রুখা-সুখা জমিন। পাহাড়িয়া আলপথ। এবেড়া-খেবড়ো পাথুরে রাস্তা। জঙ্গুলে হাওয়া। অশান্ত নীরবতা। এর মাঝেই হাওয়াই চপ্পল আর থলিটি সম্বল করে এগিয়ে চলেছেন এক যুবতী । বাদামী তাঁর গায়ের রং। শিরদাঁড়া সোজা। চাহিদাহীন দৃষ্টি। পরণে স্বল্পমূল্যের সাদা সুতীর শাড়ি। থলির মধ্যে রয়েছে বহু মানুষের আশা-ভরসার বার্তা।
নাহ্। এ কোনো সিনেমার সিকোয়েন্স নয়। এখানে পরিচালকের ‘কাট’ বলার সাথে সাথেই জীবনের যুদ্ধ থেমে যায়নি। বরং আরও সাবলীলতা এসেছে চলার পথে। এখানে কোনো নারীবাদের পাঁচফোড়ন নেই। নেই পুরুষতন্ত্রবাদের অযথা চোখ রাঙানির অজুহাত। রয়েছে ভাল্লুকের ভয়। রয়েছে পাহাড়ি ধ্বস কিংবা প্রকৃতির রোষের প্রতিকূলতা। রয়েছে হাতি দেবতার দামাল আক্রমণের ইঙ্গিত। রয়েছে সজারুর কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার আশঙ্কা। সব ভয়-ভাবনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, লালমাটির ধুলো সামলে এগিয়ে যাচ্ছেন যিনি, তার নাম পুতনা মুড়া। যদিও পুতনা আজ প্রৌঢ়ত্বের দুয়ারে। কিন্তু প্রায় ঊনত্রিশ বছর আগে যখন লড়াই শুরু করতে হয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন পূর্ণ যৌবনা।
‘কি করেন আপনি ?’ — নাম-ধাম জিজ্ঞেস করার আগেই ক্যামেরা অন করেই বেমক্কা প্রশ্ন করলাম। এই চরম পেশাদার মানুষটির কাছে, নিজেকে খুবই অপেশাদার মনে হ’ল। তিনি কি করেন, আমরা তা জেনেই তো এসেছি। তাহলে হঠাৎ এ প্রশ্ন করলাম কেন ? তিনি কিভাবে এই পেশায় এলেন, কেনই বা এলেন, প্রথমেই কি এগুলো জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল না ? তা না করে প্রথমেই এই প্রশ্ন করে নিজেই কিছুটা লজ্জায় পড়লাম। তাহলে কি পুরুষতান্ত্রিক পেশার অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে করতে আমার অবচেতনেও গোঁড়া নারীবাদের শিকড় গজিয়েছে ?
‘চিঠ্ঠি বিলি করি, বহুত চিঠ্ঠি, মেলা চিঠ্ঠি...।’ পুতনা উত্তর দিলেন। উত্তর শুনেই আমার সাংবাদিক মন যেন এক লাফে রাজ্য জয় করে অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় উঠে একচোট নেচে এ’ল। এই তো সেই মানুষ, যাঁর খোঁজে আসা। আসলে, ঋজুদেহের অধিকারী, মৃদুভাষী এই মানুষটিকে দেখে প্রথমে ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিল যে, এই মানুষ প্রায় প্রতিদিন চোদ্দ কিলোমিটার আরামসে হাঁটতে পারেন। এই উত্তর শুনে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ আর রইল না।
পুতনা এক সাধারণ মুন্ডা পরিবারের মেয়ে। তিনি পুরুলিয়া জেলার বাঘমুন্ডি ব্লকের অযোধ্যা এলাকার বাসিন্দা। আর পাঁচটা সাধারণ আদিবাসী পরিবারের মেয়ের মতোই সংসার-স্বামী-সন্তান নিয়ে দিন কাটছিল তাঁর। কিন্তু বাদ সাধল নিয়তি। হঠাৎ মারা গেলেন তাঁর স্বামী বুদ্ধেশ্বর মুড়া। এক ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে সেই সময় একদম দিশেহারা অবস্থা পুতনার। আর্থিক অনটনের কারণে প্রায় অনাহারে থাকার মতো পরিস্থিতি। একে বাড়ির কর্তার আকস্মিক মৃত্যু, তার ওপর সংসার প্রতিপালনের কর্তব্য, সব মিলিয়ে নাজেহাল অবস্থা। বুদ্ধেশ্বর স্থানীয় পোস্ট অফিসে ডাক পিওনের চাকরি করতেন। বুদ্ধেশ্বরের অবর্তমানে সেই জায়গাটি ফাঁকা পড়েছিল। সেই পদেই চাকরিতে যোগ দেন পুতনা। তবে এই সিদ্ধান্ত কিন্তু এত চটজলদি নেওয়া সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। একটি মেয়ে হয়ে কিভাবে এই দায়িত্বপূর্ণ কাজ তিনি করবেন, এই নিয়ে তাঁর নিজের মধ্যেই সংশয় ছিল। কাজে যোগ দেবেন কি দেবেন না, এই দ্বিধা নিজের মধ্যেই ইতস্ততভাবে কাজ করছিল। পরে আশেপাশের মানুষজন তাঁর পাশে দাঁড়ান। ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্য পুতনাকে আর্থিক দিকে সাবলম্বী হতেই হবে, একথা গ্রামের মানুষই তাঁকে বোঝান। এককথায় বলা যায়, সমগ্র আদিবাসী সমাজের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই তিনি প্রথম এই চাকরিতে যোগ দিতে রাজী হ’ন।
