দক্ষিণবঙ্গ তথা সমগ্র সুন্দরবন এলাকার লোকভাষা ও লোকসংস্কৃতি - নিতাই মৃধা

    সারা দেশ বাদ দিলেও সারা বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির পাশে দাঁড়িয়ে দক্ষিণবঙ্গেরই সারা সুন্দরবনের সংস্কৃতির সংক্ষিপ্ত সার এক কথায় সংক্ষেপে নথীবদ্ধ করার প্রয়াস করা আজকের মত দিনে বেশ কিছুটা জটিল এবং কঠিনও বটে। তবুও বলা যায় যারা সংস্কৃতি সত্তার সন্ধান রাখেন এবং সংস্কৃতিকে জীবনের চালিকাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানান, এবং সাথে নিয়ে চলতে ভালবাসেন, তাঁদের কাছে কিছুটা হলেও সহজ ও সরল রূপে উঠে আসে এই এলাকার জন জীবন এবং তার সত্তা সংস্কৃতির প্রায় পুরোটাই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সংস্কৃতি লোকাচারের সাথে এখানের সংস্কৃতি লোকাচার ও তার গতিধারা কিছুটা আলাদাই ছিল, এবং এখনো তার নানা নিদর্শন সুন্দরী এই সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে বিছিয়ে আছে অবহেলায়, অনাদরে, কোথাও বা অজানতেও। প্রাক্ স্বাধীন ভারতে এর সীমা যে কতটা বিশাল ছিলো তা সহজেই অনুমান করা গেলেও স্বাধীন ভারতের ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে দেখাতে গেলে বর্তমানের সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পশ্চিমে নামখানার ফ্রেজারগঞ্জ হতে পূর্বের বিদেশ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা হিঙ্গলগঞ্জ। আর নামখানারই সামান্য উত্তর-পশ্চিমে অবস্থান করা সাগরের মুড়িগঙ্গা হতে উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বনগাঁ। জ্যামিতিক রেখায় যা বিষমবাহু ত্রিভুজ-এর আকার নেবে, এই এলাকাটির অতীত হতে বর্তমান নানা ধারার ইঙ্গিত বহন করলেও শেষ অংশের ধারায় ধরা পড়বে একটি অতি সরল সত্য, তা হল সরলতা। এখানে বসবাস গড়ে ওঠার প্রথম হতেই জীবনও জীবিকা দুটির ক্ষেত্রই এত কঠিন ও কঠোর ছিলো যে তাকে সামাল দিতে গিয়ে প্রথম হতেই প্রতিটি জনগোষ্ঠী এবং বেশ পরে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক জনসমাজ সবগুলি পরস্পরের সাথে ভাবের, জীবনযাপনের, ভাষার এমন কি সংস্কৃতিরও কম বেশি আদান প্রদান ও একে অন্যের বশ্যতা সবগুলিই এখানে ঘটেছে তার প্রমাণ ও প্রভাব যৎসামান্য হলেও রয়ে গিয়েছে এবং আছে। যা বহু ক্ষেত্রের সংস্কৃতির ইতিহাসে থাকে এখানেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। তবে এটাও ঠিক যে এই সমস্ত তথ্যের উপযুক্ত তত্ত্ব কিন্তু হাতের কাছে হাতিয়ার হিসাবে নেই, যা আছে তা একমাত্র লোক মুখে লোক স্মৃতিতেই। এবং আজকের মতো চরম আধুনিকতার চড়া পথে পড়ে ক্রমান্বয়ে নিজেই তা নিঃশষিত হতে বসেছে। যাক্ সে কথা। আসতে চাই ৬০-এর দশকের পর হতে, কেন ? কারণ সারা দেশের জনজীবনের চাহিদা (?) মতই বলা যায়, কিংবা জনগণের জীবনে চাহিদা কৃত্রিম বা বিশেষ উপায়ে বাড়াবার কৌশল নিয়েই হোক, বা আরো কোন গভীরতর কারণেই হোক, মানুষের হৃদয়বৃত্তির মূল অনুকম্পা অনুসরণ করার পথ হতে সরে এসে কোন না কোন কিছুর মাধ্যমে তেজ, শৌর্য, বীরত্ব ইত্যাদির