পুরুলিয়ার বিহাগীত - শিবশঙ্কর সিং

    দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত রাঢ়ের অন্তর্গত পুরুলিয়ার লোকায়ত বৃত্তে প্রচলিত বৈচিত্র্যময় লোকগানের মধ্যে বিহারগীত অন্যতম। একটু অন্যভাবে বলা যায়, পুরুলিয়ার লোক সংগীতের বিশাল সমৃদ্ধ ভাণ্ডারের মধ্যে একটি বিভাগ বিহাগীত। বিবাহের নানান লৌকিক আচার অনুষ্ঠানে অনুষঙ্গে এই বিহাগীতের সৃষ্টি, প্রচার-প্রসার ও প্রচলন। পুরুলিয়ার সাঁওতাল-মুন্ডা-ভূমিজ, বিরহড়, কুঁড়মি-খাসি-হাড়ি-মুদি-যুগী-কোড়া-মুচি-ডোম-কামার-কুমার-কুলহু-নাপিত-করমালী-মাল-মাহালী-শবর-খেড়িয়া-বেদিয়া-রাজোয়াড়, পাহাড়িয়া-চিক-বড়াইক সহ অসংখ্য জনগোষ্ঠীর বিবাহের মরশুমে বিবাহের দিন কয়েক আগে থেকে বিহাগীত গাইবার চল লক্ষিত হয়। প্রকৃত বিচারে পুরুলিয়ার বিহাগীত ব্যবহারিক সঙ্গীতের (Functional Song) সর্বোত্তম নিদর্শন। এখানকার গ্রামীন মহিলারা গানগুলি কণ্ঠস্থ করে তাতে মেয়েলী সুর মিশিয়ে এগুলি গেয়ে থাকেন।
    পুরুলিয়ার বিহাগীত এখানকার লোকায়ত নারী সমাজের নিজস্ব সম্পদ। এখানকার বিবাহের লৌকিক আচারে মহিলাদেরই প্রাধান্য। কথায় আছে — ‘‘বিহা ঘরে মায়া রাজা’’। বিবাহের সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি স্ত্রী-আচারই বিষয়ানুরূপ সঙ্গীতের মুর্ছনায় সম্পন্ন হয়। গৃহস্থের মা-মাসি-পিসি-কাকি-জ্যেঠি-দিদি-বোন-ঠাকুমা-দিদিমারাই এই সমস্ত গীতকে সৃজন করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিশেষে গান রচনার তাগিদও থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গীতগুলি লেখা হয় না। মহিলারা মনে মনে পরিস্থিতি ও চরিত্রকে মাথায় রেখে গানগুলিকে কল্পনা করে তাৎক্ষণিক রূপ দেন। গীতগুলির কোন লিখিত রূপ না থাকায় এভাবে এগুলি চর্চিত হতে হতে লোক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মের মধ্যে। স্বাভাবিক নিয়মে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে গীতগুলিতে কিছু কিছু ভাষা ও উচ্চারণগত পার্থক্য গোচরে আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় মহিলারা নিজেদের কথ্য ভাষাতেই (মানভূমি বাংলা) এগুলি রচনা করেন ও গেয়ে থাকেন।
    মহিলারা বিবাহের বিশেষ মুহূর্তে কখনও এককভাবে, কখনও সমবেতভাবে গানগুলি পরিবেশন করে। বিহাগীতে কোন বাজ-বাজনার ব্যবহার থাকে না। কিছু কিছু স্থানে দেখেছি, সারা রাত্রি জুড়ে আগত আত্মীয় কুটুম্বদের মনোরঞ্জনের খাতিরে মাইক্রোফোন সহযোগে বিহাগীত গাইতে। পুরুলিয়ার প্রান্তিক সমাজে এভাবে মহিলাদের কণ্ঠে-কণ্ঠে পরিক্রমা করে আবহমান ধারায় চলে আসছে এইসব গীত।