কাহিনী শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল যেন কোনো অচিনপুরের রূপকথা শুনছি। সদ্য বিধবা এক মহিলাকে চাকরি করতে পরামর্শ দিচ্ছে গোটা সমাজ। এমন পৃথিবীর অস্তিত্ব তাহলে আছে এই ব্রহ্মান্ডে। এমনটাও হয় নাকি। তবে যে আদিবাসীদের সবাই ‘পিছিয়ে পড়া’ বলে। এক ঝলকে মনে পড়ে যায় তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজের কীর্তিকলাপের দৃশ্যগুলো। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অনেক ছবি। দেখতে পাই পাশের ফ্ল্যাটে চাকুরীরতা বধূর মলিন মুখ। দেখতে পাই বস্তির মেয়ের সস্তা কাজ দিয়ে রূপসী সাজার চেষ্টা। দেখতে পাই, থানার ভেতর বসে একটি মেয়ে কাঁদছে। দেখতে পাই, হাসপাতালের জরুরী বিভাগে একটি মেয়ে কাতরাচ্ছে। দেখতে পাই, পাশের বার্ন ওয়ার্ডে আধপোড়া এক নীরব মেয়ের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। দেখতে পাই, আদালতের সামনে মরা মাছের মতো ঠান্ডা আবেগহীন চোখ নিয়ে একটি মেয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করছে। এরাও যদি একটু আশ্রয় পেত, একটু সমর্থন পেত, বেঁচে যেত। পুতনার জীবনে এই সামাজিক সমর্থনের গল্প শুনতে শুনতে মূলস্রোতের সামাজিক আচরণের হাতে বলি হওয়া মেয়েদের জন্য বড্ড আফশোস হয় আমার। খানিকটা হা-হুতাশ তুলে রাখি নিজের জন্যও।
‘ডাক-পিওন’ কথাটি ভাবলেই এক পুরুষের চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পথঘাট ডিঙ্গিয়ে ছুটে চলেছে রানার, ছবিটা এই কাল্পনিক পুরুষ অবয়বকেই স্বীকৃতি দেয়। আসলে, ছোটাদৌড়ানোর কোনো কাজ করতে একজন পুরুষকেই লাগবে, মেয়েরা এসব কাজে ঠিক পারদর্শী নয়, এই ধারণা খুব ছোটোবেলা থেকেই সমাজ আমাদের শিখিয়ে দেয়। মেয়েদের কি করা যাবে আর কি করা যাবে না, এই সিদ্ধান্ত বোধহয় মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে সমাজ নামক বাহ্যিক পরিকাঠামো তৈরী হওয়ার সময় থেকেই নেওয়া হয়েছিল। পিৎজা হোক বা কুরিয়ার পৌঁছানোর কাজ। সব ক্ষেত্রেই কিন্তু ‘ডেলিভারী বয়’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশে ‘ডেলিভারী’ এর সাথে ‘গার্ল’ বা ‘উওম্যান’ শব্দটি প্রযোজ্য হয় না কোনো মতেই। সেভাবেই ডাক হরকরা নামক এই পেশার সাথে পুরুষের ছবিটি প্রায় স্থায়ীভাবে সেঁটে দিয়েছে। কিন্তু চিরাচরিত এই ধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন পুতনা। তাঁর সাথে সমানভাবে তাল মিলিয়ে সমর্থন করেছে আদিবাসী মুন্ডা সমাজ। মূলস্রোতের সমাজে আজও চাকুরীরতা মেয়েদের বাঁকা চোখে দেখা হয়, সে অনৈতিক কিছু করে মাঝরাতে বাড়িতে পা রাখল। পেশাগত দিক থেকে মহিলারা ওপরে উঠলেই বলা হয় কোনো অনৈতিক ‘কম্প্রোমাইজ’ করেই তারা ওই পদটি লাভ করেছেন। যেন মেয়েদের কোনো কর্মদক্ষতা নেই। তাদের শরীরিক সৌন্দর্যই তাদের ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র চাবিকাঠি। মহিলারা কোনো পুরুষতান্ত্রিক পেশায় পা রাখলে চাপ তার থেকে কয়েকগুণ বেশী। যে পেশায় পুরুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত, সেখানে মেয়েদের প্রবেশ যেন নিষিদ্ধ। ‘হঠাৎ এখানে কেন ?’ এই জাতীয় কোনো পেশায় এলে প্রথমেই এই অদৃশ্য প্রশ্ন করে পেশাগত পরিবেশ। এরপর উঠতে বসতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এই জায়গা তোমার জন্য নয়, তুমি বরং শিক্ষকতা করো বা কোনো ব্যাক অফিসে গিয়ে কেরানীর চাকরী নাও, এত দৌড়-ঝাঁপ তোমার ‘কম্ম’ নয়। এই উপেক্ষাকে উড়িয়ে সেই কাজে সফল হলেও স্বীকৃতি দিতে কঞ্জুসি করে পাঁকে পড়ে থাকা সামাজিক পরিকাঠামো।
‘কেমন অভিজ্ঞতা আপনার ?’ নিজের মধ্যে হাজারো নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় ভরা ঝুলি লুকিয়ে পুতনাকে এই প্রশ্ন করলাম।
‘মাঝে মাঝে হাতি ঠাকুরের ডাক শুনে বুকটা কেঁপে উঠত। সবাই বলত, ওদিকে আজ হাতির পাল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভাল্লুক, হনুমান, সজারুর হাতে প্রাণ যাওয়ার ভয় তো ছিলই। কিন্তু কখনও কোনো খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়িনি,’ পুতনা উত্তরে জানিয়েছিলেন।
ভারতীয় ডাক ব্যবস্থায় মহিলাদের ক্ষমতায়ন কিন্তু নতুন নয়। ২০১৩ সালের ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে ভারত সরকার প্রথম মহিলা পরিচালিত একটি ডাকঘর চালু করে। নিউ দিল্লীর শাস্ত্রী ভবন এলাকায় এই নয়া মহিলা পরিচালিত ডাকঘরটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী কপিল সিব্বল। গোটা ডাকঘরের ছোটো থেকে বড়ো প্রতিটি পদের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহিলাদের হাতে। ডাকব্যবস্থায় মহিলাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রবেশে এটিই প্রথম সিলমোহর। কিন্তু মহিলা ডাক হরকরার সন্ধান খুব একটা পাওয়া যায় না। এই ক্ষেত্রে মহিলারা এখনও ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবেই বিবেচিত হ’ন। পুতনাকে দেখলে মনে হয়, রাজধানী বোধহয় এখনও এই মানুষটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। এঁনার খোঁজ পেলে নিঃসন্দেহে এঁনাকেই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ‘আইকন’ বানানো হ’ত।
সামাজিক সমর্থনের এই বিষয়টি কিন্তু আজকের নয়। ২৯ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর, এই বিধবা আদিবাসী মহিলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল তাঁর নিজের সমাজ। সেইসময় চিঠি-পত্রের গুরুত্বও ছিল অনেক। পাহাড়ী দুর্গম অঞ্চলে চিঠি-পত্রই ছিল মানুষের যোগাযোগের একটা বড় মাধ্যম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাহাড়ের ওপর রাস্তাঘাট ছিল না। চিঠি হোক বা টাকা-পয়সা পাঠানো, মানুষ ডাক ব্যবস্থার ওপরেই নির্ভরশীল ছিল। মানুষ ডাক-হরকরার আওয়াজের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। সে যুগে তো আর ইন্টারনেট-এর চিহ্নও ছিল না। তাই আজ বিষয়টা যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ততটাই কঠিন ছিল কাজের ক্ষেত্র। একে রাস্তাঘাটের অভাব, তার ওপর জংলী জানোয়ারের আক্রমণের সম্ভাবনা। অন্যদিকে চিঠি বা মানি অর্ডার সময় মতো সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর পাহাড় প্রমাণ চাপ। সেই সময় মোবাইল ফোনও ছিল না। তখন থেকেই পুতনার কাঁধে রয়েছে ২৫টি গ্রামের চিঠি পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব। তখন থেকেই এই ২৫টি গ্রামের মানুষের কাছে পুতনা ছিলেন একমাত্র আশার আলো।
