ভাদ্রের শেষ, আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা। বৃষ্টির দাপট অনেকটা কম। ভোরের হাওয়ায় একটা ঠাণ্ডা আমেজ। সোন্দরবনের এ জল জংলার দেশে নগেনের ছাটাক ফাটাক জমি। ধান রোয়া কবে শেষ। দুই লায়েক ছেলে খোকন আর তপন বর্ষায় লোকের বাড়ী জন মজুর খেটেছে। এখন আর কাজ নি। বাড়ীতে খোরাকির টানাটানি। বউ নমিতা বলে —
ঘরে বুসে না থাইকে চল, জঙ্গলে কাঁকড়া মারতি যাই। তোমার তো লৌকো আছে। ও পাড়ার হরি কেরির ছাইলেরা কালকে, কাঁকড়া ধরতি গেল।
— তা ভাল কথা মনে কুরেছ। ভাল গ্রেড কাঁকড়ার এখন অনেক দাম। বাইরির দ্যাশের লোকেরা এখন খাচ্ছে। জেলে বাতাড়িটার ছই করতি হবে। কাঁকড়া ধুরে রাখার জন্যি লৌকোর গুড়ো ওপর বাঁশের পাড়াং করতি হবে। কাঁকড়া ধরা দোন, থোপা জালতি সব গোছাতি হবে।
বউয়ের কথায় নগেন উত্তর দেয়।
— বাবা, আমি কি তোমাকে সঙ্গে যাব? ছোট ভাই বাড়ি থাকবে ?
— না আমরা তিনজন আর, তোর মা এই চারজনে কাঁকড়া ধরতি যাতি হবে। ছেলের কথায়, নগেন বলতে থাকে।
— আমরা গোনমুখ দিখে জঙ্গলে যাব। আর গাঙে মরানি সময় কাঁকড়া ধুরে ফেরবো। নগেনের বউ বলতে থাকে।
বিকেল পাঁচটা, গোধুলির নরম আলো চরের নরম গেওয়া গরান গাছ ঘিরে। গাঙে ভাঁটা লেগেছে। গাঙের ওপারে হেতাল বাড়ীর জঙ্গলে পাখ পাখালির চীৎকার কানে আসে। নৌকোয়, নগেন সরদার দাঁড় ঠিক করছে। জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে ছেলে বউ নিয়ে এক্ষুনি যাত্রা শুরু হবে। দুই ছেলে নৌকায় উঠে পড়ে। শেষে নমিতা রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে এসে পড়ে। নৌকোর পাটাতনে কাঁকড়া ধরা দোন, থোপা, সব সাজানো। এবার যাত্রা শুরু।
নৌকোয় গলুইয়ে তেল, সিঁদুর মাখিয়ে লাল গামছা বেঁধে ধূপ ধরায়।
— আটিগাঙ ভাটি বাওয়া
সাত পীর দরিয়া বদর বদর,
হালে দাঁড়ানো নগেনের গলার আওয়াছে, গাঙের স্তব্ধতা ভাঙে।
নৌকার আর সবাই সমস্বরে বলে উঠল
— মা বনবিবি বদর বদর,
বাবা শা জঙ্গলি বদর বদর
বাবা দক্ষিরায় বদর বদর
গাং ভেড়িতে দাঁড়ানো প্রতিবেশীরা হাত নেড়ে বিদায় জানায়।
সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে ভাঁটার টানে, এগিয়ে যায় নগেনের কাঁকড়ামারা জেলে বাতাড়ি। উত্তরডাঙার বাইনবনের শামুখখোল, বাটাং, পাখির কিচির মিচির আওয়াজ কানে আসে। নৌকার দাঁড়ের একটানা ছপ্ ছপ্ শব্দে রাত্রির নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে খুঁড়ে চৌচির হয়। নৌকায় ওদের কথাবার্তা কানে আসে।
— ভাঁটার টান আছে খোকন দাঁড় জোরে টান। কালিদাসপুর আবাদ রাইখে মরিচঝাপি জঙ্গলের দিকি যাচ্ছি।
— বাবা, দাঁড় জোরে বাচ্ছি। এর হিসনের কাঠ, খারাপ, জঙ্গলে তো কাঠ কাইটে ঠিক করতি হবে। ভাই তো জোরে দাঁড় টানছে।