    পুরুলিয়ার প্রচলিত বিহাগীতগুলির রচনাকার কারা তা যেমন আমাদের অজানা — তেমনি ঠিক কবে থেকে এগুলির চল এতৎ অঞ্চলে ঘটেছিল, তাও আমাদের কাছে অনুমানসাপেক্ষ। অনুমিত হয়, অনার্য সূত্রে লৌকিক পরম্পরায় এগুলির প্রচলন ঘটেছিল সুদূর অতীতের কোন এক সময়ে। যতদূর জানা যায়, প্রাক মুসলিম যুগ পর্যন্ত ভারতীয় সমাজ জীবনে বিবাহ উপলক্ষ্যে নৃত্য-গীতের প্রচলন বিভিন্ন কৌমের মধ্যে চালু ছিল। পরবর্তী কালে হিন্দু সমাজে দু-একটি কৌম ছাড়া বৃহত্তর হিন্দু সমাজ থেকে এর বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমানে শুধুমাত্র গ্রামীন অন্ত্যেজ জনগোষ্ঠী ও জনজাতিদের মধ্যে বিহাগীতের প্রচলন সীমিত রয়েছে।
    পুরুলিয়ার বিহাগীত মৌখিক সাহিত্যের (Oral Literature) নমুনা বিশেষ। এর বেশীর ভাগটাই লিপিবদ্ধ হয়ে উঠেনি আজও। এখনও এগুলি এখানকার মহিলাদের মুখে মুখে ঘুরে। তাঁরাই এই সমস্ত গানগুলিকে সযত্নে লালন করে লোক সাহিত্যের মূল্যবান এই সম্পদটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁদের হৃদয়ের যন্ত্রণা, আর্তি, বেদনা ও নানা আনন্দঘন মুহূর্তের প্রতি বীক্ষণে পুষ্ট গীতগুলি। গীতগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করলে সহজেই বোঝা যাবে আমাদের সমাজ সংস্কৃতির বহমান পরিচয়কে। সর্বোপরি, মহিলাদের মনের একান্ত সংগোপনে লুকিয়ে রাখা ছোট ছোট নানান কোলাজের হদিশ মেলে গীতগুলির মধ্যে।
    পুরুলিয়ার বিহাগীতের তাৎপর্যময় উপস্থিতিতে বিবাহের লোকাচারগুলি — জলসোওয়া, গায়ে হলদা, বর/কইনা সাজা, বিহা সম্প্রদান, কইনা বিদায় — সমস্তটাই যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। লোকাচারগুলির বিষয়গত বৈশিষ্ট্য অনুসারে আছে নির্দিষ্ট গীত। সময়ানুসারে সেগুলি গাওয়া হয়। সব মিলিয়ে এখানকার খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, কৃষিজীবী মানুষের সহজ-সরল অনাড়ম্বর বিবাহে বিহাগীতের প্রভাবে বিবাহ আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠে, অনাবিল প্রাণের অকৃত্রিম আনন্দ হিল্লোলে।
১।    রং    বিধিরো বিধানের কূলে অলংকারা নারীগো।
        বিটি জনম শুনামাত্র, বাবার মুখ ভারি গো।। (২)
    ১।    মা জননী আদরিনী যাদুমনি চপলা।
        মা বলে আইলো ঘরে, আইলো গো ফুলের মালা।
    ২।    কত আদর ভালোবাসা মায়েরো অন্তরে গো। (২)
        বাবারো অন্তর কাঁদে, পণ-টাকার তরে গো।
    ৩।    সাধের মুনু খেলা করে, হাতে পুতুল নিয়ে গো।
        খেলা করে কুলিট্যাড়ের সকল সঙ্গী নিয়ে গো।
    ৪।    কেউ বা খেলে পুতুল নিয়ে, সাজে মা জননী গো।