‘সেই সময় আপনার আশেপাশের পুরুষ প্রতিবেশীদের আচরণ কেমন ছিল ? কিংবা যেসব গ্রামে চিঠি পৌঁছতে যেতেন তাদের ব্যবহার কেমন ছিল ?’ খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল আমার তরফ থেকে। উত্তর শুনে কিছুটা আশাহত হ’লাম। আবার মনে মনে ওপরওয়ালাকে ধন্যবাদও দিলাম। এই ২৯ বছরের সুদীর্ঘ কর্মজীবনে পুতনাকে কোনোরকম খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি। কাজে যোগ দেওয়ার সময় যখন তিনি ইতস্ততবোধ করেছিলেন তখন তাঁর গ্রামবাসীরাই তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিল। কখনো কোনো গ্রামে গিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আটকে পড়েছেন বা সন্ধ্যে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে, সেই গ্রামের কোনো পুরুষই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সসম্মানে, নিরাপত্তার সাথে সেই পুরুষরাই তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন। মূলতঃ এই অঞ্চলের প্রায় সব গ্রামই আদিবাসী অধ্যূষিত। মুন্ডা ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের আদিবাসীরাও এখানে বাস করেন। সেদিক থেকে দেখলে, এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে, অযোধ্যাকেন্দ্রিক জঙ্গলমহলের প্রায় সমগ্র আদিবাসী সমাজই সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এই ‘মহিলা’ ডাক হরকরার দিকে।
‘সবার সাহায্য না পেলে কাজ করা সম্ভব ছিল না।’ পুতনার স্বীকারোক্তিতে আশ্বস্ত হ’লাম। ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা তিনশো ছিয়াত্তর বা তিনশো চুয়ান্ন এখনও একবারও তাঁকে ব্যবহার করতে হয়নি জেনে মনে মনে বেশ খুশিই হ’লাম।
কয়েক বছর আগে ভারতীয় ডাক বিভাগের তরফ থেকে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা চালু করা হয়। প্রথম দিকে এই অঞ্চলের মানুষ এই প্রকল্প সম্বন্ধে ততটা উৎসাহী ছিলেন না। পুতনা গ্রামে চিঠি বিলির ফাঁকে এই প্রকল্পের সুবিধা সম্পর্কে সবাইকে বোঝান। তারপর থেকেই ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে এই প্রকল্প। এক ডাক কর্মচারী তেমনটাই জানালেন। একইভাবে এই এলাকায় স্বল্পসঞ্চয়ে গতি আসার পেছনেও পুতনার অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। ডাক বিভাগের এক বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে মানিঅর্ডার গুলির ক্ষেত্রেও সততার পরিচয় দিয়েছেন পুতনা। সাম্প্রতিককালে, আধার কার্ড’এর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। ২৬ বছর ধরে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন বিবেকানন্দ মাহাতো। বিবেকানন্দ অযোধ্যা হিল টপ শাখা ডাকঘরের পোস্ট মাস্টার হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন দীর্ঘদিন। হিসেবমতো, তিনি পুতনার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ‘বস’ হিসেবে পুতনাকে ‘দায়িত্ববান-কর্মঠ-কর্মী’ হিসেবে দেদার ‘সার্টিফিকেট’ দিলেন বিবেকানন্দবাবু। নোটবাতিলের সময়ও প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করতে হয়েছে ডাককর্মীদের। পুতনাও একই সাথে নানা ধরনের দায়িত্ব সামলেছেন। চিঠি দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করার সাথে সাথে তাঁকে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজকর্মও করতে হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হলেও, নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তার জেরে সব বাধা অতিক্রম করেছেন এই মানুষটি।