প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দিতে গিয়ে সামগ্রিক ও সার্বিক মঙ্গল এই সর্বজনীনতা তথা বিশ্বজনীনতা হতে বেশ দূরে জনজীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বা দূরদর্শিতা কিছুটা ঘুরপথে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা যা শুরু হল এখনও তা থামেনি, সুন্দরবনের জন্যেও তা একই রকম ভাবে বহাল আছে। যার কারণে প্রায় দু’ধরনের বিভাজন রেখা আমরা এই এলাকায় খুঁজে পাই। সেই দু’পথে এগিয়ে যাওয়া তার-ই পরিণামেই কী কী পরিণতি হয়েছে তারই এক একটি টুকরো টুকরো নমুনা হল এই রূপের —  
(১)    দিয়া যে বারেলা ভাকুচুরে ভুকুচু মানয়াকের সাড়া নেহি মিলেরে এএ
    ও ওহিরে — মানোয়াকের সাড়া নাহি — এএএ! (সহরাই গীত)।
(২)     ঝিঞগা ফুল ফুইট গেলাক ফুটিয়া আধারাইত 
    শালুক ফুলে এ গৈয়া
    গেলাক বারাশাইত... (২)। করম গীত
    জনবহুল সুন্দরবন জন্ম নেবার বেশ আগেই যে জনজাতির জনসমাজ বিক্ষিপ্ত ভাবে দু এক স্থানে দু-এক ঘর একত্রে প্রায় সহায় সম্বল ছাড়াই অসহায় জল জঙ্গল গভীর অরণ্যের কিনারায় কিনারায় অস্থায়ী বা কিছুটা স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে শুরু করলো তাদেরই মিলিত যৌথ সঙ্গীত ও প্রায় অকৃত্রিম অতি সাধারণ বাদ্যযন্ত্র ঢোল, মাদল, বাঁশের বাঁশী ইত্যাদি যা একাধিকই হতো সঙ্গে কায়িক পরিশ্রমকে লাঘব করার জন্য নানা গাছগাছালির সংমিশ্রণে গৃহের তৈরী পচাই বা সাদা কথায় পচানি মদ, যা অতি সামান্যই ব্যবহার করে সরল সহজ এই সঙ্গীতের লয়ে লয়ে উচ্চ উল্লাস সহকারে রাত পার করা ! যার মাধ্যমে বাঘ, বন্য শুকর, হায়না, কুমির, হাঙ্গর প্রভৃতিকে বসবাসের চারি সীমার মধ্যে ঘেঁসতে না দিয়ে নিজে, পরিবারের বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, শিশু, কিশোর, অসুস্থ নারী এছাড়াও গৃহে পালন করা পশুপাখী প্রভৃতিকে রক্ষা করাটাই ছিল এর প্রকৃত কারণ। এই কারণেই এই অঞ্চলের লোকসঙ্গীত তথা সঙ্গীতের পাক মূর্ছনা কিন্তু জনজাতির গীত। ঋতু অনুযায়ী পরব, আবার পরব অনুসারে তার কারণ যেমন শরতের শেষ লগ্নে সহরায়। হেমন্তের শেষ লগ্নে নাঁওয়াখানি, নতুন ধান ঘরে উঠলে তাকে পূর্ব পুরুষের জন্য উৎসর্গ না করে তবে খাওয়া নিষিদ্ধ, তাকে কেন্দ্র করে পরব। এরপর শীতের শেষ ও বসন্তের শুরুর মাঝে ফাগুয়া পরব, গ্রীষ্মের মাঝামাঝিতে শাহুরুল পরব, বর্ষার মাঝামাঝিতে করম পরব, যার সব কিছুতেই সঙ্গীতের আবহ। এ ছাড়াও বিবাহ, নবজন্ম, মঙ্গল কামনাকারী পূজা ভেলোয়াফারা পরব এসব তো এখনও আছে।
    পরের পর্বে আসা যাক্, বনে বাস করার মধ্যেই বানুয়া জনসমাজের প্রাণপাতের মাধ্যমে গভীর জঙ্গল হাসিল করা এবং তাকে নদী ও সমুদ্রের জলচ্ছ্বাস হতে রক্ষার জন্য জঙ্গলেরই মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হল। এর জন্য দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবার পর জমিদারের হাত বদল, নায়েব গোমস্তা পেয়াদা বদল হতে হতে তাঁদের বসবাস ও অবধারিত ভাবে এসে উপস্থিত হল। তার সাথে সাথে বৃহত্তর জনসমাজের সংস্কার সংস্কৃতি লোক সাহিত্য কাব্য ইত্যাদি হাজির হতে শুরু করলো। যার পরিণামে এসে উপস্থিত মনসা মঙ্গল, শীতলা মঙ্গল, বনবিবি, পরে হাজির হল নিমাই সন্ন্যাস, কীর্তন হতে হরিনাম যা আজও বহমান। এরই একটি নমুনা হল 
