাতকের ধনভাব (২য় ও ১১শ) বিচারে দেখা যাচ্ছে ভাগ্যপতি ও স্বাভাবিক ধনকারক গ্রহ বৃহস্পতি দ্বিতীয় ভাবে অবস্থান করছে এবং দ্বিতীয়া পতি রবি একাদশ পতি শুক্রের সঙ্গে সহাবস্থান করছে এবং রবি ও সপ্তম পতি শনি নীচ-ভঙ্গ রাজযোগ তৈরি করেছে, ফলে জাতকের কর্ম, আয়, বিবাহ ভাগ্য শুভকারক ও জীবনে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া একাদশে রাহুর দৃষ্টি থাকায় অনায়াস ধনলাভে সহায়ক হয়েছে। সপ্তম ভাব বিশেষ ভাবে বলশালী হওয়ায় জাতক ব্যবসা দ্বারা বিপুল ধনলাভে সক্ষম হয়েছেন। 


জাতকের রাশিচক্রে একাধিক ধনকারক শুভযোগ বর্তমান। চন্দ্রের ষষ্ঠে বৃহস্পতি, সপ্তমে বুধ ও অষ্টমে শুক্র থাকায় শুভ চন্দ্রাধি যোগ, রবি (২য়) ও শুক্র (১১শ) সংযোগ, সপ্তম পতির সঙ্গে দ্বিতীয় ও একাদশ পতির সহাবস্থান জনিত ধন যোগ, দ্বিতীয়া পতির সঙ্গে আত্মকারক ও অমাত্যকারক গ্রহের সংযোগের ফলে বিশেষ ধনযোগ (জৈমিনি) এবংবচন্দ্রের সপ্তমে যোগকারক মঙ্গল থাকায়, চন্দ্র ও মঙ্গলের পরস্পর দৃষ্টি বিনিময়ে শুভ চন্দ্র-মঙ্গলা যোগ তৈরি করেছে। জাতকের লগ্নের কেন্দ্রে তুঙ্গস্থ শনি থাকয় শশ যোগ, রবি-শনির সহাবস্থানে নীচ-ভঙ্গ রাজযোগ, চতুর্থে স্বক্ষেত্রস্থ শুক্র থাকায় শুভ মালব্য যোগ ইত্যাদি শুভযোগ বিপুল ধনকারক হয়েছে। সর্বোপরি, তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হোল জাতকের জন্মকাল মধ্য রাত্রির এক ঘণ্টা পূর্বে এবং লগ্ন, চতুর্থ, সপ্তম ও দশম - চারটি কেন্দ্র-স্থানই চর রাশিস্থ। রাতে জন্ম হওয়ায় লগ্নপতি চন্দ্র কালবল যুক্ত এবং নবমে থাকায় চির-ভাগ্য যোগ হয়েছে। দ্বাদশে ইন্দু লগ্ন অবস্থান করায় জাতক শেয়ার বাজারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে প্রভূত অর্থলাভ করেছেন এবং শেয়ার বাজারে কোম্পানির শেয়ার মূল্য ও চাহিদা প্রবল হয়েছে ও স্থায়িত্ব লাভ করেছে। চন্দ্র লগ্নপতি হওয়ায় জাতকের মানবিক অনুভূতি প্রবল। দ্বাদশ ভাব ব্যয়ভাব, ইন্দু লগ্ন দ্বাদশে থাকার ফলে জাতক জনস্বার্থে ও সেবামূলক কাজে প্রচুর অর্থদান করেছেন। সপ্তম পতির সঙ্গে লগ্নপতি ও একাদশ পতির সংযোগ থাকায় জাতকের স্ত্রীও তার সহায়ক হয়েছেন এবং বিপুল অর্থ দানের মাধ্যমে “মিলিন্ডা-গেটস ফাউন্ডেশন” স্থাপন করেছেন। সেই দানে বিশ্বের বহু  মানুষ  উপকৃত হয়েছেন। বর্তমানে বিল গেটস ৬১ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন এবং বর্তমানে চন্দ্রের মহাদশা ও শুক্রের  অন্তর্দশা চলছে, আগামী ২৭-১১-২০১৬ পর্যন্ত চন্দ্র-শুক্র অন্তর্দশা চলবে। চন্দ্রের মহাদশা শেষ হবে ২৬-০৫-২০১৭-তে। চন্দ্র লগ্নপতি হয়ে নবমে ভাগ্য স্থানে থাকায় বিশেষ শুভকারক। আগামী ২০১৭ পর্যন্ত সবদিক থেকেই ভাল ফল পাবেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি  ঘটবে এবং  তথ্য-প্রযুক্তি জগতে জাতকের প্রতিষ্ঠা, সুনাম  ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
  

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাঙ্গালীর দুই ঠাকুর,রবি ঠাকুর আর শনি ঠাকুর। দুজনেই সমান প্রাসঙ্গিক ও সমানভাবে বন্দিত ও নন্দিত। প্রথম জন রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। অন্য জন কাঁচা খেকো দেবতা। বাংলার জ্যোতিষী ও পুরোহিতদের কল্যাণে শনি ঠাকুর এখন পথে-প্রান্তরে, হাটে-ঘাটে-মাঠে, অটো স্ট্যান্ডে, বাস ও ট্রাম ডিপোয়, এমন কি রেল স্টেশনের এক কোনায় সর্বদা বিরাজ মান। তফাৎ শুধু একটাই, রবি ঠাকুরকে ভালবাসা যায়, ভুলে থাকা যায়, ভক্তি করা যায়, অবহেলা করা যায়, ভয় করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু শনি ঠাকুরকে ভয়েই হোক বা ভক্তিতেই হোক ভয় না করে উপায় নেই। পুরাণে ও পাঁচালিতে তার অশনি সংকেত সশরীরে হাজির। জ্যোতিষশাস্ত্রেও তিনি বহাল তবিয়তে বিরাজ করছেন। লোকে তার নাম করতেও ভয় পায়, বলে“বড় ঠাকুর”। তাই, রবি ঠাকুর শুধু পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ। আর শনি ঠাকুর প্রতি শনিবার,  বারো মাস ও  সারা জীবনে তার একদম মৌরসি পাট্টা।  