            কেউ বা খেলে পুতুল খেলা, কেউ ঘরঘরণী গো।
২।    রং    সভাতে বসিল কুটুম সভার সাজন কই।
        চমক ডালাই দেখি কুটুম, না চেঁকা দই।। (২)
    ১।    কি কি সাজন সাজাই ছিলে বরঘরে বসে।
        পেটটা ধুয়ে ধুয়ে কুটুম, শুধাই আইলো খাতে।
    ২।    বরের ভায়ের হাতে ঘড়ি দেখতে জানে না।
        চোখে চশমা, তবু চলে যেমন রাতকানা।
    ৩।    দেখলি বরাতি তোদের পেঁদলা মাতালি।
        মাইয়া লোককে দেখে বরাত রে, পেঁদেই হলিস ঠেলাঠেলি।
    ৪।    সত্য মাতাল হলে তোরা পড়ে থাকতিস ভূঁয়ে।
        ভূতের মতন নাচ নাচলি রে বরাত, দেখলি আমরা যায়ে।
    ৫।    চলিস না ফুটানি করে মায়া লোককে দেখে।
        বিহাঘরে মায়া রাজারে কুটুম, বলে সকল লোকে।
    ৬।    বরের বাবার কত দম, দেখলি কুলহিয়ে।
        ফেট ফেটি বাজনা আলো, ঝংড়ো গাড়িয়ে।
    ৭।    শুনছি কানে বাজে বাজনা ঢেং ঢেং ঢেং ঢেং।
        বরটা যেমন বসে আছে, ঠিকেই টুরি ব্যাঁঙ।
    ৮।    ডুংরিকা ধারে ধারে
            কে সিটি মারে গো।
        লাল টুপি বালা তো
            সাঙ্ঘাত সিটি মারে গো।
    ৯।    থাল দিলি, বাটি দিলি
        আরও দিলি বিটি গো
        সড়প ধারে গাল দিস্ না
        বড় সাধের বিটি গো।
    ১০।    থাক গো কনহার মা
            কুলহা ঢাকা দিয়ে
        তর বিটি নিয়ে যাছি
            পেপটি বাজায়ে।
    ১১।    গাড়হা ডড়হার মাছ কাঁকড়া
            গাছের পাড়া তেঁতুল গো
        সেই সকল মনে করে গো বাছা
            কাঁইদছে তোর মাই গো।
    ১২।    চা আছে গ্লাসে
        বাবুর বন্ধু আছে গ্রামে
        শুন বাবুর বন্ধুরা
        চায়ের বদনাম দিও না।
    ১৩।    খাটে বসো না কুটুম্ব
            ভুঁইয়ে বসো গো
        গুলি-সূতার খাট বুনেছি
            ধূলা দিও না।
        হাত ধুয়ো না কুটুম্ব
            পা-ও ধুয়ো না
        নামহ-দড়ির জল আনছি কুটুম
            লসকান করো না।
    ১৪।    ই - ঘর খুঁজি, উ - ঘর খুঁজি
            পায় না আমার সঙ্গীকে।
        কইন দিকের লইক আইসে
            নিয়ে গেলে হামার সঙ্গীকে।
    ১৫।    বিটি বিটি বল না মা
            বিটি নাই তো ঘরে
        দক্ষিণ দিকের কপাট খুলে
            বিটি গেইল চলে।
    ১৬।    মা কাঁন্দে আদাড়ে-বাদাড়ে
        বাবা কাঁন্দে দশের মজলিসে।
        আরো পিঠের ভাই কাঁন্দে ফুলচাঁদের ইস্কুলে
        দিদি, দাদু, মাসি-পিসি কাঁন্দে ছাঁচাতলে বসে।
    ১৭।    তেল হলুদ মাখাও রাজাকে অতি যতনে, রাজাকে অতি যতনে...
