নেই। কিচ্ছু নেই। এখানে সমাজসেবীরা যান। লেখক লেখিকারা যান। গবেষকরা যান। দশকের ব্যবধানে দৈবাৎ কোন বড় ঘটনা ঘটলে যোজন ডিঙিয়ে যেতে হয় সাংবাদিকদেরও। বছর পাঁচেক ছাড়া রাজনীতির লোকজনেরও পদধূলি পড়ে। কয়েকটা খড়ের চালা ভিতহীন নড়বড়ে মাটির বাড়ি। গাছের ছায়া দিয়ে ঘেরা সর্বজনীন উঠোনে খেলে বেড়াচ্ছে পেট ফাঁপা লিকলিকে হাত-পা-ওলা শিশুর দল। দড়ি পাকানো শরীর নিয়ে পা ছড়িয়ে পান্তা খেতে বসেছে বাড়ন্ত কিশোরী। ইতিউতি উঁকি মেরেও তরকারির চিহ্ন পাওয়া গেল না। ছেঁড়া কাপড়ে গৃহস্থালীর কাজে ব্যস্ত স্ত্রীলোকেরা। কুয়োতলায় বসে গুটিকয় যুবক চুল্লুর নেশায় বুঁদ।
উপজাতিটির নাম শবর। বই-এর ভাষায় যাদের বলা হয় খেড়িয়া শবর। পুরুলিয়া জেলার সবর অধ্যুষিত এই গ্রামটির নাম আকড়বাইত। ভুখা-নাঙ্গা ভারতের এই ছবি দেখিয়েই আন্তর্জাতিক স্তরের পুরস্কার লাভ করেন ফটোগ্রাফাররা। সেই ‘ক্লিক’-এর পোষাকি নাম হয়ে যায় ‘রিয়্যাল ফোটোগ্রাফ’।
শবররা আসলে প্রান্তিক তফশিলি উপজাতি। এরা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর এবং দক্ষিণাংশে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং অন্ধ্রপ্রদেশে তাদের বসতি রয়েছে। শবরদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তির পথে। বিবর্তনের চাপে বিবর্তিত হতে হতে, শবরীয় ভাষা ও সংস্কৃতি, তার ঐতিহ্য এবং আদিমতা খুইয়েছে। যেকোন জনজাতির সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তাদের ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলিকেও বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু যেখানে ভাষার নিজস্বতা মৃতপ্রায়, সেখানে সংস্কৃতিরও শ্বাস রুদ্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটতে বাধ্য। ভাষার মাধ্যমেই একটি জনজাতির ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা, পাণ্ডিত্য, যুক্তিবাদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাহিত হয়। কোন বিশেষ জনজাতির উন্নয়নের পথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে, তাদের ‘মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ’। শবরদের ভাষার ক্রমবর্ধমান বিবর্তনের পেছনে একাধিক সংগত কারণ রয়েছে।
আদি বা মধ্যযুগীয় সাহিত্যে ‘শবর’ শব্দটি বনে বাস করে এমন ইন্দো-অনার্য জাতি সম্পর্কে ব্যবহার করা হত। দশম শতাব্দীতে এরা পশ্চিমবঙ্গ-বিহার সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করত বলে জানা যায়। এই সময় আশেপাশের হিন্দুদের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুরু হয় ভাষা ও সংস্কৃতির লেনদেন। রিসলে’র (1891) বর্ণনা অনুযায়ী, শবরেরা নিজেদের ‘শবরাই’ বা ‘শুয়ারী’ হিসেবে পরিচয় দিত। হিন্দুরা শবরদের দ্রাবিড় জনগোষ্ঠির একটি অংশ হিসেবে জানত। কিন্তু শবরদের ভাষা আসলে অস্ট্রো-এশিয়াটিক। এই সময় থেকেই হিন্দুদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়তে শুরু করে শবরদের ওপর।