নবগ্রহ  ও  নবরস
রবি     বীর রস 
চন্দ্র     করুণ রস  
মঙ্গল     রৌদ্র রস 
বুধ     কৌতুক রস 
বৃহস্পতি     শান্ত রস 
শুক্র     আদি রস 
শনি     বীভৎস রস 
রাহু     অদ্ভুত রস 
কেতু     ভয়ানক রস 

এবার আসি রবি ঠাকুরের কথায়। রবি ঠাকুরের কথা বলতে গেলে গঙ্গাজলেই গঙ্গা পুজো করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ পরাধীন ভারতের এক স্বাধীন কবি। নোবেল পুরস্কার প্রাপক প্রথম ভারতীয় ও বাঙ্গালী। আবার  স্বাধীন ভারত ও বাংলাদেশের  জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতা। বাঙ্গালীর চলনে বলনে, চিন্তায় চেতনায় ও মননে, প্রেমে-অপ্রেমে, জীবনে ও মরণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙ্গালী এক পাও চলতে পারে ন। বাংলা ও বাঙ্গালীর জীবনে সর্বত্র তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। সর্ব সাধারণের কাছে তার পরিচয়– কবি,নাট্যকার, সাহিত্যিক, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক। এক কথায় স্রষ্টা, দ্রষ্টা ও দার্শনিক তথা বটবৃক্ষ স্বরূপ এক সুবিশাল প্রতিষ্ঠান ও মহা বিস্ময়কর এক অনন্য বহুমুখী প্রতিভা। 
রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন হয়েও আধুনিক। কৃষি-সমবায়, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার, নারীমুক্তির  অগ্রণী উৎসাহদাতা ও প্রেরণাস্থল।  তার কৌতূহলী মন  প্লানচেট, পরলোক চর্চা ও জ্যোতিষে আকৃষ্ট হয়েছিল। ভারতের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বুঝে প্রাচ্য বিদ্যার (Indology) অগ্রণী পথিকৃৎ।  ব্রাহ্মধর্মের পারিবারিক পরিবেশে লালিত হয়েও উপনিষদের  অমোঘ মন্ত্রে আজীবন অবিচল এবং সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংস্কার ঝেরে ফেলা এক মুক্তমন, মুক্ত প্রাণ মানবতাবাদী। মানুষ ও মানুষের জীবন তার প্রধান উপজীব্য।  জীবন ও জীবন দেবতা তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ও উপাস্য।   সারা বিশ্বের প্রাণস্পন্দনে কেঁপে উঠেছে তার মন-প্রাণ। বিশ্ববন্দিত মানুষটি ছুটে গেছেন রাশিয়া, চিন, জাপান, ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে। বহু বরেণ্য মানুষের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাঙ্গালী হয়েও সর্বভারতীয়, আবার ভারতীয় হয়েও সারা বিশ্বের। তিনি বিশ্বকবি ও বিশ্ব নাগরিক। 
এত গেল খাঁটি কমল হীরের অমল দ্যুতির কথা। প্রদীপের নীচে  জমাট অন্ধকারের মত  কালিমা কি নেই তার জীবনে ? হ্যাঁ, তাও আছে। আজকের মত সেদিনেও পরশ্রী কাতর, নিন্দুক ও আত্মঘাতী বাঙ্গালীর অভাব ছিল না। সমসাময়িক লেখক, কবি ও সাহিত্যিকদের অবজ্ঞা, ঈর্ষা, তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে জর্জরিত হতে হয়েছে বার বার। তার গান ও কবিতার প্যারোডি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ছিল। তকমা পেয়েছিলেন – বাহবা নন্দলাল, খাঁচার পায়রা, জমিদারের ব্যাটা ইত্যাদি। শুনতে হয়েছে “বুর্জোয়া কবি“, এমনকি তার সাহিত্যের  মূল্যায়ন করে সগর্ব ঘোষণা করা হয়েছিল “ঠাই হবে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে”। মতান্তর ও মনান্তর এমন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে  রসালো ও অশ্লীল খোশগল্প  ও কুৎসায় কান পাতা দায় হয়ে ওঠে। নারীমুক্তির স্বপক্ষে লেখা তার গানের প্যারোডি করা হয়েছিল “শঙ্খচিলে ডিম পেড়েছে ছাগলে