শবরমাতা মহাশ্বেতা দেবী - প্রশান্ত রক্ষিত

    আমি ৩৩ বছর যাবৎ মহাশ্বেতাদেবীকে দিদি বলি। শবর জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তাঁকে ‘মা’ বলে। খুব কাছ থেকে তাঁর সাথে কাজ করার সুবাদে শিখেছি মানুষকে ভালোবাসতে এবং বিশ্বাস করতে। দিনের পর দিন তাঁর সঙ্গ পাওয়ায় জেনেছি বিহারের ডালটনগঞ্জ এলাকায় ক্রীতদাস প্রথা লোপ করার জন্য ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাহিনী।
    ১৯৮৩ সালে মহাশ্বেতা দেবী যখন গোপীবল্লভ সিংদেও-এর ডাকে শবর মেলায় যোগ দিতে পুরুলিয়া এলেন সেদিন আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল তাঁকে মেলায় নিয়ে আসার।
    শবর মেলার মঞ্চে জেলার নানা প্রান্ত থেকে আসা শবর-শবরীরা তাদের উপর পুলিশি অত্যাচার এবং বনবিভাগের উচ্ছেদ-এর কথা বললে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। মেলাতে প্রতিটি বক্তা তাঁকে ‘শবরমাতা’ বলে সম্বোধন করল। মহাশ্বেতা দেবী মঞ্চে উপবিষ্ট বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী লছু শবর ও কানুরাম শবরকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে তাঁর বক্তব্যে বললেন, কেমনভাবে ভারতের আদিবাসীদের ঠকানো ও শোষণ চলছে, দেশ স্বাধীন করার জন্য হাজার হাজার বীরসা, কানুরাম, সাধুদের মতো মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, এই শোষণ থেকে মুক্তি পেতে সব আদিবাসী মানুষকে লেখাপড়া শিখতে হবে, মেয়েদের এগিয়ে আসতে হবে, নিজেদের সংঘবদ্ধ হতে হবে। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন করেছিল ‘দি ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট’ যা ১৯৫২ সালে তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু স্বাধীন ভারতের পুলিশের সেই মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি। এর বিরুদ্ধে লড়তে গেলে নিজেদের জোট বাঁধতে হবে, মদ খেয়ে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা চলবে না, কিছুজনের জন্য পুরো সমাজটার বদনাম হচ্ছে, তাই তাদেরকেই ঠিক পথে চলতে হবে, তোমরা যে আমাকে ‘মা’ বললে আমি তা গ্রহণ করলাম, কিন্তু তোমাদেরকেও এগুলি পালন করতে হবে। আমি তোমাদের সাথে আছি এবং আমার মৃত্যু পর্যন্ত থাকবো।
    মহাশ্বেতা দেবীর নির্দেশেই সারা জেলার শবরের গ্রামভিত্তিক সার্ভে করা শুরু হয়। তাঁর থেকেই প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা ও রূপায়নের কাজ, তাঁরই ইচ্ছায় গ্রাম উন্নয়ন নিয়ে পড়ে এলাম এনআইআরডি, হায়দ্রাবাদ থেকে।
    শহরের অর্থ গ্রামে আনা এবং পরিচয়ের জন্য ‘শবর হস্তশিল্প’-র প্রশিক্ষণ এবং বিক্রয়ের জন্য তাঁর ১৮-এ বালিগঞ্জ স্টেশন রোডের বাড়িতে বিক্রয়কেন্দ্র শুরু হল। খুব কম মানুষ আছেন তাঁর বাড়িতে গিয়ে শবর হস্তশিল্প কেনেননি। শবরদের জন্য সরকারের কাছে জমি চাওয়া, সেচের জন্য জলের ব্যবস্থা, বয়স্ক শিক্ষা, ননফরমাল স্কুল, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল, ধাত্রী প্রশিক্ষণ, লিগাল এইড-এর ব্যবস্থা, ভ্রাম্যমান চিকিৎসার জন্য গাড়ি, ঔষধ, চাষের জন্য ট্রাক্টর, ক্রাফট ডেভলপমেন্ট সেন্টার, কমিউনিটি হল সাথে শৌচালয় — প্রতিটি কার্যক্রমের ভেতরে আছে এর অন্তর্নিহিত মানে। ধরুন শবর শিল্পীরা যখন তাদের হস্তশিল্প বিক্রয় করতে সমিতিতে আসছে তখন শিল্পীকে তার নাম, কত টাকা সে পাবে লিখে আনতে হচ্ছে। প্রথমতঃ সে কোথাও ঠকবে না, দ্বিতীয়ত সে বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ পাবে, নইলে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম অসফল হবে, এই ছিল তাঁর ভাবনা। কমিউনিটি হল তৈরির পেছনে বিদ্যুৎহীন শবর গ্রামে পাঁচটি হ্যারিকেন জ্বলবে, বয়স্করা এক জায়গায় বসবে, তারপর লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠান প্রতিদিন এবং এই দুই কার্যক্রমে কারা এলো না তার খোঁজ পাওয়া যাবে, শবর সংস্কৃতি এবং ভাষা বাঁচবে, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গ্রামে গ্রামে ধাইমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে শিশু ও মায়ের মৃত্যুহার কমতে থাকবে, ফলে ডাইনি অপবাদ আদিবাসী সমাজ থেকে কিছুটা কমবে। ডাইনি অপবাদে মৃত্যু হলেই তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন, বলতেন এইজন্যই আদিবাসী মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন। একবার ‘আজকাল’ কাগজে পড়লেন প্রাচ্যে ডাইনিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করা একজন মহিলা তাঁর প্রচার ও প্রসারের জন্য পুরুলিয়া যাচ্ছেন। উনি রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করলেন ঐ মহিলাকে যেন পুরুলিয়া তথা ভারতের কোন গ্রামে ঢুকতে না দেওয়া হয়। দিদির কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর গল্পের ইংরেজি অনুবাদিকা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যুক্ত হয়েছিলেন শবরদের মধ্যে শিশুশিক্ষা কার্যক্রমে।
    শবরদের উপর পুলিশি অত্যাচার, মিথ্যা মামলা দেওয়া বন্ধ করার জন্য বহু চিঠি খবরের কাগজে আবেদন এমনকি তদানীন্তন ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ ডঃ অরুণ প্রসাদ মুখার্জীকে বার বার শবরদের কাছে নিয়ে এসেছেন। প্রতি বছর শীতে ব্যবহারযোগ্য কাপড়, শবর মেলার জন্য চাল-ডাল বা টাকা দান করার জন্য আবেদন জানাতেন খবরের কাগজের মাধ্যমে। জ্ঞানপীঠ, মাগসেসে পুরস্কারের টাকা সহ উপার্জিত টাকার বেশীটাই ব্যয় করতেন শবর উন্নয়নে। তিনি পুরুলিয়া বাঁকুড়া বা মেদিনীপুরের শবরদের জন্য ছাড়াও ভারতের ডিনোটিফায়েড আদিবাসী (প্রায় ছয় কোটি) মানুষ ও ১৯২টি জাতিকে নিয়ে মঞ্চ তৈরী করেছেন। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটের গ্রামে গ্রামে তিনি ঘুরেছেন, তাঁদের বঞ্চনার কথা তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি ও মনমোহন সিংকে ডেপুটেশন দিয়েছেন। যার ফলস্বরূপ বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার ডিএনটি-দের জন্য আলাদা কমিশন গঠন করেছে। এই সংগঠন বিমুক্ত নামে কাজ করছে। শবরমাতা থেকে তিনি সারা ভারতের ডিনোটিফায়েড আদিবাসীদের কাছে ‘আম্মা’ নামে পরিচিত।
    মহাশ্বেতাদি আদিবাসীদের কাছে বার বার গেছেন, থেকেছেন, তাদের জীবন সংগ্রাম উপলব্ধি করেছেন এবং তা লিখেছেন। তিনি বঞ্চিতদের একটি সম্পদ কেন্দ্রের কাজ করেছেন। প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলের নিপীড়িত মানুষেরা তাঁর কাছে বারবার এসেছেন তাদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে, কিছুজন তাঁর বাড়িতে থেকেও যেতেন, হাসিমুখে তাদের খাবার-থাকার ব্যবস্থা নিজের হাতে করতেন তিনি। কাউকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা, তো কারো জমির সমস্যা, সেচের সমস্যা, পানীয় জলের সমস্যা প্রভৃতিগুলি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, লিখেছেন ও আদায় করে ছেড়েছেন। মানুষের উপকার করা ছিল তাঁর নেশা।
    তাঁর সম্পাদিত ‘বর্তিকা’তে তিনি নানান বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা করেছেন, সেই সমাজের মানুষগুলিকে দিয়ে লিখিয়েছেন লেখক তৈরি করিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিকা ও প্রশান্ত রক্ষিতের সংকলিত অনুবাদে শবর লোককথা ও লোকগান সাহিত্য আকাদেমি ২০১৩-তে প্রকাশ করে।
    শবর ভাষায়, আমার সম্পাদনায় ‘গীতর আঁজুড়া’ — গীতাঞ্জলী যখন বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ প্রকাশ করল, সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। তাঁর কাজের তালিকা দীর্ঘতম, কাগজে, কলমে শেষ হবার নয়।