পুতনা দেখেছেন মাওবাদের ভয়াবহতা। বাংলার জঙ্গলমহলে যখন মাও’রা আস্তানা গেড়েছিল, সেই সময়ও তিনিই ছিলেন একমাত্র ডাক হরকরা। অযোধ্যার খাঁজে খাঁজে অবস্থিত গ্রামগুলিতে তিনিই পৌঁছে দিয়েছেন চিঠি। মাওবাদের কারণে সে সময়কার রাজনৈতিক দোলাচলের তিনিই সাক্ষী। মাওবাদীরা আসত গ্রামগুলিতে, তাদের খোঁজে আসত পুলিশ। পুলিশ গ্রামের মানুষকে মাওবাদীদের ঠিকানা জিজ্ঞেস করত। পুলিশ ভাবত, গ্রামের মানুষ মাওবাদীদের ঠিকানা জানে। মাওবাদী আর পুলিশ, এই দুই-এর মাঝে পড়ে আতঙ্কে দিন কাটাতেন পাহাড়ের মানুষজন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন পুতনা।
‘কোনোদিন মাওবাদী বা পুলিশের পাল্লায় পড়েছিলেন নাকি।’ স্বাভাবিক কৌতূহলবশতঃ প্রশ্ন করলাম।
‘না-না...’, পুতনাও হেসে ফেললেন। এলাকার মানুষ যেমন তাঁকে চিনতেন, তেমনই স্থানীয় পুলিশ কর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। পুতনাকে তাই এই উত্তাল সময়েও কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। সেই সময় মাওবাদীদের রোষের শিকার হতে হয়েছিল অনেক সরকারী কর্মীকে। শিক্ষক হোক বা পুলিশ আধিকারিক, মাও’রা কাউকেই রেহাই দেয়নি। তবে সৌভাগ্যক্রমে ডাক হরকরা পুতনাকে ‘টার্গেট’ করেনি তারা।
পুতনা মুড়াকে আবিষ্কারের সিংহভাগ কৃতিত্ব কিন্তু গবেষক তরুণ সরকারের। তরুণবাবু ভারতীয় অর্থনীতির ওপর ভারতীয় ডাকব্যবস্থার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনিই প্রথমে পুতনা’র কথা আমাদের জানান। বিপন্নপ্রায় আদিবাসী ভাষা নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব ছিল আমাদের ওপর। এক সময় চিঠি আদানপ্রদানের দীর্ঘ পথে ডাক হরকরারা নানা ধরনের কাজ করতেন। মূলতঃ এই দীর্ঘ সময়ে একঘেঁয়েমি কাটাতে আর কষ্টকর পরিশ্রমের ক্লান্তি কাটাতেই গানকে নিজেদের আনন্দের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন তাঁরা। পুতনাও তাঁর যাত্রাপথে কিছু মুন্ডারী লোকায়ত গান করেন। সেদিক থেকে দেখলে বলা যায়, মুন্ডারী ভাষা ও লোকসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার পেছনেও তাঁর অবদান রয়েছে।
শুধুমাত্র ডাক বিভাগের কর্মসূচী নয়, ব্যাঙ্কের খুঁটিনাটি সম্পর্কেও পুতনা ওয়াকিবহাল। পুতনা জানালেন, অযোধ্যা হিল টপ অঞ্চলের কাছাকাছি কোনো ব্যাঙ্ক নেই। তাই স্থানীয় মানুষের ভরসা সেই আদি ও অকৃত্রিম ডাকঘরই। পুঁথিগত বিদ্যা না থাকলেও যে, জীবনের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ নিজেকে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষমতা রাখে, পুতনা তার অন্যতম উদাহরণ।
আমরা আজীবন মেয়েদের, ‘মেয়ে’ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছি। মেয়েদের মানুষ হিসেবে সমাজ স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে বার বার নিজেদের ‘মানুষ’ প্রমাণ করেছে মেয়েরা। যাবতীয় দুর্দশার শিকড় হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত সমাজকে দূষছি। এমন দুর্বিষহ সময়ে পুতনার মুন্ডারী সমাজ এগিয়ে এসেছে। নিজের চেষ্টায় সাধারণ মানুষের কাছে নিজের গুরুত্ব তৈরী করেছেন পুতনাও।