দিয়েছে তা, ডিম ফুটে যে বাচ্চা হয়েছে ছাগলের মত পা -বা রে বা রে বা।” এসবেরে থেকেও নির্মম ছিল নিয়তির কশাঘাত। শৈশবে মাতৃহারা, দেবতুল্য পিতার অনুশাসন, প্রাথমিক শিক্ষায় ছেদ, চাকর বেষ্টিত বাল্য জীবন, বাড়িতেই বিশ্ব-বিদ্যার আয়োজনে দমবন্ধ করা পরিবেশ, জীবন পথে মৃত্যুর মিছিল, স্ত্রীর অকাল প্রয়াণ, পিতার মৃত্যু, চোখের সামনে প্রিয় সন্তানদের একের  পর এক মৃত্যু তাকে গভীর ভাবে ব্যথিত ও চরম বেদনায় বিদ্ধ করে। দুঃখী মানুষটা নিজেকে বার বার ভেঙ্গে চুড়ে বদলান, ডুব দেন মনের অতল গভীরে। হয়ে ওঠেন শান্ত-সমাহিত ও মৃত্যুঞ্জয়ী। ভাবতে অবাক লাগে শত বেদনায় দীর্ণ হয়েও যে বিপুল সাহিত্য সম্ভার তিনি রচনা করে গেছেন, তা কোনও মানুষ এক জীবনে পড়ে শেষ করতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথ নিজেই  বলেছেন  “আর কিছু না থাকুক, আমার গান গুলো ঠিক বেঁচে থাকবে”।    
জ্যোতিষের কাজ কারবার নবগ্রহ নিয়ে। সাহিত্য ও শিল্পকলার কাজ নবরস (Nine Sentiments) নিয়ে। জ্যোতিষ ও সাহিত্যের  মূল বিষয়বস্তু ‘মানুষ ও মানুষের জীবন’। জ্যোতিষ শাস্ত্র নবগ্রহের অবস্থান ও গ্রহের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে জীবনের হাল-হদিশ খোঁজে। আর শিল্প-সাহিত্য নবরসে জারিত জীবনের ছবি আঁকে। মানুষের সব আবেগ, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, আক্ষেপ ও আকুতি নবরসে জারিত হয়ে জেগে ওঠে। মানুষের আবেগ-অনুভূতির মৌলিক নয়টি ধারাই নবরস, যা জ্যোতিষ, সাহিত্য, সিনেমার ও অন্যান্য  শিল্প মাধ্যমের মূল বিষয়বস্তু। রবীন্দ্রনাথ প্রবাদ প্রতিম ব্যক্তিত্ব, তার জীবন নিয়ে নানা গবেষণা আজও অব্যাহত। জ্যোতিষেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানা জনে নানা ভাবে তার রাশিচক্র বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। নবগ্রহ ও নবরসের আলোকে তার জীবনকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সঙ্গে রইল নবগ্রহ ও নবরস সারণী।
 
নবরসের আলোকে রাশিচক্র বিচার :-
রবীন্দ্রনাথের রাশিচক্রটি দেখুন- জাতক লগন্‌ চাঁদা, অর্থাৎ জাতকের রাশি ও লগ্ন একই – মীন রাশি, মীন লগ্ন। মীন দ্বিস্বভাব জল রাশি। রাশিচক্রে বুধাদিত্য যোগ, হংস যোগ, শুভ যোগ থাকায় এবং  রবি ও বৃহস্পতি তুঙ্গস্থ হওয়ায় জাতক নিঃসন্দেহে প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন,  অনন্য  প্রতিভাধর ও বিশেষ ভাবধারা বাহী।  লগ্নে মন-কারক ও সজল গ্রহ চন্দ্র অবস্থিত এবং লগ্নপতি বৃহস্পতির সঙ্গে ক্ষেত্র বিনিময় করে শুভ সম্বন্ধে  আবদ্ধ হয়ে প্রথম  শ্রেণীর রাজযোগ সৃষ্টি করেছে। যে কোনও রাশিচক্রের মূল ভিত্তি হল লগ্ন, পঞ্চম ও নবম। লগ্ন – দেহ,মন ও জাতক স্বয়ং, পঞ্চম- মেধা, বুদ্ধি, প্রতিভা ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, নবম – ভাগ্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা। করুন রসের কারক ও মন-কারক চন্দ্র লগ্নে থাকায় জাতকের দেহ-মন-আত্মার শুভ মেল বন্ধন ঘটেছে। ফলে জাতকের জীবনে মীন রাশির সার্বিক গুণাবলী ও কারকতা পূর্ণমাত্রায় বর্তাবে। জাতকের চেহারা, চরিত্র, চাল-চলন ও জীবন দর্শন মীন রাশির কারকতা ও চন্দ্রের করুণ রসের  প্রভাবে জারিত হবে। জাতক হবেন আত্মগত, তীর অনুভূতি প্রবণ, আয়ত চক্ষুঃ, দির্ঘ্যদেহী, বলিষ্ঠ, ঘন কেশ বিশিষ্ট, সংযত বাক, গম্ভীর ও দীর্ঘায়ু। জাতকের মানসিকতায় থাকবে রোমান্টিকতা, তার তীব্র সংবেদনশীলতা, স্পর্শকাতর ও  অনুসন্ধিৎসু, পার্থিব ব্যাপারে কিছুটা উদাসীন ও জ্ঞান গর্ভ বাসী, ধার্মিক ও দার্শনিক চেতনা সম্পন্ন। জীবনযাত্রা হবে রাজকীয়, আড়ম্বর, ভ্রমণ, আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও সুখানুভূতি প্রিয়। মন হবে সদা চঞ্চল, অতিমাত্রায় সামাজিক ও মিশুকে প্রকৃতির, শিল্প-সাহিত্য ও চারুকলায় স্বাভাবিক দক্ষতা থাকবে। রূপ,রস,শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধ এবং সৌন্দর্যের পিয়াসী ও পূজারী। দেহ-মন-আত্মায়  সতত প্রেম-প্রীতি ও স্নেহ-মায়া-মমতা’র ফল্গুধারা প্রবাহ মান থাকবে। অবৈষয়িক মনের কল্পনা, ভাবধারা ও সুকুমার বৃত্তি  বাস্তব ও আদর্শের দোলাচলে  দ্বিধান্বিত হবে।  