(৩)    শীতলাঃ—    যাই যাই জোরা যাই রে চলে
        ডাকিস নে আর মা মা বলে
            যাই যাই জোরা যাইরে চলে! .... (২)
    জোরা —    মা আ আ আ আ মাগোও ও! (শীতলা মঙ্গল)
    মধ্য রাত্রি হতেও তখনো কিছুটা সময় বাকি; চারি ধারে অন্ধকার! দুটি বা চারটি কখনো তিনটিই কেরোসিনের হ্যেঁচাক জ্বলা আলো ছাড়া আসরে তখন আর অন্য কোনো জ্যোতির চিহ্ন পাওয়া বাতুলতা ছিল মাত্র। যা কোনো লাউড স্পিকার বা শব্দ দানবের কণ্ঠস্বর কমাবার- বাড়াবার কোনো যন্ত্র সেদিনও এই এলাকার মানুষজনদের দেখতে পাওয়ার স্বপ্ন দেখাটা এক প্রকার দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই ছিলো না।
    এরপর ৮০র দশকের গোড়া হতেই নতুন রূপে হাজির হতে লাগল কোম্পানীর যাত্রাপালা। যার প্রভাব নিয়ে বলার কত কি থাকতে পারে। প্রতিটি যাত্রার আসর যেন জনপ্লাবন ডেকে আনা শুরু করল। যার দাপটে হারিয়ে যেতে থাকলো গ্রামে গ্রামে সঙ্গীতের সাধক তৈরীর পাঠশালাগুলি। প্রাণ হারালো গুরুশিষ্যের সম্পর্কগুলি। কারণ হাজির হল যে গ্রামোফোন! কণ্ঠে গান শুনতে সামনাসামনি মানুষ দরকার আর হল না। বেতার সে তো উচ্চবৃত্তের বাড়ী ঠিকানা ছেড়ে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের বাড়ীতে পৌঁছাতে থাকলো। যা কিনা স্থায়ী এবং সৃজনশীল মানুষজনের চূড়ান্ত অভাব তৈরী করতে সক্ষম হল। এখন তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আরো শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলি। যাতের অপ্রতিরোধ্য প্রকৌশল এবং উপকরণাদি এই এলাকার সহনশীল প্রকৃতিও পরিবেশের প্রতিকূলে প্রবাহিত হয়ে জনজীবনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের বিন্যাসকে অতি ধীরে অথচ অনির্বায্যভাবে বির্পযস্থ করে চলেছে।
    এর দ্বারাই সহজে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কোনও শক্তিশালী বা সার্মথ্য যুক্ত সাংস্কৃতিক ধারা সুন্দরবনের বা দক্ষিণবঙ্গের জনসমাজের মধ্যে জ্ঞানলাভ করতে পারেনি।
    মনে পড়ে যায় ৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে আদিবাসী জনসমাজের পাড়ায় পাড়ায় টুসু দেবীর আরাধনা। একেবারে শীতকালের মাঝামাঝি পৌষ সংক্রান্তি এই সমাজের কাছে তা হিসাব মত নাওয়াকানি উৎসব। সেই উৎসবের ভরা আনন্দ যখন মাতোয়ারা করে দিত আমাদের প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি আদিবাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা গভীর শীতের সেদিন রাত্রিতে মশগুল হয়ে থাকত টুসু দেবীর সেই আবেগ ভরা উচ্চস্বরে গাওয়া সেই গান শোনার জন্য। ... বলি কার ঘরে মাদল বাজে / ডুডুম বাজনা বাজে। টুসুর ডালি, ঘটের মধ্যে আমপাতা, তার সাথে গোছাগোছ সুন্দর সাজানো পাকা ধানের উজ্জ্বল শীষ, মাটির সেই ঘটে সুন্দর আলপনা, ঘটের তলায় খড়ের তৈরী চিকন মসৃণ আলটা বসানো যার নীচে নতুন কুলো পাতা। পূজার পরদিন সেই কুলো মাথায় নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় সারি