পার্শ্ববর্তী সংখ্যাগুরু জনজাতির ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবের বিষয়টির দ্বারা এখন শবরদের ভাষা ও সংস্কৃতি বিপণ্ণপ্রায়। পুরুলিয়ার বাংলা ভাষার টান পাওয়া যায় শবর ভাষার মধ্যে। বাঙালীদের দুর্গাপুজো দেখতে পাশের বাঙালী গ্রাম বা পুরুলিয়া শহরে আসে শবরেরা। হাটে বাজারে নিত্য প্রয়োজনে বাঙালীদের সঙ্গে শবরদের কথা বলতেই হয়। এদিকে রাজ্যের প্রধান এবং ব্যবহার্য ভাষাও বাংলা। বাঙালীরা সেই অর্থে সংখ্যাগুরু। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি প্রয়োজনে বাংলা ভাষা জানার দরকার পড়ে। কট্টর পুরুলিয়া টানে বাংলা বলিয়েও শবর ভাষার বিন্দু বিসর্গ বুঝতে পারেন না। তাই নিজেদের প্রয়োজনে কিছুটা বাধ্য হয়েই বাংলার হাত ধরতে হয় শবরদের। 2 টাকা কেজি চালের জন্য অন্ত্যোদয় কার্ডই (যাকে সবরেরা ‘লাল কার্ড’ বলেন) হোক কিংবা হস্তশিল্পীদের পরিচয়পত্র আদায়, সবক্ষেত্রেই বাংলার আধিপত্য। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও মাধ্যম সেই বাংলা। স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাককর্মীদের মত গ্রামে যেসব সরকারী প্রতিনিধিদের প্রতিনিয়ত যাতায়াত রয়েছে তাঁদেরও ভাষা বাংলা। আকড়বাইত গ্রামটির 55 বছরের বৃদ্ধও বিশুদ্ধ শবর ভাষায় কথা বলতে হিমশিম খান। মহিলারা বেশীর ভাগই বাড়ির কাজ বা স্থানীয় ক্ষেতে কাজ করেন বলে বাইরের জগতের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ কম। শবর ভাষা যেটুকু বেঁচে রয়েছে তা মূলত বাড়ির মহিলাদের হাত ধরেই। তুলনামূলকভাবে পুরুষদের যাতায়াত বাঙালীমহলে অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই বাংলার প্রভাবে নিজেদের ভাষা প্রায় ভুলতে বসেছেন তাঁরা। এদিকে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমও বাংলা হওয়ায় শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে চরম দুর্দশার সম্মুখীন হতে হচ্ছে শবর পড়ুয়াদের। বাংলার সঙ্গে শবর ভাষা গুলিয়ে গিয়ে প্রায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা। বাড়ির বাংলা আর ইংলিশ মিডিয়ামের ইংরিজি মিশে গিয়ে বাঙালী পড়ুয়াদের শেষ পর্যন্ত যে ‘বেংলিশ’ ভাষার সৃষ্টি করে, শবর জাতির খুদে পড়ুয়াদের অবস্থা ঠিক সেরকমই। বাংলা আর শবর ভাষার নিরন্তর দড়ি টানাটানিতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নাম সই করতে শেখার আগেই শেষ হয়ে যায় শবর শিশুদের শিক্ষালাভের আগ্রহ। এইভাবে শবর প্রজন্ম নিরক্ষরই থেকে যায় যুগ যুগ ধরে। যদিওবা বহু কষ্টে কেউ চতুর্থের পর পঞ্চম শ্রেণীতে পা রাখে, ‘শবর’ হয়ে জন্মানোর লজ্জায় সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। বাড়িতে বাবা-মা নিরক্ষর। পড়াশোনা দেখিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। বাইরে ‘প্রাইভেট’ পড়তে পাঠানোর অর্থ নেই। শিক্ষাবর্ষের শেষে অনিবার্যভাবে সেই পড়ুয়া ব্যর্থতার মুখ দেখে। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, শবরদের বোধ হয় পড়তে নেই। কিংবা, পড়ে কি হবে ছাই ? – এই প্রশ্ন জাগে। ফলে বিদ্যালয়ের পথ মাড়ানো বন্ধ হয়ে যায় 9-10 বছর বয়সেই।