সৌখিন জীবনযাত্রা মাঝে মধ্যেই ব্যয়বাহুল্য এবং আর্থিক সঙ্কটের কারণ হবে। আত্ম সচেতন, মরমী ও স্বাধীনতা প্রিয়,  জাতক  আত্মিক সঙ্কটে  হবেন নিঃসঙ্গ ও একাকী। 
প্রধান তিনটি ভাব জল রাশি হওয়ায় এবং লগ্নে সজল গ্রহ চন্দ্রের প্রভাবে  করুণ রসে বার বার আলোড়িত ও উদ্বেলিত হবে। জলের ধর্ম চাঞ্চল্য, আর্দ্রতা ও গতিশীলতা। জল চলনে সরল, চরিত্রে জটিল জটিল, ভাবধারা সতত পরিবর্তনশীল। বাঁধা পেলে বাঁক নেয়, আবার প্রতিরোধে উত্তাল হয়ে ওঠে। বাহিরে চঞ্চল, উত্তাল ও অশান্ত। অন্তরে শান্ত, সমাহিত ও গভীরে লীন। জল আকারহীন, অবয়বহীন  ও বর্ণহীন। জীবনের রঙে রঙিন হয়ে উঠবে। জীবন হবে সমুদ্রের মত উত্তাল, তরঙ্গ সংকুল ও বিচিত্র ঘাত-প্রতিঘাতে দীর্ণ-বিদীর্ণ। করুন রসের প্রভাবে জীবন যন্ত্রণা, মর্মবেদনা, অবসাদ,করুণা, সমবেদনা ও ক্ষমা সুন্দর ভাবনায়  আলোড়িত ও বিড়ম্বিত হবে। 
দ্বিতীয় ভাবে তুঙ্গস্থ শুভ রবি (বীর রস) সঙ্গে বুধ (কৌতুক/হাস্য রস) ও শুক্র (শৃঙ্গার রস)  সহাবস্থান জাতককে সুকণ্ঠ, বাগ্মী, সুদর্শন ও শোভন দর্শন করেছে। প্রগাঢ়  রসবোধ, বিচিত্র অভিজ্ঞতা, হাস্য কৌতুক প্রিয় সাবলীল জীবন ধারা, রুচিশীল, যাবতীয় আনন্দ, ভ্রমণ ভোগ-বিলাস ও সুখানুভূতির পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী করেছে। রবি, বুধ ও শুক্রের মণিকাঞ্চন সংযোগ, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সৃজনশীলতাকে ঋদ্ধ করেছে। পঞ্চমস্থ বৃহস্পতির লগ্নে দৃষ্টি প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা ও ভাব প্রকাশে সহায়ক হয়েছে। তুঙ্গস্থ রবির সঙ্গে বুধের সংযোগ বিশেষ প্রতিভা ও  শুক্রের সংযোগে সাহিত্য-শিল্প কলায়  নৈপুণ্যে দান করেছে। 
ভয়ানক রসের কারক কেতু চতুর্থে ভাবে মঙ্গলের সঙ্গে অবস্থান করছে। চতুর্থভাব থেকে শিক্ষা, মা, গৃহসুখ ইত্যাদি বিচার করা হয়। কেতু ভয়ানক রসের কারক হয়ে ভয়, ভীতি, সন্দেহ, অনিশ্চয়তা, গুটিয়ে থাকা ও নৈরাশ্যের  মনোভাব বোঝায়। চতুর্থভাবে রাহুর দৃষ্টি অবস্থাকে আরও জটিল করেছে। ফলে প্রথাগত শিক্ষায় ছেদ ও অনীহা, শৈশবে মাতৃ হানি,গৃহসুখের হানি করেছে। চতুর্থ ভাবে কোনও গ্রহের দৃষ্টি নেই, কিন্তু বুধাদিত্য যোগ, তুঙ্গস্থ বৃহস্পতি এবং লগ্নে চন্দ্র থাকায় প্রথাগত শিক্ষায় ছেদ ঘটলেও পরিপূরক শিক্ষার অন্তরায় হয়নি। বরং স্বকীয় ধারায় শিক্ষালাভে সহায়ক হয়েছে এবং জাতকের ক্ষেত্রে “বিদ্যার চেয়ে বুদ্ধি বড়” প্রবাদটি ফলপ্রসূ হয়েছে।      
সপ্তম ভাবে চন্দ্র ও মঙ্গলের দৃষ্টি থাকায়  বিবাহ, দাম্পত্য সুখ এবং  বৃহস্পতি পঞ্চমে থাকায় সন্তান সুখ কারক। মঙ্গল ও চন্দ্রের যৌথ রস প্রভাব বর্তাবে বিবাহ, দাম্পত্য সুখ ভাল হয়েছে। কিন্তু অষ্টমে ও দ্বাদশে শনির দৃষ্টি, সপ্তমে মঙ্গলের দৃষ্টি এবং অষ্টম পতি শুক্রের  সঙ্গে বাধকপতি বুধের সংযোগ এছাড়া চতুর্থে মঙ্গল প্রবল ভৌম দোষের কারক হোয়য় অকালে স্ত্রীর মৃত্যু ও দাম্পত্যজীবনে ছেদ ঘটিয়েছে। অষ্টমে ও দ্বাদশে শনির দৃষ্টি জীবনে শক-সন্তাপ, নৈরাশ্য, একাতিত্ত্ব ও মৃত্যুর মিছিল জীবন পথে হানা দিয়েছে। শনি দুঃখ দিয়েছে আবার হৃদয় মনকে পুড়িয়ে খাঁটি করেছে। দার্শনিক ভাবনার জন্ম দিয়েছে। 