নৌকোর ছইয়ের মধ্যে নমিতা, টেমি ধরিয়ে রান্নার জোগাড় করে। টিনের তৈরি মাইদের (উনুন) মধ্যে শুকনো কাঠের জ্বালে রান্না হবে। নমিতা অনেক বার কাঁকড়া ধরতে স্বামীর সঙ্গে এসেছে। এই কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম হল, ১০০০ হাত থেকে ১৫০০ হাত লম্বা নাইলেনের ‘দোন’। এই লম্বা নাইলেনের দড়ির গায়ে ঝোলানো থাকে টুকরো মাছের চার (খাবার)। জঙ্গলের মধ্যে লম্বা খাড়ি বা খালে এই দোন ফেলা হয়। দোনে এই মাছের চার খেতে ক্যাঁকড়া আসে। তখন হাতলওয়ালা জালতি দিয়ে ওই কাঁকড়া ধরা হয়। আবার জঙ্গলের মধ্যে চরে খাল পাড়ে কাঁকড়া ধরার থোপা পাতা হয়। পাঁচ থেকে ছয় ফুট বাঁশের কঞ্চি দিয়ে থোপা তৈরী হয় যার দশ-বারো ফুট নাইলনের দড়ি বাঁধা থাকে। দড়ির সঙ্গে ছোট ইঁটের টুকরো বাঁধা থাকে। দড়ির সঙ্গে কাঁচা বা শুকনো মাছের চার বাঁধা থাকে। জঙ্গলের চরে বাঁকানো লোহার শিক কাঁকড়ার গর্তে ঢুকিয়ে কাঁকড়া ধরা হয়।
— ভাঁটির ভাল টান আছে। আমরা গাঁড়ালে মুখি এসে পড়লাম। তোরা জোরে দাঁড় টান। আর তিন বাঁক গেলে বোয়ালখালি গাঙে পড়বো।
নগেনের গলার আওয়াজে রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। এবার নদীর দুদিকে ঘন জঙ্গল। নাম না জানা ফুলের মিষ্টি সুবাস ভেসে আসে। এই আবছা আলো আঁধারে মিঞা ঘোরেন শিকারের আশায়। ভাঁটার মত দু চোখ জ্বলতে থাকে রাতের আঁধারে। দূরে পীরখালি, গাজি খালির দিকে কাঁকড়া মারা নৌকো, মাছ ধরা নৌকোর অস্পষ্ট আলো দেখা যায়। দূরে ওদের কথাবার্তা কানে আসে। এরা সবাই সুন্দরবনের অভাবী মানুষ, পেটের দায়ে কেউ মাছ ধরতে, কেউ কাঁকড়া ধরতে, কেউ বা মধু কাটতে আসে। জঙ্গলে বড় মিঞার দৌরাত্ম্য খুব বেড়েছে। জঙ্গলে এসে, কেউ ফেরে, কেউ ফেরে না। এদের বউ, ছেলের কান্নায় বনের আকাশ ভারী হয়।
— আমরা বোয়ালখালি গাঙে এসে পড়েছি। খোকন, এবার গাঙে গেরাফিনটা মেরে দে। গাঙে গোন আসটি আর বেশী দেরী নি।
বাবার কথা শুনে খোকন গেরাফিন গাঙে ফেলে দেয়। নৌকা এবার গাঙের মাঝখানে স্থির হয়। নগেন গলুইতে গিয়ে মা বনবিবির নামে প্রণাম করে। লোনা জল গায়ে মাথায় দেয়। নমিতার রান্না শেষ হয়েছে, আঁচের আগুনে জলের ছিটা দেয়। নগেনের দিকে তাকিয়ে বলে।
— এবার নৌকায় বুসে, ‘‘আলসে মন্ত্রটা’’ বল। মোল্লাখালির সুকো বাউলের কাছে শেখা। বনে জীবজন্তু দানব দত্যি, সব নির্জীব হুয়ে যাবে।
বউয়ের কথা শুনে নগেন গলায় গামছা দিয়ে বিড় বিড় করে আলসে মন্ত্র বলতে থাকে। অস্পষ্ট আওয়াজ কানে আসে।
— দুগাপাঁকায় সুতো, মহম্মদ বুনে জাল,
সেই জালে বন্দী হল, বনের যত বাঘ
বত্রিশ কোটি দন্ত বন্দ,
জিহ্বার জিহ্বা বন্দ
বন্ধ করি শিব
আজ সারা দিনের মদ্ধি তুই যদি হাত পা নাড়িস।
তবে দেখিস, কার আজ্ঞে ?
