বহুভাষিক ভারতবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ উত্তরবঙ্গ, যা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত। ভারতবর্ষের প্রধান পাঁচটি ভাষাবংশের মধ্যে চারটি ভাষাবংশের মানুষের পদচারণা ঘটেছে এই অঞ্চলে। ভাষা বিন্যাসের নিরিখে এই অঞ্চলকে ভারতবর্ষের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ বলা যেতে পারে। লিপিগত দিক থেকেও বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন- লেপচা ভাষার নিজস্ব লিপি আছে। লিম্বু ভাষার নিজস্ব লিপি ‘সিরিজংগা’। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর অঞ্চলে একদা কাইথি লিপির প্রচলন ছিল। মধ্যযুগে কোচবিহারের সাহিত্যচর্চায় অসমীয়া ও বাংলা লিপির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।
তিস্তা-তোর্ষা-সংকোষ-মহানন্দা বিধৌত উত্তরবঙ্গের নানা ভাষা ও সংস্কৃতি সন্ধান করতে গিয়ে অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের অন্তর্গত অসুর জনগোষ্ঠীর অসুরি ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় তাঁরা মূলত উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে আছেন। ডুয়ার্সের ক্যারণ চা বাগানে ১১০টি পরিবার, আলিপুরদুয়ার জেলার মাঝের ডাবরিতে ১০০টি পরিবার। লিখিত সাহিত্য তৈরি হয়নি; বরং তাদের ঘরের ভাষা হয়ে উঠেছে সাদরি এবং হিন্দি।
ডুয়ার্সের রামশাই ফরেস্টে আজ থেকে প্রায় পনের বছর আগে খুঁজে পাই কয়া জনগোষ্ঠীকে। শাপদ সংকুল এলাকা, দিনের বেলাতে যেখানে বন্য হাতি চলে আসে। তাদের নিজস্ব ভাষায় আর কেউ কথা বলতে পারেন না। একদা রামশাই-এর কয়া পরিবার থেকে এক বয়স্ক মানুষের কাছে কয়েকটি শব্দ শুনেছি মাত্র। ভাষাপরিবারের সূত্র ধরে তাঁরা ক্রমশ ওঁরাওদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তবে ৫/৬টি পরিবার কয়া পরিচয় দিলেও ঘরের ও বাইরের ভাষা হয়ে উঠেছে সাদরি এবং বাংলা।
উত্তরবঙ্গের রাউতিয়া ভাষার মানুষেরা বসবাস করেন ডুয়ার্স এবং তরাই অঞ্চলে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাঁরা ‘অখিল ভারতীয় রাউতিয়া সমাজ বিকাশ পরিষদ’ গঠন করেন। তাঁদের ভাষা বিপন্ন। ক্রমশ ব্যবহার করেছেন সাদরি ভাষা। প্রবীনদের মধ্যে এই ভাষার রূপ কিছুটা খুঁজে পাওয়া যায়। উল্লেখ্য রাউতিয়ারা দ্রাবিড় নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্গত।
আলিপুরদুয়ার জেলার ভারত-ভুটান সীমান্তে বক্সাদুয়ার অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া যায় ভোট চিনা ভাষাগোষ্ঠীর ডুকপাদেরকে। ধর্মের দিক থেকে তাঁরা বৌদ্ধ মহাযানী শাখার অন্তর্গত। ক্রমশ তাদের ভাষা বিপন্নতার মুখে। নেপালী হিন্দি, বাংলার প্রভাবে ভাষা বিলুপ্ত প্রায়।
দার্জিলিং জেলার তরাই অঞ্চলে বসবাসকারী মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্গত ধিমালরা বসবাস করে মনিরাম গ্রাম পঞ্চায়েত হাতিঘিসা গ্রাম পঞ্চায়েত এবং খড়িবাড়ি বুড়াগঞ্জ অঞ্চলে। ভারতবর্ষে বসবাসকারী ধিমাল জনসংখ্যা ৯৯৩ জন (২০১০-এর মে মাসের ক্ষেত্র সমীক্ষা)। তাদের নিজস্ব ভাষা আছে। ধিমাল ভাষার ব্যাকরণ লিখেছেন ধিমাল জনগোষ্ঠীর মানুষ গর্জন কুমার মল্লিক। তরাই অঞ্চলের ধিমাল ভাষা ক্রমশ রাজবংশী ভাষার সহাবস্থানে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ঠিক তেমনি টোটো পাড়ায় বসবাসকারী টোটো ভাষাও বিপন্ন। যদিও কিছুটা ভাষা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা তাঁরা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবুও নেপালী ভাষার আগ্রাসনের মুখে বর্তমানে টোটো ভাষা বিপন্ন।
কিছু ভাষা একেবারে হারিয়ে গেছে, স্থান-নামে তার পদচিহ্ন কিছুটা আছে, অথবা বৃহৎ কোন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তারা মিশে যাচ্ছে যা অনুসন্ধানের বিষয়। যেমন – জলদা জনগোষ্ঠীর ভাষা। জলদাপাড়া অঞ্চলে তারা একদা বসবাস করতো।
ডুয়ার্সের টুন্ডু চা বাগানে টুন্ডুরা বসবাস করত। আজ সেই নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে গেছে। তারাও হয়তো মিশে গেছেন অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে।
বহুভাষিক জনপদে নৃ-গোষ্ঠী এবং ভাষাগোষ্ঠীর সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে দেখা যায় অনেক ভাষা এতদ্ অঞ্চলে সংকটের মুখে বা বিপন্নতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের রক্ষা করা প্রয়োজন। তা না হলে সেই সমস্ত ভাষাগোষ্ঠীর জীবনবীক্ষা চিরতরে নিশ্চিহ্ন হবে।