লগ্নপতি ও দশম পতি বৃহস্পতি পঞ্চমে অবস্থান করায় শান্ত রসের প্রভাবে সুস্থিতি, ধৃতি ও দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে হাজার মানুষের ভিড়ে নিঃসঙ্গ, একলা কিন্তু স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে জেগে থাকবেন। মনের কাঙ্ক্ষিত সাধ-আহ্লাদ, একান্ত কামনা-বাসনা ভাগ করে নেওয়ার সাথী থাকবে না। মর্ম  বেদনা প্রকাশের যন্ত্রণা মনকে ভারাক্রান্ত ও ক্লিষ্ট করবে। ভাব প্রকাশের আকুলতা প্রবল হবে।  
লগ্নে বৃহস্পতির দৃষ্টি ও দশমে রৌদ্র রসের কারক মঙ্গলের দৃষ্টি থাকায় জাতকের মধ্যে কঠোরতা  ও কোমলতার সন্নিবেশ ঘটিয়েছে। দশম ও কর্ম ভাবে অদ্ভুতরসের কারক রাহু থাকায় জীবনে নানা ঝামেলা, বিড়ম্বনা, অপ্রীতিকর ঘটনা ও পরিস্থিতি,  গৌরব হানিকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আবার  বৃহস্পতির কল্যাণে শান্ত, সংযত হয়ে সামাল দিতে পেরেছেন এবং ভাগ্যপতি মঙ্গল  রাহু দৃষ্ট হওয়ার  ভাগ্যের সহায়তা পর্যাপ্ত নয়, তাই বার বার ভাগ্য বিড়ম্বনায় জর্জরিত হয়েছেন।   
জাতকের কর্ম ভাবে রাহু অবস্থান করছে। রাহু জাগতিক সব ধরণের ভোগ সুখের কারক। রাহুর অদ্ভুত রস জীবন পথে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা, উত্থান-পতন, ভাবনা-চিন্তা, ঘটনা ও দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে  নিয়ে গেছে। দশম পতি তুঙ্গস্থ হয়ে লগ্ন ও নবম ভাবকে দেখছে, আবার ভাগ্যপতি মঙ্গল দশমে দৃষ্টি দিচ্ছে। তুঙ্গস্থ রবি ও বৃহস্পতি (বীর রস,শান্ত রস), মঙ্গল ও রাহুর (রৌদ্র রস, অদ্ভুত রস) সংমিশ্রণে কর্ম মুখর কৃতিত্ত্বময় জীবন লাভ করেছেন। বীর রসের প্রভাবে নামযশ ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। আবার রৌদ্র রসের প্রভাবে প্রতিভার স্বীকৃতি ও সফলকাম হয়েছেন। 
দ্বাদশ পতি শনি ষষ্ঠে অবস্থান করে দ্বাদশ ভাবকে পূর্ণ দৃষ্টি দিচ্ছে। দ্বাদশে কোনও গ্রহ নেই বা অন্য কোনও গ্রহের দৃষ্টিও নেই। ফলে শনির প্রভাবে জীবনে বহু দুঃখ পেয়েছেন, বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করছেন আবার দুঃখদাতা শনি শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের প্রতিভূ। সমাজের উচ্চস্তরে থেকেও বঞ্চিত মানুষের স্বপক্ষে গর্জে উঠেছেন। সব ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামে আজীবন ব্যস্ত থেকেছেন। সবকিছু পেয়েও বহু কিছু থেকে বঞ্চিত, হতাশ, নিঃসঙ্গ ও বড় একা ছিলেন মানুষটি। তাই হয়তো লিখেছিলেন “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে“। চীর নবীন ও অনন্য প্রতিভাবান মানুষটিকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।


সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন

(জন্ম: ১১-১০-১৯৪২, স্থানঃ- এলাহাবাদ, সময়ঃ বিকেল ৪ টে ০০ মিঃ)
সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন হিন্দি সিনেমা জগতের এক উজ্জ্বল বহুমুখী প্রতিভা। সুদীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে একের পর এক ব্লক ব্লাস্টার ছবি উপহার দিয়েছেন। একাধারে তিনি গায়ক, নায়ক, আবৃত্তিকার, সঞ্চালক, পরিচালক ও ভাষ্যকার। দর্শকের চাহিদা পূরণে অক্লান্ত অমিতাভ-জী নিজের প্রতিভাকে উজাড় করে দিয়েছেন। কখনো রোমান্টিক নায়ক, বা অ্যাংরি ইয়ং ম্যান অথবা দুর্ধর্ষ খলনায়ক। ট্র্যাজেডি, কমেডি, রোমান্স থেকে শুরু করে অ্যাকশন ও বাস্তব ধর্মী বিভিন্ন ধারার কাহিনী চিত্রে অনায়াস দক্ষতায় দর্শক মন জয় করেছেন। একের পর এক সুপারহিট ছবি বক্স অফিস হিট করেছে। বয়স ও সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেকে বার বার বদলে নিয়েছেন। নিত্যনতুন কাহিনী ও বিচিত্র ধরণের সব চরিত্রে  অভিনয় করেছেন। কখনও নাম ভূমিকায়, আবার কখনও পার্শ্বচরিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে চলেছেন। অনায়াস ও সাবলীল অভিনয় দক্ষতার গুণে আজও তিনি জনপ্রিয় এবং ‘বলিউডের বেতাজ বাদশাহ’। এ পর্যন্ত ১৯০-টিরও বেশি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বাংলা সিনেমাতেও তার অভিনয় প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করছে। সারাদেশ জুড়ে তাঁর অগণিত গুণমুগ্ধ ভক্তকুল। ভক্তদের কাছে তিনি শুধু ‘বিগ বি’ বা অমিতাভ বচ্চন নন,আরাধ্য মেগাস্টার। বিদেশেও তিনি সমান ভাবে জনপ্রিয়। মাদাম তুঁসোর মিউজিয়ামে স্থাপিত তাঁর মোমের মূর্তি তারই অন্যতম নিদর্শন। সিনেমা প্রেমী মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান ও প্রশংসা লাভ করেছেন। ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড থেকে শুরু করে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছেন। ৭৬ বছর বয়সেও অমিতাভ বচ্চন এখানও অক্লান্ত অভিনেতা, Sony TV-তে  KBC নামে প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক ‘রিয়েলিটি শো’-তে সঞ্চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।


অমিতাভ বচ্চনের জন্ম ইতিহাসের এক অস্থির সময়ে। সময়টা ১৯৪২ সালে। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সারা দেশ উত্তাল। তার আঁচ পড়েছে সমাজে, ঘর-সংসারে। আবেগ আপ্লুত বাবা ‘কবি হরি বংশ রাই বচ্চন’ ছেলের নাম রাখলেন ‘ইনকিলাব’, মানে বিপ্লব। বন্ধু ও সহকবি সুমিত্রা নন্দন পন্থের পরামর্শে নাম বদল করে রাখলেন অমিতাভ। বাবা বিখ্যাত হিন্দি কবি। মা ফয়সালাবাদের শিখ পরিবারের মেয়ে। যথেষ্ট সুশ্রী ও ব্যাক্তিত্বময়ী। এই দুঃসময়ে স্বামী-সংসার ও সন্তানকে দু’হাতে সামলান। কবি বাবার প্রশ্রয়, মায়ের স্নেহ, বাড়িতে শিল্প-সাহিত্যের পরিবেশ ও সমকালীন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতার নিত্য আনাগোনা, বালক অমিতাভের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ছেলেবেলা থেকেই অভিনয়, গান ও আবৃত্তির ঝোঁক প্রকাশ পায়। বিয়ের আগে মা তেজী বচ্চন নাটক ও থিয়েটারে ভাল অভিনয় করতেন। সিনেমার অফারও পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় গৃহবধূর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। জহুরী মায়ের জহর চিনতে ভুল হয়নি। ছেলেকে সমানে উৎসাহ ও প্রেরণা জুগিয়ে যান। অমিতাভ নিজে অবশ্য ব্যাপারটাকে শখ-আহ্লাদ হিসেবে নিয়েছিলেন। চাকরি ছেড়ে যেদিন পাকাপাকি ভাবে অভিনেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সব চেয়ে খুশি হয়েছিলেন মা ‘তেজী বচ্চন’। আর দু’হাত ভরে ছেলেকে আশীর্বাদ করেছিলেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতক অমিতাভ বচ্চন কলকাতায় আসেন ১৯৬৩ সালে। একটি বেসরকারি শিপিং ফার্মে (Bird & Co) ফ্রেট ব্রোকার পদে চাকরী পান। কাজকর্মের অবসরে প্রায়ই থিয়েটার, নাটক দেখতে যেতেন। বিশেষ করে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের গ্রুপ থিয়েটার তাঁকে গভীর ভাবে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করে। ঘুমন্ত শিল্পী সত্তা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। শেষমেশ পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নেন-সিনেমার নায়ক হওয়ার। কলকাতার চাকরি ছেড়ে বোম্বে পাড়ি দেন। প্রথম ব্রেক পান ‘সাত হিন্দুস্থানি’ ছবিতে (১৯৬৯)। দর্শক মনে তেমন একটা দাগ কাটতে পারেনি। এরপর ‘আনন্দ’ ছবিতে (১৯৭১) এক হতাশ ডাক্তার চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু রাজেশ খান্নার সঙ্গে পার্শ্বচরিত্রে থাকলেও দর্শকের মন জয় করেন। এরপর ১৯৭৩ থেকে একের পর এক ছবিতে নায়কের চরিত্রে প্রবলভাবে উঠে আসেন। আসুন জ্যোতিষের আলোয় দেখে নিই এই অনন্য প্রতিভার উত্থান কাহিনী।