দোহাই মা বনবিবির আজ্ঞে
আলসে মন্ত্র শিগগির কুরে লাগগে।।
নগেন তিনবার মন্ত্র আওড়ালো। উত্তেজনায় ওর চুল খাড়া হয়ে উঠলো। জল জঙ্গলে লড়াই করার শক্তি যেন এবার পেয়ে গেল।
— চোখে মুখি জলের ছিটে দে, এবার নৌকোর ছইয়ের মধ্যে অ্যাসো।
নমিতার কথায় নগেনের চমক ভাঙে। দুই ছেলেকে নিয়ে এবার নৌকার ছইয়ের দিকে যায়। নৌকার মধ্যে ভাত, ডাল নিরামিষ তরকারী দিয়ে ওদের খাবার পর্ব শেষ হল। নৌকার মধ্যে বসানো খাবার জলের মাইটে থেকে জল নিয়ে খেল। জল জঙ্গলের এই দেশে তবু মিষ্টি জলের অভাব। ঐ বড় পাত্রে এক সপ্তার জল নেওয়া আছে। দুই ছেলে নিয়ে নগেন শুয়ে পড়ে, নমিতা জেগে থাকে। বনের থেকে যদি কোন বিপদ হয়। বড় মিঞার থেকে আরও বড় বিপদ হয়। গাঙডাকাত। এরা এসে নৌকোয় সব লুট করে পালায়। জঙ্গলের কষ্টের ফসল এভাবে লুট হয়। সরকারের কাছে জানিয়ে কোন ফল হয় না। এভাবে দলিত দুঃখী মানুষের বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। রাত গভীর হয়। নমিতা এবার ঘুমুতে যাওয়ার আগে, নগেনকে ডেকে দেয়। নগেন এবার ঘুম থেকে উঠে, নৌকার গলুইয়ে গামছা পেতে বসে। নিস্তব্ধ রাতে দূরে বনের মধ্যে জোনাকির মিটি মিটি আলো একটানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার তীক্ষ্ম আওয়াজে জঙ্গলের ভয়ঙ্করতাকে বাড়িয়ে দেয়। বনের মধ্যে এই গভীর রাতে কাঠ কাটার অস্পষ্ট আওয়াজ কখনও বা ‘‘বাঁচাও’’, ‘‘বাঁচাও’’ বলে কান্নার আওয়াজে নগেন ভয়ে জড়সড় হয়। এক মনে মা বন বিবির নাম মনে মনে আওড়াতে থাকে। নমিতা তখনও ঘুমায় নি, সে জিজ্ঞেস করে —
— ওই যে বনের মধ্যে কাঠ কাটার আওয়াজ, আবার কান্নার শব্দ, এগুলো কিসের ?