বনজঙ্গল শবর বা অন্যান্য আদিম উপজাতিদের ভাষা ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ। উন্নয়নের ঠেলায় শবরেরা এখন বন থেকে বহুদূরে। ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। বিশ্বায়ন, নতুন করে অর্থনীতির মূল্যায়ণ, মানুষের চাহিদার পরিবর্তন, সব মিলিয়ে পাহাড়প্রমাণ চাপে, এই উদ্ধৃতি শবর সহ এই সব উপজাতির ক্ষেত্রে আজ কেতাবি কবিতা। শবরদের দেবতা উপদেবতা বা অপদেবতা সবই জঙ্গল কেন্দ্রিক। রাও’ (1972) –এর রিপোর্ট অনুযায়ী, শবরেরা বন থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। এরা মাছ ধরে বা শিকার করে নিজেদের খাদ্যের যোগাড় করে। একই কথা বলেছেন ডালটনও (1872)। কেউ বলেছেন, শবরেরা পশ্চিমবঙ্গের ‘সাপ ধরা’ উপজাতি। আবার সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, শবরেরা জঙ্গল থেকে নানাবিধ ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এখনও শবরেরা বনজ দেবদেবী বিশ্বাস করে। প্রকৃতিকে দেবরূপে পুজো করাই তাদের ঐতিহ্য। কিন্তু বন থেকে দূরে অবস্থানের জন্য বনকেন্দ্রিক ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস সবকিছুরই এখন টালমাটাল অবস্থা। এদিকে দেবতা দূরে থাকায় বাড়ছে নানা রকম কুসংস্কারের প্রভাব। অপদেবতার উদ্দেশ্যে ছড়ানো ভাঙা চাল কুড়িয়ে নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে সেই চাল ভিজিয়ে তা ‘ভূত’-এর উদ্দেশ্যে সমর্পন করে ভূতকে দূরে যেতে অনুরোধ করা হয়। শবরদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এখনও কাউকে কাউকে ভূতে ধরে। নিজেদের জনগোষ্ঠির মধ্যে সবচেয়ে চালাক চতুর মানুষটি এই সময় ঝাঁটা হাতে উপস্থিত হন ওঝা রূপে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, 1956 সালে বাংলাকে ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবীতে আন্দোলনে সামিল হয় শবর জাতি। শবর নেতাদের এই পদক্ষেপে কার্যত শবর ভাষার আত্মহত্যার কারণ। স্বাধীনতার পর, মানভূম জেলার মানুষদের ওপর হিন্দীকে ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে কার্যত চাপিয়ে দেওয়া হয়। আদিম অধিবাসীরা বিহার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেয়। শবর নেতা লচ্চু শবর এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে শবরেরাও ভাষা সত্যাগ্রহ, খাদ্য সত্যাগ্রহ, টুসু সত্যাগ্রহ এবং বঙ্গ সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করে। শবর হওয়া সত্ত্বেও কেন লচ্চু এবং তার জনগোষ্ঠি বাংলা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন লচ্চু নিজেই। তাঁর কথায়, ‘আমরা বাংলাকে আমাদের মাতৃভাষার সমান সম্মান দিই। শিক্ষা বা দৈনন্দিন প্রয়োজনেও বাংলাই কাজে লাগে। বাঙালীদের উৎসবে আমরা যোগ দিই। তাই আমরা বিহার সরকার এবং হিন্দীর বিরুদ্ধে গিয়েছি।’
ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিতেই 16টি থানা নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। ধানবাদ থেকে যায় বিহার রাজ্যের ভেতরেই। বহু আন্দোলনের ফসল এই বাংলা ভাষার চাপেই এখন শবর ভাষার নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়।