একটি পৌরাণিক উপকথা অনুযায়ী, পুতনা একটি রাক্ষসীর নাম। রাজা কংস, শ্রীকৃষ্ণকে মারার জন্য এই রাক্ষসীকে পাঠিয়েছিলেন। গোকুলধামের বহু শিশুকে স্তন্যপান করিয়ে এই রাক্ষসী পুতনা হত্যা করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন নারায়ণের অবতার। শিশু শ্রীকৃষ্ণকে স্তন্যপান করাতে গিয়ে মৃত্যু হয় পুতনার। আমাদের পুতনা কিন্তু ঠিক এর বিপরীত চরিত্রের। তিনি তাঁর সন্তান-সন্ততিদের মানুষ করতে গিয়ে পরিশ্রম করেছেন। বাচ্চাদের মুখে দুটো অন্ন তুলে দেওয়ার তাগিদে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। কঠোর পরিশ্রম দিয়ে জিতে নিয়েছেন হাজারো গ্রামবাসীর হৃদয়।
‘রানার গ্রামের ডাক হরকরা, রাতের পর রাত ক্লান্তিহীন মানুষের সুখ দুঃখের খবরের বোঝা বয়ে সে পৌঁছে দেয় দোরে দোরে, কিন্তু তার খবর কে রাখে ? রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে... রানার রানার চলেছে রানার... রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার... দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার রানার... কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার.... রানার রানার....।’ পাহাড়ী আলপথের ছোট্ট চা দোকানে হেমন্তের কণ্ঠ ভেসে যায়। শীতের শুরুতে গাছের শুকনো পাতাগুলো মাটিতে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকে। পুতনার পা কিন্তু থামে না...।
[পুনশ্চঃ ‘জনজাতি দর্পণ’এর জন্য পুরুলিয়াতে পুতনা মুড়ার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। ম্যাগাজিনের সম্পাদক অধ্যাপক ডঃ ইন্দ্রনীল আচার্যের নির্দেশ ছিল পুতনা মুড়া’কে নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখতে হবে। সাংবাদিকের কর্তব্য যেকোনো ঘটনা নিরপেক্ষভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা। সাংবাদিক কখনোই সেই প্রতিবেদনে নিজের ব্যক্তিগত মতামত ব্যক্ত করতে পারেন না। নিজের ব্যক্তিগত আবেগ যাতে না প্রকাশিত হয়, সে ব্যাপারেও একজন দক্ষ সাংবাদিককে সদা সচেতন থাকতে হয়। কিন্তু জীবনে কিছু সময় আসে, যখন যাবতীয় শর্ত ভাঙ্গতে ইচ্ছা করে। যুক্তি আর মাথা ছাড়িয়ে, সেই সময় হয়ত মন আর আবেগ বেশী প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হাজার চেষ্টার পরেও আমার নিজস্ব আবেগ আর অভিজ্ঞতার স্রোতের বহিঃপ্রকাশকে আমি রোধ করতে পারিনি। এই প্রথমবার কোনো মানুষের জীবনের সাথে নিজেকে একাত্ম বলে মনে হয়েছে। সেই জীবনের পরিস্থিতির সঙ্গে বার বার নিজের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির তুলনা টানা হয়ে গিয়েছে। সবটা হয়েছে নিজের অজান্তেই। প্রতিবেদন লেখা শেষ করে, ফের পড়তে গিয়ে হুঁশ ফিরেছে। পুতনা নামক এই মহিলার জীবনকাহিনী নিঃসন্দেহে নারীবাদের তকমা দেওয়া কাহিনী হয়েই প্রশংসা কুড়তে পারত। কিন্তু আমি মানবতার কাহিনী তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি প্রকাশ করতে চেয়েছি এমন এক সমাজের দৃষ্টিকোণের কাহিনী, যা অনায়াসে উদাহরণ স্থাপনের ক্ষমতা রাখে। এরপর হয়ত অনেকেই আমাকে ‘অপেশাদার’ বলবেন। কিন্তু শেষ বিচার করার দায় পাঠককুলের।]
কৃতজ্ঞতা—
১। ডঃ ইন্দ্রনীল আচার্য (অধ্যাপক, ইংরাজী বিভাগ, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়)
২। তরুণ সরকার (শিক্ষক ও গবেষক)
৩। পুতনা মুড়া (ডাক-হরকরা, অযোধ্যা হিল টপ শাখা ডাকঘর)
৪। বিবেকানন্দ মাহাত (পোস্ট মাস্টার, অযোধ্যা হিল টপ শাখা ডাকঘর)
৫। ডাক বিভাগ, পুরুলিয়া।
লেখক : বিশিষ্ট গণমাধ্যম কর্মী এবং জনজাতি বিষয়ে ফিচারধর্মী লেখক।