— যারা বনে কাঠ কাটতে, মধু কাটতে আসে। তারা বড় ফকিরে (বাঘ) মুখি আওঘাতে মরণ হয়, তাদের আত্মার শান্তি হয় না। তার আত্মা অতৃপ্ত হয়ে ভুতপ্রেতের মত রাতের আঁধারে বনের মধ্যি ঘুরে বেড়ায়। নগেন ভয়ে ঘোরের মধ্যে উত্তর দেয়।
ভোরের আগেই নগেন ছইয়ের মধ্যে শুয়ে পড়ে। রাত জাগলে তো সকালে কাঁকড়ার দোন ফেলতি পারবে না।
ভোর, পূব আকাশের রঙের আভায় গেমো গরান গর্জনের জঙ্গলে শামুখখোল বাটাং বকের চিৎকারে নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। দূরে চরে এক দল চিতল হরিণ চরের নরম ধানী ঘাস খেতে দেখা যায়। নৌকার লোকজন, ঘুম থেকে আস্তে আস্তে উঠে পড়ে।
— খোকন তপন তোরা তাড়াতাড়ি মুক হাত ধুয়ে নে। কাঁকড়া মারা দনের চারা লাগাতি হবে। তোর মাকে ডাক, নুনজলে ডোবানো মিনুমাছের চার গুনো দিতি বল।
নগেনের আওয়াজে খোকন বড় গামলায় মাছের চারগুলো নৌকোর পাটার উপর নে আসে। এবার লম্বা, দোনের সঙ্গে বাঁধা সরু নাইলেনের দড়ির সঙ্গে মিনুমাছের চার ভাল করে বাঁধে। এভাবে নৌকার পাটায় দড়িতে বাঁধা চার সাজিয়ে সাজিয়ে রাখে, ভাই তপন লম্বা দোন ধরে রাখে। এভাবে ১৫০০ হাত দোনে ৩০০ মাছের চার বেঁধে রাখে।
— ওগো, এবার তুমি থোপার মাছের চার গুনো বাইধে রাখ। আমি গেরাফি তুলে নৌকা ছাইড়ে দিচ্ছি। নগেনের গলার আওয়াজে নমিতা মোটা কঞ্চির কাঁকড়া ধরা থোপাগুলোয় চার লাগাতি থাকে।
— শেষ ভাঁটায় এবার কালির খালের দিকি এগুই। ওই খালে দোন পাতলি ভাল কাঁকড়া পাব। নগেনের মুখে আশার আলো ঝিলিক মারে।
— হ্যা গত বছর তো এই গাঙের দিকি কাঁকড়া মারিত আইয়েলাম। মা বনবিবির দয়ায় ভাল মাল পাইয়েলাম। আমরা এখন থোপা ও দোনের কাজগুনো গোছাই।
সকালের নরম রোদ মেখে ছইওয়ালা নৌকো বনের গভীর নির্জনতা ছুঁয়ে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বোয়ালখালি নদী দিয়ে এগিয়ে যায়। দূরে রায়মঙ্গলের ত্রিমোহনার মুখ অস্পষ্ট দেখা যায়। ঠাণ্ডা হা্ওয়ায় নদীর চরে বাটাং বালি হাস মাছের আশায় ওত পেঁতে আছে। নৌকো চলার সাথে ছোট ছোট রূপালি পার্শে ভাঙন জলে লাফিয়ে আবার জলে পড়ছে। খোকন মাছগুলো ধরে নেয়। যেতে যেতে বনের চরের মধ্যে একটা ছোট গোল পাতার ঘরে বনবিবি শাজঙ্গলির মূর্তি বসানো। নৌকায় নগেনের কথাবার্তা কানে আসে।
— নৌকা এবার থামাই, মা বনবিবির থানে হাজোত দিতে হবে। তোরা সব বাসি কাপৱ ছাইড়ে ধোয়া কাপড় পুরে নে, এবার মায়ের পুজো দিতি হবে।