বদ্ধভাবে ঢোল, মাদল, করতাল, জুড়ি, কাঁশি, বাজিয়ে প্রতি ঘরে ঘরে প্রদক্ষিণ করা। অজস্র গীত অজস্র গান। টুসুদেবীর জীবনের নানা কাহিনী, কখনও করুণ কাহিনী সুরেল মূর্চ্ছনায় যখন ভরিয়ে দিত আসরের চারিপাশ আর সেই টুসুর ডালিকে কেন্দ্র করে মাঝ বয়সের মা-কাকিমা হতে দিদি-বৌদিদের সাথে তরুণী বোন ভাগ্নী সকলেই পরস্পরের কোমরে হাতে জড়িয়ে গান আর মাদলের বা ঢোলের বাজনার তালে তালে নৃত্যে মুখর করে তুলত তখন ভক্তিতে, শ্রদ্ধায়, কখনও আনন্দে চোখের জল কারোরই বাঁধ মানত না। আবেগে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ত সবাই। বৃহত্তর সমাজের সংক্রান্তি আর আদিবাসী সমাজের টুসুর আগমন পরস্পরকে পরিপূর্ণ করে দিত বাংলার দক্ষিণ অংশের এই এলাকাকে। তৎকালের সাংস্কৃতিক সীমানা জানা না থাকলেও অবিভক্ত ২৪ পরগণার বসিরহাট, বনগাঁ, বারাসাত, আলিপুর, ডায়মন্ডহারবার এতগুলি মহকুমা এলাকার মধ্যে বসবাসকারী সব আদিবাসী পাড়াতেই এই পরব পালন একটা রীতি হয়ে উঠেছিল। যার রেশ আজও আছে কোথাও কোথাও।
    এ প্রসঙ্গে আর একটি কাহিনী শুনিয়ে রাখতে চাই, তা হল আলিপুর মহকুমার আওতায় পড়া সাগর, নামখানা বাদে কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা, মথুরাপুর এই এলাকায় বসবাসকারী মুন্ডা সমাজের মধ্যে মুন্ডা ব্যবহারকারী জনসমাজ কিভাবে তাদের অভিব্যক্তিটাকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করতেন তার একটি নমুনা উল্লেখ করছি, ভূমিজ সংস্কৃতির আবহের গীত হল টুসু গীত ... বলি কার ঘরে মাদল বাজে / ডুডুম বাজনা বাজে — যা প্রায় ভাঙা বাংলার পাশাপাশিই। ঠিক সেই সুরটাকে ধরে রেখে মুন্ডারীতে গাওয়া হত, ... আলে মুন্ডা মারাংজাতি / মুন্ডা মারাং কাঠিন জাতি ...। যার বাংলাটি হল আমাদের মুন্ডা জাতি বড় জাতি / মুন্ডা জাতি মহা কঠিন জাতি....। আমার ঐ শিশু কিশোর জীবনের সেই সুখস্মৃতি জীবনের মধ্য গগনে পৌঁছে যে এত মধুর হবে কে জানত সেদিন!
    থাক সে কথা, যে কলাকুশলীদের অংশগ্রহণের মধ্যে সেদিনের ওই অনুষ্ঠানগুলি বছরের পর বছর এত আনন্দদায়ক হয়ে উঠত তাঁদের বেশীর ভাগ মানুষই আজ আর নেই। নামগুলি রয়ে গেছে। গিরিবালা, সরস্বতী, ভগী কামিনী, থপী, পুরুষদের মধ্যে কার্ত্তিক, নারান, এঁরা আজ আর নেই। এঁদের প্রায় প্রতিজনার সাথেই নিবন্ধকারের সামাজিক ও আত্মীক সম্পর্ক ছিল। এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতির নক্সাচিত্রটি একটু বাড়িয়ে রাখি। 
    সরস্বতী, সরস্বতী সর্দার (মুন্ডা) এই মহিলা শ্বশুর বাড়ির পরিচিতিতে এই এলাকার মানুষ, ফলে তাঁর বিবাহের পর তাকে এই এলাকার মানুষজন কাছে পেয়েছিল। কিন্তু এর আগের পরিচিতিটি অন্যত্রের। আর সেটি হল বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশ খালি থানা এলাকার একটি গ্রাম। যেখানের আবাল্য সাংস্কৃতিক ঘরানা তাকে বড় হতে ও সমাজ সংস্কৃতি জানতে ও বুঝতে শিখিয়েছিল। ফলে, যে সংস্কার সংস্কৃতি তিনি জীবিত অবস্থায় মেলে ধরতে ও সবার সামনে তুলে ধরতে পেরেছিলেন এবং সবার হৃদয় অন্তরকে মুগ্ধ করে দিয়েছিলেন তা কিন্তু অপর একটি জনপদের সংস্কৃতির চর্চার ফসল, সামাজিক ও বৈবাহিক সূত্রে তা বহন করে এই অঞ্চলে নিয়ে এসেছিলেন। ঠিক একই রকমভাবে কামিনী কাকীমা, তাঁর বেলাতেও একই ঘটনা। এমনি আরো অনেকের ক্ষেত্রে এঘটনা ঘটে চলেছে সর্বত্র।