বুধনের আত্মা বোধ হয় এখনো পিছু ছাড়েনি শবরদের। ‘বুধন বধ’ কাণ্ডের স্মৃতি এখনো দগদগে। শবরেরা নাকি জন্মগত অপরাধী (Born Criminal)! মানুষের এই প্রচলিত ধারণা আইনসিদ্ধ হয় ব্রিটিশ আমলে। পাশ হয় Criminal Tribes Act 1871। 1952 সালে এই আইন তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও তারা ‘Criminal Tribe’ হিসেবেই পরিচিত। 1980-র দশকে পুলিশ দ্বারা বুধন শবরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রভাব এখনও রয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির তরফ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও করা হয়। বুধন সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, ‘‘These tribes are forced to engaged in criminal activities by the police and receiver of stolen goods’’। পুলিশের সেই নৃশংস অত্যাচার কমলেও, উৎপাত এখনও কমেনি। প্রায় প্রতিদিনই গ্রামে পুলিশ আসে। যখন তখন কারো নামে ওয়ারেন্ট জারী হয়। স্থানীয় শবরদের অভিযোগ, আসল অপরাধী ধরা না পড়লে পুলিশ হানা দেয় শবরদের গ্রামে। তুলে নিয়ে যায় যেকোন ‘মরদ’কে। হয়তো সে বহু বছর আগে চুরির দায়ে ধরা পড়েছিল কিংবা পড়েনি। হয়তো এখন সে নিছক এক দিনমজুর। পুলিশ নিজের দায় ঝাড়তে তাকে ‘টার্গেট’ করে বসে। রাতারাতি 3টি বাচ্চা নিয়ে, সেই পুরুষের স্ত্রী প্রায় পথে বসে। স্থানীয় এক যুবক মশকরার ছলে জানালেন, শহরে টিভিতে দেখা যায় ক্রিমিনালদের অনেক টাকা-গাড়ি-বাড়ি আরও অনেক কিছু। কিন্তু আজ পর্যন্ত এলাকার কোনো শবর একটা ছোট্ট পাকা বাড়ি পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি। নিজেদের মধ্যে যতই গণ্ডগোল হোক, থানায় যাওয়ার কথা কেউ ভাবতেও পারে না। ‘পুলিশ চওকি’ সম্পর্কে জন্ম থেকেই ভীতি তৈরি হয়। সাধারণ বাঙালী সমাজও খুব একটা ভাল চোখে দেখে না শবরদের। যেখানে আইনি কাগজ বলছে তুমি চোর, সেখানে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের ভীত নড়ে যেতে বাধ্য। তাই শবরেরা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে সমাজের মূলস্রোতে গা ভাসাতে চায়। যতদূর সম্ভব পারা যায়, নিজেদের ভাষায় কথা না বলে, চালচলন মার্জিত করে, নিজেদের জন্ম পরিচয় মুছে ফেলতে মরিয়া হয়। ‘চোর’ বদনামের জন্য সাধারণ মানের কাজও তাদের ভাগ্যে জোটেনা।
পশ্চিমবঙ্গে শবর উপজাতি 1956 সালে অক্টোবর মাসে তফশিলি উপজাতির তালিকাভুক্ত হয়েছে (Serial No. 38)। 2001 সালের জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে শবরদের সংখ্যা 43,599, যা সমগ্র তফশিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের 1 শতাংশ। শিক্ষিতের হারও শবরদের মধ্যে সবচেয়ে কম। মাত্র 26.3% (পুরুষ – 36.4% এবং মহিলা – 16%)। ভোট চাইতে যান রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। কিন্তু তাঁরা কি শবরদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন ?