নৌকোটা বাঁশের লগি পুঁতে বেঁধে রাখে। দুই ছেলে বউ নিয়ে নগেন নোনা চরে নামে। ওরা সবাই চর ঠেলে জঙ্গলের মধ্যে চলে আসে। ছোট গোল পাতার ঘরে উঁচু কাঠের পাটাতন। এর উপর মা বনবিবির শাজঙ্গলির মূর্তি বসানো। মিনতি মায়ের ঘরে পরিষ্কার করে প্রদীপে তেল দিয়ে প্রদীপ ধরায়, কয়েকটি ধূপ ধরিয়ে দেয়। এবার একটা ছোট থালায় ফুল বাতাসা ফল রেখে মায়ের নৈবেদ্য দেয়। এবার বনবিবির জহুরীনামা পড়তে থাকে। নগেন ও দুই ছেলে হাত জোড় করে মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। নির্জন সকালে এই গহন জঙ্গলে নমিতার সুর করে পড়া মা বনবিবির মাহাত্ম্য কথা করুণ সুরে ভেসে বেড়ায়। ‘‘বনবিবি শাজঙ্গলি ভাই বহিনেতে
যে রূপে হলেন পয়দা বোনের বিচিতে’’
* * * * *
যে রূপে দুঃখেরে লইয়া কোলেতে
মা আমার বেড়ান ঘুরে আটারো ভাটিতে।’’
পূজা শেষ। মা বনবিবির সিন্নী নিয়ে ওরা নৌকোর দিকে এগুতে থাকে। মিনতির বেদনা মাখা করুণ স্বর কানে আসে — জয় মা বনবিধি জয়মা দুঃখেরে যেমনি বিপদে রক্ষা করলি আমাগো তেম্নি করিস। জয় বাবা শাজঙ্গুলি তোর দয়া লাগে গরিব গুরোমানুষ, দুটো পয়সার জন্য সোয়ামীর ছাবাল নে ভালয় ভালয় গেবারিতি পারি।
জয় মা বনবিবি।
নগেন চর ঠেলে নৌকোয় ডালিতে বসে, পা ধয়ে নেয়, বৌ, ছেলেদের হাঁক মারে।
— তোরা সকুলি তাড়াতাড়ি আয় গাঙে গোন (জোয়ার) লেগেছে। আমাক যাতি যাতি কালির খালের মুখি জল উঠবে।
বাবার কথায় খোকন, ভাই ও মাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি নৌকোয় উঠে পড়ে।
— এই উজুনে আর এগুনে যাবে না, খোকন তপন তোরা দাঁড় টান।
বাবার কথায় দুজনে দাঁড় টানতে থাকে দূরে বনরক্ষীর পেট্রোল বোট ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। জোরে এসে বোট ওদের জেলে বাতাড়ির কাছে আসে।
— নৌকার মাঝি কে ? তোমাদের পাশ দেখাও। নগেন বুটে রেখে, ওদের কাছে আসে।
আমরা, দুই ছেলে আর বৌ নে কাঁকড়া মারতি আয়ছি। আমার বি.এল.সি. পারমিট আছে। আবার মাছ কাঁকড়া মারা পাশ আছে।
দোনলা বন্দুক হাতে খাকি প্যান্ট পরা লোকটাকে নগেন সব কাগজপত্র দেখায়।
— বেঙ্গল ফরেস্ট এরিয়ায় থাকবে। টাইগার ফরেস্ট ও কোর এরিয়ায় যাবে না। বিপদ হলে ক্ষতিপূরণ পাবে না।
ফরেস্টার বাবু নগেনকে বলে।
— বাবু, বি.এল.সি. নিতি অনেক টাকা লাগে। কাঁকড়া না পালি আমরা জানে পরানে মরবো। আমরা কি দু একটা দোন বাতি টাইগার বনে যাব না ? ভয়ে ভয়ে নগেন ফরেস্টারদের বলে।