        এমন সাজন সাজাও রাজাকে কৃষ্ণ মিলনে।
    ১৮।    চৈত বৈশাখের মাসে রাজা কিছু ফুল তো ফুটে না
        আকন ফুলের মালা দিব রাজা মনে দুঃখ কর না।। (২)
        আকন ফুলের মালা রাজা করে হালা হালা 
        বৈহনয়কে বল রাজা দিবেক আলা ফুলের মালা গো,
        রাস্তা বড় দূর রাজা, বালি বড় তাতা
        বৈহনয়কে বল রাজা দিবেক পায়ে জুতা...
        বৈহনয়কে বল রাজা দিবেক মমের ছাতা গো (২)।।
    ১৯।    বাড়ির নামই নারকেল গাছটি ডাল মেলেছে
        দেরে কুমারের ভাই কলস গড়ে দে,
        মাটির কলস লিব না সোনার গড়ে দে
        আমাদের শিশু রাজার বিহা দিব কলস গড়ে দে।।
    ২০।    এই দলমার পাহাড়ে, এই দলমার পাহাড়ে
        রাজার মাগো, কাছে কাট ঝাঁটি গো
            কন্যার বাবার ঘর ভেঙেছে, খঁজায় দে গো দু’টি
    ২১।    বিটি বিটি বল না মাগো, বিটি নাই তর ঘরে গো
        দখিন দিগের কপাট খুল্যে বিটি গেছে চল্যে গো।।
    ২২।    মুনুকে যে মানুষ করলি যেমন ঘি-এর কলসি
            আজ মুনুকে বিকে দিল যেমন দহের মাছুলি।।
    ২৩।    মুনু মুনু হাঁকায় বুলি, মুনু নাই আজ ঘরে গো
            আজ কেনহে কাঁদছ মাগো, ঘরের ছ্যাঁচা ধরে গো।।
    ২৪।    সাজহ সাজহ মাইগো ফুলাকেরী সাজিয়ে
        কিসে হামে সাজব আদানুরে ফুলা কেরিকে সাজিয়া।
        বাবা তহর ভুঁয়ে জিতহ চপহর রাতিয়া
        মামু তহর ভুঁয়ে জিতহ চপহর রাতিয়া।
        মামুকে দেবও মামি হাঁসা রাজা খোড়য়া
        বাবাকে দেবও মাই সোনামুঠি ছুরিয়া।।
        ঘোড়য়া দোওড়ায়ে মামু জিতয় বরিতিয়া
        ছরিয়া ধরিয়া বাবা জিতয় বরিতিয়া
        অঞ্চলে গজ মতিয় শিশিরে ভিজয় ধতিয়া
            সুরজে সুখয় ধতিয়া।
    ২৫।    আম গাছে ন যেই সূতা আম গাছকে সাজ্যেছে
            সোভাগিনী সদর মাসী আমলঅ খাতে বস্যেছে।
    ২৬।    এই পথে দেখ্যেছ যাতে শিশুরাজাকে
        যাতে আছে সনার যাঁতি হলুদ বরন গো।
        এই পথে দেখ্যেছ যাতে বরঅ বাবুকে গো        
            হাতে আছে কাঁকন বাঁধা চন্দনের ফঁটা গো।
    ২৭।    আনগো গিলাসের জল চিনব বরের কাকাকে
            কি কি সাজন সাজ্যেছে বেটার বিহাতে।
    ২৮।    পায়রার লাগ্যে ফ্যাঁস আড়্যোছি গো
            লাগ্যে গেল বরের সদর বাপ
            বরের বাপ বলে চিনতে লারি গো
            মাক্যেঁ দিলি খাঁড়িয়া ফাঙড়।
    ২৯।    একেই মাঝ্যাই জনম বাবা
            ভাইঅ বহিনও গো
            ভাইয়ের জন্যে ঘর বাড়ি
            আমার লগ্যে পরের ঘর গো।
    ৩০।    ই পিঁড়হাই ঔ পিঁড়হাই খেলি বাবা
            নানঅ আমকে বিকঅ গো
            আমি যে ছিলি বাবা
            মাঝ্যাঘরের সভা গো।
    ৩১।    ধ্বনিকে যে মানুষ করলি কাঁচা দুধের সরে গো
            এবের ধনি চলি থাবেক মা-বাপকে কাঁদায়ে গো।
    ৩২।    মহুল তলে মহুল খচে সবরলি
            ছিলে ধনি মায়ের ভারি...