রাশিচক্রটি লক্ষ্য করুন- জাতকের কুম্ভ লগ্ন, তুলা রাশি, স্বাতী নক্ষত্র, প্রতিপদ তিথি (অমান্ত) বিংশোত্তরী রাহুর মহাদশায় জন্ম। কুম্ভ স্থির ও বায়ু  রাশি। কুম্ভের প্রতীক ‘জলপূর্ণ কলস’। এ কলস শূন্য নয়, এর ধার ও ভার দুইই আছে। কুম্ভের মধ্যে শান্ত, সংযত, ধীর-স্থির ভাব, অভীষ্ট লক্ষ্য, সংবেদনশীল মানবিক অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টি ও ভাবপ্রবণতা বর্তমান। লগ্নে কেতু। সপ্তমে রাহু, নবম স্থানে চন্দ্র ও রাহুর নক্ষত্রে। লগ্ন(জাতক) ও সপ্তম(জনগণ) ভাব রাহু-কেতুর অক্ষে (Axis) থাকায় জীবন চক্র রাহু-কেতু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাহু-কেতু ব্যক্তি জীবনে আলোছায়া, আবর্ত ও আক্ষেপ, মনের প্রকাশ ও অপ্রকাশ ভাবের দ্যোতক। চলচ্চিত্রও আলো ছায়ার খেলা। ফলে জাতকের সমগ্র সত্ত্বাটি আলো ছায়ার দোলাচলে আবর্তিত। শনি চতুর্থে, বৃহস্পতি (২, ১১ ) ষষ্ঠে, চন্দ্র নবমে। শুক্র যোগ কারক গ্রহ। অষ্টমে নীচস্থ, কিন্তু স্বক্ষেত্রস্থ বুধ যুক্ত হওয়ায় নীচ ভঙ্গ যোগ হয়েছে। অষ্টম ভাবে চারটি গ্রহ, রবি, বুধ ও শুক্র সংযোগ থাকায় শিল্পকলায় স্বাভাবিক ঝোঁক তৈরি করেছে। অষ্টম ভাবটি শরীর, স্বাস্থ্য ও আয়ুর পক্ষে শুভ কারক হয়নি, কিন্তু আয়ু কারক শনি লগ্ন পতি হয়ে লগ্নে দৃষ্টি দেওয়ায় এবং বাধক পতি শুক্র নীচ ভঙ্গ হওয়ায় রোগ ভোগ এবং শারীরিক কষ্ট যোগ প্রবল হয়েছে। রাহুর দৃষ্টি থাকায় এবং মঙ্গল অষ্টমস্থ হওয়ায় কঠিন পেটের রোগ, নিম্নভাগে আঘাত ও অস্ত্রোপচার যোগ প্রবল। এসব সত্ত্বেও শনির শুভত্ব এবং বৃহস্পতির শুভাবস্থান জাতককে প্রবল জীবনী শক্তি দিয়েছে এবং দীর্ঘায়ু করেছে। অমিতাভ-জি তিরুপতি মন্দিরে পুজো ও দান করে রোগমুক্ত হয়েছেন। এছাড়া রাশিচক্রে একাধিক শুভযোগ বর্তমান। বুধাদিত্য যোগ, হংস যোগ, পারিজাত যোগ, গজ-কেশরী যোগ, নীচ ভঙ্গ যোগ, রাজযোগ, অমলা যোগ, লগ্নাধি যোগ এবং অখণ্ড সাম্রাজ্য যোগ রয়েছে। পারিজাত যোগ মানুষকে অমর করে। হংস যোগ ও গজ কেশরী যোগ মানুষকে কর্ম, আয়, প্রতিষ্ঠা, সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। শুভযোগগুলি জীবনে সার্বিক সাফল্য ও সৌভাগ্য দান করে।
অমিতাভ বচ্চন আগাগোড়া একজন বড়ো মাপের অভিনেতা। অভিনয়ই তাঁর- ধ্যান, জ্ঞান প্রাণ এবং পেশা ও নেশা। অভিনয় হল কোনও কাল্পনিক চরিত্রের দেহ-মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তি বা বহিঃপ্রকাশ। একজন অভিনেতা তার- কণ্ঠস্বর, সংলাপ, বাচন শৈলী, দেহভঙ্গি, চোখমুখের হাবভাব, আচার আচরণ ও আবেগ-অনুভূতির দ্বারা বাস্তব ও জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলেন। সেরা অভিনয়ের অমোঘ রসায়ন হল- সহজাত প্রতিভা, মরমী মন, পরিবেশন গুণ এবং সৃজনশীল ভাবনা। যা একজন অভিনেতাকে চরিত্রের অন্তর্লীন মনস্তত্ত্বকে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। যে কোনও ধরণের শিল্পকলার জন্য শুক্রগ্রহের শুভত্ব থাকা চাই। অভিনয়ের জন্য শুক্র এবং বুধ শুভ ভাবস্থ ও সবল হওয়া আবশ্যক। শুক্র অভিনয়, ফটোগ্রাফির কারক। অন্যদিকে বুধ অনুকরণ, স্মৃতি ও সহজ জ্ঞানের কারক। ভাব হিসেবে পঞ্চম ভাব, রাশি হিসাবে বৃষ-তুলা এবং মিথুন-কন্যা সহায়ক হয়। চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি অনুভবের জন্য মন কারক চন্দ্রের প্রভাব থাকা চাই। অমিতাভ-জীর শুক্র যোগকারক (৪, ৯), বুধ পঞ্চম পতি, কন্যায় (অষ্টমে), বুধ, শুক্র শুভ সংযোগ, সঙ্গে আত্মকারক রবি যুক্ত হওয়ায় বুধাদিত্য যোগ তৈরি করেছে। এছাড়া রবি, বুধ, শুক্র তৃতীয় ও দশম পতি মঙ্গলের সঙ্গে থাকায় কর্ম পরিবর্তন(চাকরি থেকে অভিনয়) সাহস ও লড়াকু মনোভাব দিয়েছে। মন-কারক চন্দ্রও শুক্রের