— না ওদিকে আর যাবে না। তোমার বড় মিঞা ছাড়াও গাঙ ডাকাত আছে। মাছ কাঁকড়া টাকা নৌকা সব কেড়ে নিয়ে চরে ফেলে দেবে। সাবধান ওদিকে গেলে খুব বিপদ।
ফরেস্টারের ভয় দেখানো কথায় নগেন মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়।
দু সিলিণ্ডারের ফরেস্টারের বোট চোখের নিমিষে ঢেউ তুলে বাঁকের আড়ালে অদৃশ্য হয়। মোচার খোলের মত ওদের নৌকা দুলতে থাকে।
আটটা বাজে, সমুদ্র থেকে প্রবল বেগে জোয়ারের জল জল-জঙ্গলের নদীতে ঢুকে পড়ছে। স্রোতের বিপরীতে উজোনে ঢাঁড় টেনে নগেন কালীর খালের মুখে এসে পড়ে। দেখতে দেখতে নদীতে আদানি জোয়ার হয়েছে। নৌকা থেকে ওদের কথাবার্তা কানে আসে।
— বাবা খালের মধ্যি নৌকা ঢোকাও। আমি কাঁকড়া মারা দোন ছাড়ি। তুমি বুটে বাইয়ে খালের মধ্যি আগিয়ে যাও।
১৫০০ হাত কাঁকড়া মারা দোনের দু-মাথায় দুটো আধলা ইট বাঁধা। আর দুটো আলাদা দড়িতে দোনের দু-মাথায় দুটো ছোল বাঁধা। এই দোন হল মাঝারি সাইজের প্লাস্টিকের বল, জলে ভাসমান অবস্থায় দোনের অবস্থান বোঝা যায়। দোনে ৬-৭ হাত অন্তর জালের কাঁটি বাঁধা থাকে। এবার চারা (কাঁকড়ার খাবার) বাঁধা হয় দুটো কাঁটির মাঝখানে। জঙ্গলে বড় খাল বা ঝোরার মধ্যে নৌকো থেকে দোন পাতা হয়। গাঙে জোয়ার বাড়লে নৌকা দোনের কাঁকড়া তুলতে তুলতে উল্টোদিকে এগিয়ে যায়। নৌকোয় একজন দোন তোলে অন্য একজন রেডি হয়ে থাকে দোনে কাঁকড়া দেখলে জালতি বা খ্যাপাজালে কাটিয়ে জল থেকে নৌকায় তোলে।
— খোকন আমি নৌকা এই খালির মধ্যি এগুচ্ছি তুই ভাল করে দোন জলে ছাড়, যেন জড়িয়ে না যায়। গোনের জলে খুব টান। খুব সাবধানে কাজ করবি।
— তুমি খালের মধ্যি জঙ্গলে চারিদিকি দেখ। বলা তো যায় না কখন বিপদ আসে। আমি দুপুরের রান্নার ব্যবস্থা করি। তপন তুই এই খ্যাপলা জাল নে নৌকোর থেকে এক খ্যামন জাল বা দেখি কি মাছ টাছ পাওয়া যায়।
মায়ের কথা মতো তপন খালের মধ্যে জাল ফেললো। অনেকগুলি পার্শে, ভাঙন, পাঙাশ পেল।
— মা এই মাছগুলো রান্না কর। কদিন ধুরে ছেচকি (নিরামিষ) খাইয়ে মুখি অরুচি হয়েছে। দাদার সঙ্গে আমি খালে দোন ছাড়ি।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাদ্রের রোদের তেজ বাড়ছে। দোন ফেলতে ফেলতে কালির খালের কত ভেতরে নৌকা চলে এলো। খাল তো নয়, যেন ছোট খাটো গাঙ এত চওড়া দুদিকে গর্জন, হেতাল, বাইন গাছের গভীর জঙ্গল যত দূর দৃষ্টি যায় আদিগন্ত সবুজের সমারোহ, দূরে বনের মধ্যে আবছা আলো-আঁধারি পরিবেশ নোনা কাদার মধ্যে সূচালো শ্বাসমূল হেতাল গোলপাতার ঘন ঝোপ ঝাড়, যেন কোন আদিম অরণ্যের গা ছম ছম করা পরিবেশ। নগেনের গলার আওয়াজে বনের নিস্তব্ধতা ভাঙে।