            ছিলে ধনি বাপের ভারি গো।
    ৩৩।    শারি দিলি সায়া দিলি বাবা
            সকলেই সাধ পুরালি
            এক খড়িকা সিঁদুরের লাগ্যে বাবা
            পরের ঘরকে পাটালি।
    ৩৪।    তেঁতুল পাতে ধান ঘাটিলাম
            হেলকি হেলকি পড়ে ডাল
            ছামড়াতলে রাজকুমার জামাই গো
            ছামড়াতলে রাজকুমারী কন্যা গো
            হের‍্যে হের‍্যে প্রাণ গো জুড়ায়
            হের‍্যে হের‍্যে মন গো জুড়ায়।
    ৩৫।    কাকে মনে পড়ে ধনি, মাকে না বাবাকে
            আরঅ মনে পড়ে ধনি, খেলিবার সঈতিকে।
    ৩৬।    সেই যে ধনি বল্যে ছিলি সঙিছাড়া আমি হব না
            কু’লির মুড়ায় আস্যে বলে ধনি আমার আশা আর কর’ও না।
    ৩৭।    সঙি লে’গেছ ভালই করছ
            সঙি রাখবে যতনে
            আসছে বছর এমন দিনে
            সঙি লিব অজনে।
    ৩৮।    মারে বাপে মানুষ করল কর‍্যে কি সুন্দর গো
            আজ মুনু স্বামী পাঁয়ে হল হামদের পর গো।
    ৩৯।    শ্বশুর শাশুড়ি পাইল, পাইল আপন ঘর গো
            নিজের আপন স্বামী পাইল, আর পাইল ছোট দেয়র গো।
    ৪০।    হেন গুরুচরণ জন, হয় যখন ঠহর গো
            হুঁদকে হুঁদকে উটে, মনে চোইখে পড়ে লর গো।
    ৪১।    মা কাঁদে, বাবা কাঁদে, কাঁদে পিটের ভাই গো
            খেলবার সঙ্গী কাঁদে ধুলায়ে লুটায়ে গো।
    ৪২।    নুনুকে যে পুষেছিলি কাঁচা দুধের সরে গো
            আজ নুনু চলে যাবেক মা বাপকে কাঁদায়ে গো।
    ৪৩।    বনে ফুটল ধাদকি, বন হল আলা গো
            মায়ের পক্ষে বিটি জনম, ঘর হল সুধা গো।
    ৪৪।    নাক চেপটা বহুটার মুহে হলুদ বাঁটা
            কে দেখেছিলি বহুটাকে ধুরুক ধুসা চেঠা।
    ৪৫।    লেটা খাড়ার ইস কোঁটা, শনলা মুঢ়ার হাল
            বরের বাপের নাইরে গরু, বরের দাদায় টানে হাল।
    ৪৬।    হামদের বাবু ইস্কুলে যায় গো চড়ে বড় বাসে
            তোদের নুনু ইস্কুল যায় না, বোকা রইল শেষে।
    ৪৭।    হুরহুরা বাতাস দিছে কপিবাড়ির ভিতরে
            বিটির বাপ ঘুমায় আছে, মুচি ঘরের দুয়ারে।
    ৪৮।    হুরহুরা বাতাস দিচ্ছে কপিবাড়ির ভিতরে
            বরের বাপ ঘুমায় আছে, লেপ পালঙ্কের উপরে।
    ৪৯।    কন্যার বাপের পাগ-পাগড়ী
            দেখায় যেমন জড়া সিপাহী
            বরের বাপের পাগ পাগড়ী
            দেখায় যেমন কাঁড়া ব্যাপারী।
    ৫০।    দুয়ারের আঁজির গাছটা
            কালি কলমে সাজাব
            বরের বাপ মুখ্যু বটে গো
            লেখাপড়া শিখাব।
    ৫১।    ফুলকপি বাঁধাকপি