    আসি সাঁতালী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চরিত্রে, সাগরদ্বীপ, নামখানা এলাকার বেশ কিছু কিছু এলাকায় এই জনসমাজ প্রথম হতেই বসবাস করে আসছে। সেই ৮০-এর দশকের গোড়ায় মৌসুমি দ্বীপের সাগরদ্বীপের রুদ্রনগর তৎসংলগ্ন এলাকার দলে দলে ছাত্রছাত্রী বন্ধুদের সাথে মিশে যাবার কারণে তাদের সঙ্গীতের চর্চা, ভাষার চর্চার দিকটির সম্পর্কে হাল্কা ধারণা পেতে বাধা হয় নি। নবকুমার (মৃত), পীতম্বর সোরেন, সোমবারী মূর্মূ, সাবিত্রী হেমব্রম লক্ষী মাঝি, মালতি মাঝি এদের কাছে যা পাওয়া তা ওই এলাকার সাংস্কৃতিক ধারার বহিঃপ্রকাশ ছিল। সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে আসার জন্য সাঁতালী সঙ্গীতে আহ্বান, লগন লগন তাড়ম পে / আদিবাসী তাড়ম পে...। এই আবেদনে সঙ্গীত গাওয়া আর মাদলের তাল বাঁশের বাঁশীর তীব্র তর সুরের মূর্ছনা। সাথে সারি সারি যুবক যুবতীর উচ্ছল নৃত্য মুর্হুতে আবেশে আড়ষ্ঠ করে তুলতে বিন্দুমাত্র সময় নিত না। আমাদের বাড়ীতে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আসতেন, মায়ের কাছে শোনা। বাবা এবং মা, জ্যাঠা, এঁরা সবাই কেদঁরা বাজিয়ে এমন সুরেলা সাঁতালী গান গাইতে পারতেন যা আমাদের সমাজ আজ সব হারা হয়ে বসে। পাথরপ্রতিমা কাকদ্বীপের কথাতো বলেইছি। মথুরাপুর আজ টুকরো হয়ে রায়দিঘি থানা হিসাবে গড়ে উঠেছে। এই এলাকার জনসমাজে মুন্ডা ও ওরাং, মনীনদীর পূর্বপারে আবার মুন্ডা ও ভূমিজ জনসমাজের বসবাস যাদের হাতের কঠিন পরশে ওই এলাকা আবাদ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে একদিন। তাদেরই সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ হল টুসু চর্চা। এরপর আসতে হয় কুলতলি, জয়নগর, মূলত মুন্ডা সমাজের আধিপত্ত। কম সংখ্যায় ভূমিজ জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। ফলে মুন্ডা জনসমাজ এখানে সাদরিতেই সমাজ জীবন পরিচালনা করে। তাই সহরাই, শারুল, করম সবটাই সাদরি ভাষায়। সংগীতে তাই সাদরি। সহরাই গীতে তাই পাওয়া — দিয়া যে ভাকাচুরে ভুকুচু /
                মানোয়া কের ঘারা কেতেই দুরারে /
                        ও ও ওহি রে / মানোয়া কের ঘারা কেতেই...। (২)
    পিসি, মাসি, মামী, কাকিমাদের কণ্ঠের এই গান হৃদয়ে ব্যথার আবেগকে উজাড় করে দিত, যা আজ আর নেই। কুলতলি, একবারে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ যাকে নিয়ত নাইয়ে চলেছে তার পুরো জনপদটাই বনবাদাড়ের মানুষের বাস আজও সবটাই সাদরির। পরেই আছে বাসন্তী থানা এলাকা যার সীমা উত্তর ২৪ পরগণার দক্ষিণ সীমা। এই এলাকাটিও সাদরির জনসমাজের। এখানে মুন্ডা জনজাতির পরেই আছে ওরাং জনসমাজ। সবটাই সাদরি সংস্কৃতির। বাসন্তী থানা এলাকার পূর্ব দক্ষিণ অংশটাই গোসাবা থানা, মুন্ডা জনসমাজের পরেই ভূমিজ জনসমাজের বসবাস। যাদের ভাষা বাংলা