— খোকন এবার বুটে বাইয়ে খালের দিকতে গাঙের দিকি যাবি গাঙে জোয়ার এবার শেষ হয়েছে। কাঁকড়া মারা দোন তুলতি হবে। তপন দোন তোলবে, ওর মা জালতি নে দোনের তে কাঁকড়া তোলবে। আমি চরে নাইবে খালে কাঁকড়া ধরা থোপা পাতি। তোরা সাবধানে নৌকে নে গাঙের দিকি এগুবি।
বাবা আমরা দোনের তে কাঁকড়া তুলতি পারবে, তুমি চলে নাইবে থোপায় কাঁকড়া ধর।
নদীতে জোয়ার শেষ আর কিছু সময় পরে ভাঁটা লাগবে। নগেন অনেকগুলো থোপা নিয়ে খাল পাড়ে জঙ্গলে নামে হাতে কাঁকড়া ধরা জালতি, একটা হাড়ি আর গরান কাঠের মোটা লাঠি। খাল পাড়ে জঙ্গলের পূর্ব দিকটা অনেক ফাঁকা চর। এখানে ১০-১২ হাত দূরে দূরে থোপা পাতা হবে। নগেন খান তিরিশ থোপা পেতেছে। কিছু সময় পরে থোপায় কাঁকড়া ধরা শুরু হয়। নগেন থোপার দড়ির দিকে নজর দেয়। দড়ি একটু নড়া দেখলেই বোঝা যাবে থোপায় কাঁকড়া ধরেছে। এবার নগেন, জলে নেমে দড়িটা উপরের দিকে তুলে জালতি দিয়ে জলের থেকে কাঁকড়া তুলে হাড়িতে রাখে।
— খোকন, নৌকা আস্তে বাইয়ে নে, দোনে ভাল কাঁকড়া পড়েছে। আমি দোনের তে তুলে কাঁকড়া হাড়িতে রাখতিছি। পিছনে তোর বাবার থোপার দিকি নজর রাখ। বনের বেপদ কখন কি হয় বলা যায়।
মায়ের কথায় খোকন আস্তে আস্তে নৌকা চালায়। রোদে শরীরের ঘাম ঝরতে থাকে। একটু দূরে জেলে নৌকায় লোকের কথাবার্তা কানে আসে। গরিব গুবো মানুষ পেটের নুন-ভাতের জোগাড়ের জন্য এই জল জঙ্গলের বিপদশঙ্কুল পথে মাছ, কাঁকড়া ধরতে আসে। কেউ বাড়ী ফিরে যায় আবার কেউ আর ফিরে না। জঙ্গলের বড় মিঞার শিকার হওয়া যেন এই হতভাগাদের নিয়তি। রোদের তেজ বাড়ছে। নোনানদীর উত্তরের ঠাণ্ডা কিছুটা স্বস্তি দেয়। দূর থেকে নগেনের কথা কানে আসে।
— খোকন তপন তোরা সাবধানে দোনের কাঁকড়া তোল। আমি খাল পাড়ে থোপায় কাঁকড়া তুলছি। বাবার গলার আওয়াজে খোকন পিছন ফিরে তাকায়।
— তুমি সাবধানে থোপার কাঁকড়া তোল। তোমার পেছনে হেতাল বনের দিকে তাকাও, চোখ কান খোলা রাখ। দোনের কাঁকড়া তুলে এক্ষুনি তোমার কাছে আসতিছি।