ক্ষেত্রে। দশম ভাবে শনি ও বৃহস্পতির দৃষ্টি থাকায় কর্ম ভাগ্য ও কর্ম সাফল্য নিশ্চিত করেছে। দশম পতি মঙ্গল একাদশে দৃষ্টি দিচ্ছে। অন্যদিকে বৃহঃ একাদশ পতি ও দ্বিতীয় পতি হয়ে ষষ্ঠে তুঙ্গস্থ এবং দ্বিতীয়(ধন ভাব) কে দৃষ্টি দিচ্ছে। সর্বোপরি ধন ভাগ্য দায়ক ইন্দুলগ্ন লগ্নপতি শনির সঙ্গে সহাবস্থান করায় নাম,যশ, বিপুল অর্থলাভ করতে সহায়ক হয়েছে। অষ্টম ভাব জীবনের ডার্ক রুম। অষ্টমে চতুর্গ্রহ যোগ, পাপ পীড়িত হওয়া এবং লগ্ন ও সপ্তম ভাব রাহু কেতুর (Karmic Control) অক্ষে থাকায় জাতক ধূমকেতুর মতন বারবার পাদপ্রদীপের আলোয় ফিরে ফিরে আসতে পেরেছেন।
অমিতাভ বচ্চন তাঁর অনন্য সাধারণ জলদ গম্ভীর কণ্ঠের (Baritone Voice) জন্য সুবিখ্যাত। শুধু এই কণ্ঠ মাধুর্যের জন্য পরিচালক মৃণাল সেন তাঁর ‘ভুবন সোম’ ছবিতে ভাষ্যকার হিসেবে (১৯৬৯) ব্যবহার করেন। পরে সত্যজিৎ রায়ও তাঁর ছবিতে নেপথ্য কণ্ঠে অমিতাভ-জির কণ্ঠ ব্যবহার করেন। বাবার কবিতা, অটল বিহারী বাজপেয়ী-জীর (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) অজস্র অ্যালবামে অমিতাভ-জির কণ্ঠ বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। দ্বিতীয় ভাব বাক্য তথা কণ্ঠ নির্দেশ করে। দ্বিতীয় ভাব মীন জলরাশি, অধিপতি বৃহস্পতি। বৃহস্পতি তুঙ্গস্থ হয়ে দ্বিতীয় ভাবকে দৃষ্টি দিচ্ছে। অষ্টম ভাব থেকে চারটি গ্রহ দ্বিতীয় ভাবকে দৃষ্টি দিচ্ছে। জলদগম্ভীর গলার জন্য বৃহস্পতি এবং স্বরক্ষেপণের বৈচিত্র্য ও মাধুর্যের জন্য রবি, মঙ্গল, বুধ, ও শুক্র দায়ী। রবি-আভিজাত্য, বীরত্ব, সম্ভ্রম, মঙ্গল -রাগ, তেজস্বীতা, জোরালো কণ্ঠ, বুধ-কৌতুক, হাস্যরস ও অনুকরণ, শুক্র-কণ্ঠের কমনীয়তা, মাধুর্য ও রোমান্স প্রদান করেছে।
অমিতাভ-জীর কেরিয়ারের সেরা সময়টা ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ সাল। ওই সময় শনির দশা চলছিল। বুধের মহাদশায় তাঁর কেরিয়ারে অস্থিরতা নেমে আসে। সাময়িক ব্যর্থতা ও ঋণের দায়ে জড়িয়ে পড়েন। ব্যাঙ্ক ঋণ মেটাতে না পারায় বাড়ি নিলামের আদেশ হয়। বুধ পঞ্চম পতি ও অষ্টম পতি। ফলে বুধ জীবনে সাময়িক বাধাবিঘ্ন তৈরি করে। ওই বুধ মধ্যভাগে আবার Bad Patch কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯-র মধ্যে অবস্থার উন্নতি হয়। ২০০০ সালে আবার সাফল্যের শীর্ষে ফিরে আসেন। বড় পর্দার পাশাপাশি টিভির ছোট পর্দায় হাজির হন। বুধের দশার শেষভাগে বাবার মৃত্যু(২০০৩) এবং মায়ের মৃত্যু(২০০৭) হয়। ২০০৭ থেকে কেতুর দশা শুরু হয়। কেতু লগ্নে থাকায় লগ্নের ফল দেবে। ফলত ২০১৪ পর্যন্ত মোক্ষ কারক কেতুর দশা চলবে। কেতুর দশায় টিভি কেরিয়ারে প্রভূত সাফল্য পেয়েছেন।
বর্তমানে অমিতাভ-জীর যোগকারক ও ভাগ্যপতি শুক্রের মহাদশা চলছে। “শুক্র+চন্দ্র” অন্তর্দশা ১৮-০৫-২০১৭ পর্যন্ত চলবে। অমিতাভ বচ্চন এখন সাফল্যের মধ্য গগণে। স্ত্রী-পুত্র,কন্যা, পুত্রবধূ ও নাতনিকে নিয়ে তাঁর ভরা সংসার। অনন্য এই প্রতিভাকে কুর্ণিশ জানাই। আন্তরিক শুভকামনা জানাই তিনি শতায়ু হোন।
অজানা অমিতাভ
১) অমিতাভ-জীদের বংশানুক্রমিক পদবী “শ্রীবাস্তব”। বাবা ‘হরি বংশ রাই’ ছদ্মনামে হরি বংশ রাই বচ্চন লিখতেন। সেই থেকে ‘বচ্চন’ই তাদের পদবী ও পারিবারিক পরিচিতি হয়ে ওঠে। কথ্য হিন্দিতে বচ্চন মানে ছেলেমানুষি। 
২) অমিতাভ-জী ভালো সেতার ও সিন্থেসাইজার বাজান।
৩) নিরামিষ আহার করেন এবং ক্যামেরায় ভালো ফটো তোলেন।
৪) কলকাতায় চাকরি করার সময় রাজীব গান্ধীর বিয়েতে যাবার জন্য ছুটির দরখাস্ত করেন। ম্যানেজার বিশ্বাসই করেননি। নামঞ্জুর ছুটি মঞ্জুর হয়- একটাই শর্তে, ফিরে এসে বিয়ের কার্ড দেখাতে হবে।
৫) বন্ধু রাজীব গান্ধীর অনুরোধে রাজনীতিতে আসেন। সাংসদ হন এবং H.M. Bahuguna কে বিপুল ভোটে পরাস্ত করেন।