            শাগের বড় দর গো
            জোড়া-হিড়ার লোকগিলা
            এক নম্বর চোর গো।
    ৫২।    কনার মাই কনার মাই
            চুনের হল কারখানা
            জোড়া-হিড়ার লোকগিলা
            দিনেই হইল রাতকানা।
    ৫৩।    আম পাতা চিরি চিরি, মহুল পাতার পতরি।
            কই আইল মুনুর / বাবুর মাসি / মামী সুখাই গেল পতরি।
    ৫৪।    কত সাধের জনম বাবুর, কত সাধের বিহা গো
            পান খিলিটা দিঞে রাখো বাবু / মুনু জুড়াক মায়ের হিয়া গো।
    ৫৫।    ইচলি মাছের চড়চড়ানি, ডাঁড়কা মাছের লটনী
            কি মহিনী দিলি কনার মা, বরের বাপ আল আপনী।
    ৫৬।    বেহাই আলে খুকড়ি মারবো হে,
            ঐ বেহাইকে খাওয়াঞ দাওয়াঞ, ছামড়াতলে নাচাব।
    ৫৭।    চাঁড়ে ছামড়া বাঁধ বহনই, চাড়ে খাইতে দিব
            কাটেছি পুয়ালের ঘানিরে বহনই সেটাই খাতে দিব।
    ৫৮।    পস্তুগাছে চটি বসেছে গো
            ঐ চটিকে মারো না ভাই, মধু খাতে বসেছে।
    ৫৯।    আগে কাঁদে মাসি পিসি, পরে কাঁদে পরগো
            পদ্মপাতে লেখা আছে, যাবি শ্বশুরঘর গো।
    ৬০।    তখে যে লো দেখেছিলি ছাগল বাগালি
            ছাগল তাগল বিকে দিয়ে লো, বহু কনা সাজে আলি।
    ৬১।    কই আনলি লো বহু, বাথাম বহা বাটি
            জনম জনম খঁট দিব লো বহু, তর ননদ বঠি।
    ৬২।    বনে বনে আলি বহু কই আনলি পাত
            হামদের দেশে পাত নাই লো, কিসে খাবি ভাত।
    ৬৩।    এত এত বৈরাত গেল, দুঁয়াল কুড়ে ডেরা গো
            তর যদি ভাই থাকত লো বহু, ঘরে দিত ডেরা গো।
    ৬৪।    খুকড়ি ফদফদালো
            নবরাত্রি পহালো
            উট কন্যা, চল আপন দেশ।
    ৬৫।    ইধারে যাতে দেখেছো
            হামদের শিশু ছ্যেলাকে
            হাতে আছে সোনার যাতি গো
            মুখে লুলু পান চিবাছে।
    ৬৬।    মেঘ উনালো চাকা চাকা
            জলের বুন্দা পড়ে না
            কি আকালে ঘর জুড়লি বাবা
            টাকা দিলে চাল মিলে না।
    ৬৭।    সাত জোড়া জুতা আজা রাস্তাতে খিয়ালী
            বিহার ডালি মাথায় নিয়ে গো ছুচা মুহে ঘুরে আলি।।
    ৬৮।    রেল চলে অলে গলে, মটর চলে তেলে গো
            বেটার বাপে বিহা করে, বিটির বাপে বলে গো।।
    ৬৯।    আজ হামাদের ছোট নুনুর বিহা গো
            আয় গো যদি লাচবি যদি
            লাচবো থিয়া থিয়া লো।।
    ৭০।    বর আইল, বরাত আইল, বরের বাবা কই আইল
            বরের বাপের ফরকা ধুতি ছামড়া খুটায় বাঁধালো।।
    ৭১।    কন্যার বাবা গরু বিকে, ছাগল বিকে কালি মাটির হাটে গো