ও সাদরির মাঝামাঝি। কিছুটা ভাঙা বাংলারই মতো। রাঢ়বঙ্গে যাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়, এখানে তার প্রভাব খুব বেশি না থাকায় এই জনপদটি সাদরি ভাষার দখলেই। এই গোসাবার উত্তর-পূর্ব অংশটি সন্দেশখালি আর হিংগল গঞ্জ, দুটি থানার পুরোটাই সাদরি জনসমাজের আওতায়। বিশেষত জনজাতি জনসমাজের ক্ষেত্রে। মনসা মঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত সেই নদী — কালিনদী, যার পশ্চিম পারে হিংগল গঞ্জ, ২৪ পরগণা পঃ বঃ আর পূর্ব পারে খুলনা, বাংলাদেশ। এই সেই হিংগল গঞ্জ যার পূর্বসীমাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশের শেষ সীমানা সামসেননগর আদিবাসী পাড়াই যার শেষ পাড়া। যেখানে টুসু, সহরাই, করম, ভেলোয়া ফারা, বিহা, সাঠি, নারতা, নাওয়াখানি, বনবিবি পূজা, শীতলা পূজা ইত্যাদি উৎসবের জন্য মুখিয়ে থাকা আদিবাসী শ্রেণির মানুষ যারা সারা বছর নদী কালিন্দী আর বাড়ীর সীমায় সুন্দরবন এটাই যাদের জীবন ও জীবিকা।
    অতএব, শুরু করে ছিলাম সাগরের সীমানায় থাকা সাগর ব্লকের রুদ্রনগর সাঁতাল সমাজের কাহিনী দিয়ে, আর শেষ করতে চাইছি হিঙ্গলগঞ্জ থানার সামসেরগঞ্জ আদিবাসী মুন্ডাপাড়ার সংস্কৃতি দিয়ে। ইতিহাসের পরিণামে দেশ ভাগ হয়েছে ১৯৪৭ সালে। তার আগে ? দুই বাংলার মাতৃভাষার মতই এক সময় সংস্কৃতি আদিবাসী দলিত জনজাতির সংস্কৃতিও একই ছিল।
    যাক সে কথা। আমরা আছি আমাদের রাজ্যের দক্ষিণ অংশের লোকসংস্কৃতি রূপরেখা নিয়ে। আসুন তারি সহজ পাঠে আরো প্রবেশ করি। আলোচনার শুরুতে সাগর সীমা ধরে যে যে থানা ও তার এলাকা যেখানে যেখানে আদিবাসী জনসমাজ জনপদের শেষ অংশে বসবাস করেন তারই চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। এইবার দেখাতে চাই যে ওই এলাকার সংস্পর্শ ধরে যে এলাকাগুলি দেশের মূল ভূখণ্ডের দিকে এগিয়ে চলেছে তাদের সাথে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি কিভাবে মূল সংস্কৃতির সাথে জুড়ে রয়েছে তা। হিঙ্গলগঞ্জ, যার উত্তরে বসিরহাট থানা, তার উত্তরে হাসনাবাদ থানা, তারই উত্তর গায়ে লেগে আছে বাদুড়িয়া থানা, যাকে উত্তর অংশেই ছুঁয়ে আছে বনগাঁ, বাগদা, করিমপুর, এরপর নদীয়া জেলা। যে জেলা এই মুহূর্তে জনসংখ্যায় বাংলা ভাষার পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তর জনসংখ্যা সাদরি ভাষাভাষীর ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। এই নদীয়া জেলারই উত্তর সীমানায় গঙ্গার দুই ভাগ হয়ে যাবার কোনা থেকে জন্ম মুর্শিদাবাদ গঙ্গার পূর্ব পাড়ের শুরু। এখানেও সাদিরই জনজাতিদের মুখের ভাষা। জনজাতি আদিবাসী সমাজের সব উৎসব এখানেও সমান ভাবে পালিত হয়। এবার আসি গঙ্গা-পদ্মার ওই মোহনা হতে বঙ্গোপসাগরের মোহনা সাগরদ্বীপের পূর্ব দিকের অর্থাৎ মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা সাবেক কোলকাতার লাগোয়া এলাকা এই বিস্তৃর্ণ এলাকার জনপদে জনজাতি সমাজের ভাষা, লোকসংস্কৃতি, লোকাচার, সামাজিক প্রথা সব কিছুই একই ধারা, একই আঙ্গিকেরই।

লেখক : দক্ষিণবঙ্গ তথা সুন্দরবন চর্চার এক অগ্রগণ্য গবেষক।