ছেলের কথায় নগেন একটু সজাগ হয়। দূরে হেতাল বনে কিছু একটা নড়তে দেখলো। ঠিক বোঝা গেল না। দূরে বানরে টাউ টাউ আওয়াজ কানে আসে। অনেক দিনের কাঁকড়া শিকারী নগেনের মনে যেন সন্দেহ উঁকি দিল। সে লাঠিটা হাতের কাছে রাখলো। নগেন থোপার দিকে একটু নজর দিতেই বড়মিঞা পেছন থেকে নগেনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লাঠি হাতে নগেন তবু প্রবল ভাবে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো আর একটা কথা মুখ থেকে বেরুলো বা-চা-ও বা-চা-ও। খোকন আর তপন শব্দ শুনে লাঠি হাতে ছুটে এল। জোরে জোরে হাঁক মারলো।
— বাঁচাও বিপদ হুয়েছে, বাঁচাও।
বড়মিঞা নগেনকে নিয়ে কিছু দূর যেতেই খোকন মোটা লাঠি ছুঁড়ে মারল জন্তুটার গায়ে। তপন আতঙ্কে লাঠির বাড়ি মারল বড়মিঞার গায়ে। ওদের চীৎকারে মাছমারা কয় জন এসে গেল জঙ্গলে। এত হৈ চৈ হামলায় মিঞা নগেনকে ফেলে পালালো। খোকন ছুটে বাবার কাছে যেতেই বাবার গোঙানির শব্দ শুনতে পায়।
ঘাড়ে ধারালো দাঁতের দাগ, অবিরাম রক্ত ঝরে নোনামাটি লালে লাল হয়ে গেল।
— আমাগো আজ কী সর্ব্বোনাশ হুলো, ওগো শুনছো কথা বল, আমার কী বিপদ হুলো মা বনবিবি, বাবা শাজঙ্গুলি, আমার স্বামীকে বাঁচাও। খোকন, তপন, তোর বাবার নে নৌকোয় চল মা বনবিবি, আমারে বাঁচাও-বাঁচাও...
নগেনের শরীর বুকে নিয়ে নমিতা নোনা চরে মাথা ঠুকতে থাকে। স্বামী হারানো বেদনায় তীব্র যন্ত্রণায় কেঁদে কেঁদে উঠছে।
আকাশে রোদের তেজ বাড়ছে। নৌকোর গুড়োর পাটাতনের উপর শোয়ানো হল নগেনকে, মিঞার আঁচড়ে কামড়ে মুখ এমন বিকৃত হয়েছে যেন চেনা যাচ্ছে না। ঘাড়ের রক্ত বন্ধ করার জন্য ক্ষতস্থানে চিনির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। বাদাবনে এটাই প্রাথমিক চিকিৎসা। যে জায়গায় নগেনকে বড়মিঞা ধরেছিল সেখানে লাঠিতে লাল কাপড়ের টুকরো বাঁধা হয়েছে। ওই জায়গা থেকে যাতে কাঠুরেরা সাবধান হয় তার জন্য এই ব্যবস্থা। তাছাড়া মারা গেলে নগেনের ইনিসওরেন্সের জন্য বনকর সাহেবের তদন্তে ওখানে চিহ্ন রাখা জরুরী। এবার নগেনকে মাছ মারা ভটভুটি নৌকোয় তোলা হয়েছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রবল ভাঁটার টানে নোনা গাঙের জল সাগর মুখে ছুটে চলেছে। দলিত দুঃখী মানুষের কান্নায় মাথার ওঠা গনগনে সূর্যটা তবু নির্লজ্জের মত রোদের তেজ বাড়াচ্ছে, ভেঙে চৌচির হচ্ছে না। হাড়হাভাতে বেদনায় জল, জঙ্গল, প্রকৃতির কোন চাঞ্চল্য চোখে পড়ছে না।

লেখক : সুন্দরবন বিষয়ক সাহিত্য ধারার এক উল্লেখযোগ্য গল্পকার।