পঞ্চায়েত ভোটে তবুও কিছু তোড়জোড় থাকে। নেতাদের আনাগোনা দেখে শবরেরা বুঝতে পারে, ‘ভোট এসেছে’। বিধানসভা বা লোকসভা ভোট নিয়ে কোন মাতামাতি নেই। বিধানসভা ভোটের মাত্র কয়েকদিন আগে গিয়ে দেখা গেল গ্রামের একটি মাটির বাড়ির দেওয়ালেও ‘প্রার্থী বিজ্ঞাপন’ নেই। হয়ত রাজনীতিকরাও বিলক্ষণ জানেন, এখানে দেওয়াল লিখন করে লাভ নেই। কারণ অধিকাংশ শবর মানুষের কাছে এটা দেওয়াল রং করে ছবি আঁকা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। যাঁদের অক্ষর জ্ঞান নেই, তাঁদের কাছে সবই তো ছবি আর রং। কারও কারও পড়বার ক্ষমতা থাকলেও কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই সেই যুবক চোলাই-এর ফাঁদে পা দেয়। চোলাই বিক্রেতাদের ব্যাপারে পুলিশ সম্পূর্ণ উদাসীন।
সরকার থেকে তফশিল উপজাতিদের জন্য যে সমস্ত সুযোগ সুবিধা রয়েছে, তার সিকি ভাগও শবরদের কপালে জোটে না। তারা জানেই না তাদের অপরাধ এবং অধিকার। শিক্ষিতদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব। দারিদ্র এবং অজ্ঞতার এই সাম্রাজ্যে ভাষা সংরক্ষণের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, অর্থ নেই। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান যোগাড়ের আশায় অহরহ খেটে চলে পার্ব্বতী, শবণী আর রবি সবরেরা। ঝাঁটা তৈরী, হাতের কাজ আর দিন মজুরী করে কোনরকমে দিন চলে। তবুও মাসের শেষে একটি পরিবারের আয় সাকুল্যে ৯০০-১৫০০ টাকা। নেটওয়ার্ক একটু আধটু ধরলেও, গ্রামে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ২-৩। সারা গ্রামে ঘুরেও টেলিভিশনের দেখা মেলেনি। খালি পেটে যেমন ধর্ম হয় না, তেমন পেট ভরা ক্ষুধা নিয়ে ভাষা সংস্কৃতি চর্চার বুলি আওড়ানও হাস্যকর।
খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতি, শবরদের উন্নয়নের জন্য কিছু কর্মসূচী নিয়ে থাকে, কিন্তু সমগ্র জাতির উন্নতিসাধন এবং তাদের আদি ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তা মোটেই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সদিচ্ছা। এক সচেতন শবর যুবকের আক্ষেপ, “ইমন্ কইরে সোমাজ আগে বাড়বেক্ লাই”।
“বুড়হা কুথায় ?” দিদি আসতেন। এসে বসতেন ওই দাওয়ায়। তারপর শুরু হত জমিয়ে গল্প। সবার সাথে হেঁটেই চলে যেতেন নুয়াগড়। গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ অর্জুন শবর রোগশয্যায় শুয়ে স্মৃতির মণিকোঠা হাতড়ে বের করে আনেন অমূল্য অতীত। দিদির কথা বলতেই কোটরাগত চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে। আর কিছুদিন পরেই হয়তো পরলোকে দিদির সঙ্গে দেখা হতে পারে, অর্জুনের আশা। পঞ্চকোটি দেবতার উদ্দেশ্যে হাত জড়ো করে একবার প্রণাম জানালেন তিনি। মিনিট খানেক ওই রোগজীর্ণ হাতদুটি স্থির হয়ে রইল দেবতাদের স্মরণ করে।