            বরের বাবা বেটা বিকে জাতি সমাজের মাঝে গো।
    ৭২।    সাক্ষী থাক বটবৃক্ষ, সাক্ষী থাক সরজু নদী,
            আমি সীতা সতী নারী, বালি পিন্ড শ্বশুরকে দিলি।
শেষ কথা —
    অতি দ্রুত নগরায়ন গ্রাস করছে গ্রামীন সংস্কৃতিকে। ভোগবাদী চিন্তা-চেতনার আগ্রাসনে লোক-সংস্কৃতির বিপন্ন দশা দেখলে সত্যি আঁতকে উঠতে হয়। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, শিক্ষার প্রসার ও বৈষয়িক উন্নতির সাথে সাথে মুছে যেতে বসেছে গ্রামীন মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্যবোধ ও শিল্প সৃষ্টির সহজাত অনুভূতিগুলি। আজ থেকে দু-তিন দশক আগেও গ্রামীন বিবাহ ঘরে বিহাগীতে যে-ভাবে মুখরিত থাকতো; আজকের দিনে বিহাগীতের সুর সেভাবে শোনা যাচ্ছে না। আক্ষেপের বিষয়, আজকের পড়াশোনা জানা কিশোরীরা প্রচলিত বিহাগীতে সেভাবে আগ্রহী নয়। মোবাইল, সিডি, টেপরেকর্ডার, চিপসের দৌলতে সকলেই এখন হিন্দি গানের সুরেই বেশী স্বচ্ছন্দ। উঠতি কিশোরী ও যুবতীরা বিহাগীত থেকে এক প্রকার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বললেই চলে। দু-চার কলি বিহাগীতি গাওয়া তো দূরের কথা, বিহাগীতের প্রসঙ্গ তুলতেই তারা যেন লজ্জা বোধ করে। সব মিলিয়ে আশঙ্কার কারণ হল গিয়ে বিহাগীতের প্রতি গ্রামীন মহিলাদের আকর্ষণ হারানো এই লোক বিনোদনটিকে একেবারে বিলুপ্তির প্রান্ত সীমায় দাঁড় করিয়েছে। ভেরিয়ার এলুইন-এর ‘অ্যাবরিজিনালস’-এ আশঙ্কা আজকের দিনে সত্য মনে হয় — 
    ‘‘ক্রমশ আধুনিক পদ্ধতি এবং চিন্তা ভাবনা এক্ষেত্রে ভারতের মানুষকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে, .... ভারতীয় সংস্কৃতির একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় ইতিহাস থেকে মুছে যাবে, যদি না এ সবের সংরক্ষণের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়; যদি না কলম ও ক্যামেরার মাধ্যমে এগুলিকে ধরে রাখা যায়।’’
যাদের কাছ থেকে গানগুলি সংগ্রহ করেছি —
১।    ঈশ্বর পরামানিক, বেড়াডি, বলরামপুর।
২।    সুকুমার পরামানিক, খেকরেডি, বলরামপুর।
৩।    ঋতুপর্ণা রুহিদাস, বাঁশগড়, বলরামপুর।
৪।    রসরাজ নায়েক, ঘাটবেড়া-কেরোয়া, বলরামপুর।
৫।    শকুন্তলা লহরা, সুইসা, বাগমুন্ডি।
৬।    কিরীটি মাহাত, পাড়া, পুরুলিয়া।
৭।    সৃষ্টিধর মাহাত, পুঞ্চা, পুরুলিয়া।
৮।    গান্ধীরাম মাহাত, বলরামপুর, পুরুলিয়া।
৯।    আদিত্য প্রসাদ কার্জী, মুকরুব, বাগমুন্ডি
১০।    ভীমসেন কুম্ভকার, বলরামপুর, পুরুলিয়া।
  


লেখক : বিরহর ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক এবং বিশিষ্ট লেখক