মহাশ্বেতা নেই। মহাশ্বেতার গ্রাম এখনও চোখের জলে ভাসে। এই নিঃস্বার্থ অভিভাবকটির স্মৃতিতে এখনও প্রতিদিন শ্রদ্ধা জানান এখানকার মানুষ। সভ্য সমাজের পরাকাষ্ঠার দায় আদিবাসীদের নেই। উপকার আর অপকার কোনটাই তাঁরা সহজে ভোলেন না। তাই অকড়বাইদ গ্রাম যতদিন থাকবে, মহাশ্বেতাও ততদিন অমরত্ব লাভ করবেন। আমৃত্যু ভালবাসা পাবেন ‘হাজার চুরাশির মা’র ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা, যাঁরা মেট্রোসিটির জঙ্গল থেকে বেরিয়ে মিশে যেতে পেরেছেন। এই আদিম জঙ্গলবাসীদের সাথে। পুরুলিয়া-১ নং ব্লকের অকড়বাইদ নামের এই গ্রামে আদিম উপজাতি খেড়িয়া শবরদের বসবাস। বুধন মৃত্যুকাণ্ডের সময় থেকে শবরদের অধিকার রক্ষার দাবীতে জোরালো আন্দোলন শুরু করেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। শুধু সামাজিক, অর্থনৈতিক বা আইনগত অধিকার নয়, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দাবীও ছিল। ধর্ম যেকোন সমাজের সংস্কৃতির মূল অঙ্গ। ধর্মের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটলে, সংস্কৃতির মূল কাঠামোয় দ্রুত ভাঙ্গন ধরতে বাধ্য।
আগে শবরদের পূজ্যদেবতা ছিলেন বনদেবতা অর্থাৎ বাগুৎ ঠাকুর। জীবনযাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই প্রকৃতি পুজো করত শবররা। বনের সঙ্গে পাহাড় দেবতা ছিলেন তাঁদের আরাধ্য। এখন হিন্দুদের সমস্ত দেব-দেবীই শবরদের পূজ্য। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে তুলসী মঞ্চ। তাতে আবার মার্বেল পাথরে দুর্গা মূর্তি খোদাই করা। কোন কোন জায়গায় চৈতন্যের ছবি বা কালী ঠাকুরের ছবিও চোখে পড়বে। তুলসী মঞ্চের পাশে চারিদিক জুড়ে রাখা ছোট ছোট মাটির ঘোড়া। ঘোড়াগুলির আকৃতি কিছুটা মুসলমানদের পীরবাবার থানের মানসিকের ঘোড়াগুলির মত। তবে ওগুলিই শবরদের কাছে বনদেবতা বা বাগুৎ ঠাকুরের প্রতিমূর্তি। হিন্দুত্বায়নের স্রোতে মুসলমানত্বের রং। সব মিলেমিশে একাকার। রাজনীতিগত দিক থেকে খেড়িয়া শবর নামক ভারতের এই আদিম উপজাতিটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ‘ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডার’ হলেও হতে পারে কোনও একদিন। কিন্তু তাতে তাদের মূল ধর্ম সংস্কৃতি সাহিত্য ভাষা সবকিছুই যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সেই খেড়িয়া শবর উপজাতিটি নিশ্চিতভাবে মহাশ্বেতা’র স্বপ্নের ‘শবর’ নয়।
হিন্দুদের অনুকরণেই দিন দিন শবরদের দেবদেবীর সংখ্যা বাড়ছে। অর্জুনের ‘পঞ্চকোটি দেবতা’র সংখ্যা বেড়ে অর্জুনের পুত্রবধূ বিজলী শবরের কাছে দাঁড়িয়েছে তেত্রিশ কোটি দেবতা রূপে। নাম সই করতে এখনও ইতস্তত করেন এখানকার মানুষ। তেত্রিশ কোটি কথাটা সংখ্যায় ছবিটা ঠিক কি রকম দাঁড়ায়, সে বিষয়েও খুব একটা ধারণা নেই। সংখ্যাতত্ত্বের ধারণাও শূন্য। কিন্তু দেবদেবীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নিজেদের মূল ভিত্তিক বিনিময়ে সভ্য হচ্ছে শবর সমাজ।
Reference :
1. Problems of Tribal Identity : A Case Study of Savara and Lodha Tribes of West Bengal
[Dr. Proggya Ghatak]
2. Tribal Language : An Ethno-power and Authority in Historical Approach in Manbhum
Region [Dr. Pradip Kumar Mandal, Asian Minor - International Journal of research,
volume 1, Issue 1, Feb. 2014]
3. Marginalisation of Tribal Communities due to Globalisation [Neelmani Jaysawal,
Visva-Bharati University, July 1, 2014]
4. Denotified Communities of India [Mahasweta Devi, Blogspot.in, June 7, 2015]
5. Personal Interview of Parbati Sabar, Sabani Sabar and Rabi Sabar in Akrabait village in
Purulia District [visited at 14-16th March, 2016]